সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ মান্টো। পরিচালনা:‌ নন্দিতা দাশ। অভিনয়ে:‌ নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি, রসিকা দুগ্গল, তাহির রাজ ভাসিন, দিব্যা দত্ত, রণবীর শোরে, পরেশ রাওয়াল, তিলোত্তমা সোম, জাভেদ আখতার, ঋষি কাপুর।
সাদাত হোসেন মান্টোর ‘‌আফসানে কি আজব দুনিয়া’‌। গল্পের আশ্চর্য আলো–অন্ধকার জগৎ। যে জগতে ঢুকলে তার নেশা কাটানো ভারী কঠিন।
সেই জগৎটাকেই পর্দায় বড় রংদার, বড় মায়াময়ভাবে ধরেছেন পরিচালক নন্দিতা দাশ। তাঁর ‘‌মান্টো’‌ ছবির অন্তত অর্ধেক জুড়ে সাদাত সাহেবের আফসানা–সমূহ। পাঁচটি গল্পের সরাসরি চিত্রায়ণ। এছাড়া মুখে–মুখে আরও চার–পাঁচটি। সন্দেহ নেই, এই পাঁচটি গল্পের অংশই এই ছবির সেরা অংশ।
কিন্তু এই মান্টো–জগৎ–এর মায়ায় ভুলে নন্দিতা কোথাও যেন ঠিকঠাক মান্টো মানুষটাকে ধরতে ভুল করলেন। এই ছবিতে মান্টোর ছটফটানিটা আছে, কিন্তু তাঁর প্যাশনটা যেন অনুপস্থিত। এই ছবিতে মান্টো যে সব সংলাপ বলে তা ধারালো, সেই তীব্রতার পেছনে যে যন্ত্রণাটা, সেটা যেন খানিকটা সাজানো বলে মনে হয়। মান্টোর লেখাদের আমরা দেখতে পাই, তাদের পেছনে থাকা ঘটনাদেরও উল্লেখ পাই, কিন্তু মূল ভাঙচুরগুলো পাই না।
আর তা যে পাই না, তার একটা বড় কারণ বোধহয় এই ছবিতে দেশভাগ আর দাঙ্গাকে বড় বেশি শৌখিনভাবে ছুঁয়ে যাওয়া। মধ্যরাতে একটা স্বাধীনতার ‘‌জুলুস’‌ বা বাজি ফাটানো, কিংবা জুতোর দোকানে মান্টোর আটকে পড়া বা গান্ধীজির মৃত্যুতে লাহোরের পথে এক হালুয়াওয়ালার প্রতিক্রিয়া— সব ক’‌টাই বড় সাজানো বলে মনে হয়!‌ যে নন্দিতা ‘‌ফিরাক’‌–এর মতো সিনেমা বানিয়েছেন, দাঙ্গার বীভৎসতাকে ধরেছেন, তিনি কেন যে এই ছবিতে এত ‘‌সেফ’‌ খেললেন, তা বোঝা গেল না। অথচ দাঙ্গা আর দেশভাগের বিস্তৃতিকে না ধরলে, মান্টোকে ধরাই যাবে না। দাঙ্গা আর দেশভাগের যন্ত্রণাকে না ধরলে, মান্টোকে আজকের দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিকই করা যাবে না।
আসলে, মনে হয় নন্দিতা চালচিত্রের মোহে পড়েছেন। সাদাত হোসেন মান্টোর মাথার পেছনে টাঙানো বিরাট চালচিত্রের। আর সেই সুবাদে এই ছবি অনেকটা সময় ব্যয় করেছে স্বাধীনতা–পূর্ব বলিউডের স্টুডিও সিস্টেম আর তারকা–প্রথার পেছনে। ক্রমাগত চলেছে ‘‌নেম–ড্রপিং’‌–এর মতো ‘‌স্টার প্যারেড’‌। দেবিকারানি, হিমাংশু রায়, ফ্রাঞ্জ অস্টেন, নওশাদ, সকন্যা (‌কিশোরী নার্গিস)‌ জদ্দনবাই প্রমুখ। একমাত্র অশোককুমারকে শুধু একটি অর্থবহ দৃশ্যে পাওয়া গেছে। বাকিরা নিতান্তই চালচিত্রের আঁকিবুকি!‌ জদ্দনবাইবেশী ইলা অরুণের গান গাওয়ার দৃশ্যটি তো প্রায় গুঁজে দেওয়া ‘‌আইটেম সঙ’‌–এর মতো লেগেছে।
