দ্বৈপায়ন দেব: ●‌ মর্দানি ২। পরিচালনা:‌ গোপী পুথরান, অভিনয়ে:‌ রানি মুখার্জি, বিশাল জেঠওয়া, রাজেশ শর্মা, শ্রুতি বাপনা, যিশু সেনগুপ্ত, প্রসন্ন কেতকার।
ধর্ষক কে?‌ ধর্ষক কারা?‌
পৌরুষ কী?‌ নারী কি পুরুষের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে পারে?‌ নাকি পারে না?‌ পারতে দেওয়া হয় না‌?‌
আর সেখানেই কি লুকিয়ে থাকে ধর্ষণের বীজ?‌ আসল সঙ্ঘাতটা?‌
নিছক ‘‌থ্রিলার’‌ নয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে, না দিয়ে ‘‌মর্দানি ২’‌ দেখে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। খুব সচেতনভাবেই এই ‘‌কোয়েশ্চেন গ্রাউন্ড’‌টাকে ছবির ভেতরে বসিয়ে দিয়েছেন পরিচালক–‌চিত্রনাট্যকার গোপী পুথরান। যা একটি ‘‌মাইমফিল্ড’‌–‌এর মতো, বিস্ফোরণের জন্য অপেক্ষমাণ। এ’‌ছবির ভেতরে ঢোকা মানেই, আপনার চিন্তার ‘‌পা’‌ ওই ‘‌মাইম’‌–‌এর ওপর পড়ে গেল। উত্তর না পেলে যা আর নিষ্ক্রিয় হবে না। ‘‌থ্রিলার’–এর রোমাঞ্চ নয়, এ’‌ছবির উদ্দেশ্য সারাক্ষণই দর্শককে বিব্রত করা। যাতে সে ছবি দেখতে বসেও এই হিংস্র দুঃসময়টাকে হাড়ে–‌মজ্জায় অনুভব করতে পারে। গোপীর ছবি সে ‘‌টেকনিক’‌ কৌশল খুঁজে পেয়েছে। আর এখানেই এই সিকুয়েল ‘‌মর্দানি ২’‌ আলাদা আগের ছবি ‘‌মর্দানি’‌র থেকে (‌আগেরবার পরিচালক ছিলেন প্রদীপ সরকার, সেবার এবারের পরিচালক গোপী ছিলেন কাহিনিকার)‌।
ধর্ষক কি নিছকই এক বিচ্ছিন্ন কামুক অপরাধী?‌ আবারও একটি গভীর প্রশ্ন। নাকি, সে আসলে দাঁড়িয়ে থাকে একটি বর্শাফলকের মতো, কোনও একটি ক্ষমতার রাজনীতি থেকে অবৈধভাবে জাত হয়ে?‌ এটাও গোপীর এই চিত্রনাট্যের এক অনবদ্য পদক্ষেপ, যে তিনি দেখান ধর্ষকের ধর্ষণের ইচ্ছে যদি মনোজাত হয়ও, তাকে বাইরের জগতে বের করে আনার ক্ষমতা বা সাহস সেই ধর্ষক পায় কোথা থেকে। কোন রাজনৈতিক নীতিহীনতা তাকে সেই পরিসর এনে দেয় জান্তে–‌অজান্তে। এই কথাগুলো প্রবন্ধ, বক্তৃতা বা সমাজতত্ত্বের গবেষণাপত্রের মতো করে বলেন না যে গোপী, বা বলতে হয় না যে তাঁকে, বরং তা তিনি এ’‌সিনেমায় বলতে পারেন অতি দ্রুতগতির (‌এক ঘণ্টা চুয়াল্লিশ মিনিটের ছবি মাত্র এটি)‌ এক গল্পের সাহায্যে, যে গল্পে অপরাধ কে করছে তা শুরু থেকেই জানা, শুধু কীভাবে সে ধরা পড়বে সেই রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা বা আকাঙ্ক্ষাটুকুকে ভর করে। ছবি কখন যে শেষ হয়ে যায় বোঝাই যায় না!‌
তবে হ্যাঁ, ন্যায়–‌অন্যায়ের একেবারে পরিষ্কার সাদা–‌কালো লড়াইযের মধ্যেও যাঁরা ধূসরতা খোঁজেন ও তা না পেলে তৃপ্তি পান না, এ’‌ছবি তাঁদের জন্য নয়। যাঁরা আইনের উর্দিধারী রক্ষককে অস্ত্র ধরে অন্যায় দমনকারীর ভূমিকায় দেখলে খুশি হন না, তার মধ্যে নানারকম জটিল লুকোনো রাষ্ট্রীয় সমীকরণ খোঁজেন ও বিদ্রুপ–‌মুখর হন ‘‌সুপারম্যান’‌ বা ‘‌সুপার ওম্যান’‌–‌এর উত্থান হল ব‌লে, এ’‌ছবি তাঁদেরও খুশি করবে না। এ’‌ছবি দৈত্য–‌দমনে প্রায় এক ‘‌দেবী’‌র গল্প বলে, পৌরাণিক কাহিনির মতোই ভাল আর মন্দ— এই দু’‌মেরুতে বিভাজিত হয়ে গিয়ে।
শিবানী শিবাজি রায় (‌রানি মুখার্জি)‌ আর এবার মুম্বইয়ের ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার নয়। বরং সে এখন রাজস্থানের কোটা জেলার পুলিশ সুপার। আর তার এলাকায় জটিলতা ঘন হয়ে ওঠে এক সিরিয়াল ‘‌রেপিস্ট’‌ তথা ‘‌কুলার’‌–‌কে কেন্দ্র করে। যার প্রতিটি অপরাধের গায়ে লেগে থাকে।
পুলিশকে, প্রশাসনকে, নীতিবোধকেও চ্যালেঞ্জ করার সাহস।
আরও অনেক কিছুর মতোই এ’‌ছবিতে আরও একটা অভিনব কৌশল ব্যবহার করেছেন পরিচালক। তা হল ধর্ষক সানি ওরফে ছদ্মবেশী বজরংকেই ছবির একটা বড় অংশ জুড়ে কাহিনির সূত্রধার করে রাখা। সোজা ক্যামেরার চোখে, মানে ‘‌টেকনিকালি’‌ দর্শকের চোখে (‘‌‌সমাজের চোখে’‌ বললেও আপত্তি করার আছে কি?‌)‌‌ চোখ রেখে লজ্জাহীনভাবে কথা বলে যায় সে। এমনকী নিজের জঘন্যতম কাজের সপক্ষেও তার মানসিক যুক্তির কথা অমনই অকপটে বলে চলে!‌ যা শুনতে–‌শুনতে দর্শককেও অস্বস্তিতে পড়তে হবে!‌ শিউরে উঠতে হবে!‌ বোঝা যায়, বিরাট অংশের নিষ্ক্রিয় জনসমাজের জন্য এই শক থেরাপিটিই সিনেমায় বেছে নিয়েছেন গোপী পুথরান। এক চাবুকের মতো। কারণ, আজকের সমাজে মুক্ত পরিসরে এভাবেই তো ধর্ষকেরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চোখে চোখ রেখে নিজেদের অপযুক্তির কথা ছড়িয়ে দেয়। যার বিরুদ্ধে চাবুক ধরার ডাক দিয়েছেন শিবানী। ডাক দিয়েছে এই সিনেমা।
শুধু সেই ধর্ষককেই ধরেননি শেষমেশ শিবানী, গোটা ধর্ষণ প্রবণতারই একরকম পোস্টমর্টেম করেছেন। এ’‌ছবির শেষে যে ধর্ষক ধরা পড়বে, এটা বলার মধ্যে কোনও অপরাধ নেই, কারণ,‌ এ’‌ছবি সাদা ও কালোর দ্বন্দ্ব। এবং খারাপ পক্ষের বিনাশের দিকেই এক পা এক পা করে এগোনো। তাকে যাঁরা ‘‌ফর্মুলা’‌ ভাবেন, নিন্দামন্দ করেন, এ’‌ছবি তাঁদের জন্য নয়।
রানি পাঁচ বছর পরেও একইরকম ফিট ও ধারালো। অভিনয়ে আরও ওজনদার। চমকে দেয় ধর্ষক চরিত্রে বিশাল জেটওয়া। একটি দৃশ্যে যিশু সেনগুপ্তও সাবলীল।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top