অথচ, নন্দিতার মনে রাখা উচিত ছিল,  যাঁদের নিয়ে তিনি এই রূপকথাটি গাঁথতে চেয়েছেন, তাঁরা তাঁদের তাবৎ খ্যাতি–দাপট ইত্যাদি নিয়েও মান্টোর কাছে ছিলেন ‘‌গাঞ্জে ফেরেশতে’‌। টেকো দেবদূতকুল। এই পর্বের রচনারাজিকে মান্টো নিতান্তই আয়ের জন্য করা কাজ বলে মনে করতেন।
নন্দিতা এই স্টার প্যারেডের প্রবণতা ছাড়তে পারেননি ‘‌প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’‌–এর চা পানের আড্ডাতেও। সেখানে কিসান চন্দর, সাহির লুধিয়ানভি কেবলমাত্র এক দৃশ্যের দুটি তর্ক–করা চরিত্র হিসাবে আসে। ইসমত চুগতাই, মান্টোর জীবনের স্বঘোষিত সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং শত্রু গোটা তিনেক দৃশ্যে আসেন। কিন্তু একবারও তাঁদের সম্পর্কের প্যাশন এবং গভীরতা বোঝা যায় না!‌ প্রথমার্ধে এ সব নিয়েই কেটে যায়। আর তার ফাঁকে শ্যাম চাড্ডা নামক যে বন্ধুকে ঘিরে নানা ব্যক্তিগত আবেগের দৃশ্যের অবতারণা করা হয়, সেটা এই সিনেমার পক্ষে বড়ই ‘‌মেলোড্রামাটিক’‌ লাগে।
দ্বিতীয়ার্ধ আবার খানিকটা রুদ্ধশ্বাস কোর্টরুম ড্রামাকে নির্ভর করে গড়ে ওঠে। ‘‌ঠান্ডা গোস্ত’‌ গল্পের জন্য আদালতে অশ্লীলতার অভিযোগে দায়রা সোপর্দ হয়েছেন মান্টো, তার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও উর্দু কবি ফৈজ আহমেদ ফৈজ বলছেন, এই লেখা অশ্লীলতা নয়, তবে সাহিত্য পদবাচ্যও নয়। যা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে মান্টোকে। প্রগতি সাহিত্য শিবিরের তরফ থেকে বারবার অভিযোগ উঠছে, মান্টোর সাহিত্য নৈরাজ্যকামী, হতাশাবাদী। মান্টো উত্তরে বলছেন, সব পক্ষকেই বলছেন, তিনি একটা আয়নার মতো, যাতে সমকাল আর জীবন প্রতিফলিত হচ্ছে। যদি তা কুৎসিত দর্শন হয়, তবে বুঝতে হবে সময়টাই কুৎসিত।
এইসব কথা, কান্না, লড়াই থেকে উঠে আসতে পারত প্রকৃত মান্টো আর তার মেজাজ, কিন্তু এই অর্ধেক কোর্টরুম দৃশ্যের প্রাবল্য ঢেকে দিয়েছে সে সম্ভাবনাকে। আদালতে জেতাটাই যে সব নয়, অন্তত মান্টোর মতো লেখকের কাছে কিছু নয়, তা বোঝা যায়নি। এই ছবির সবচেয়ে জোরের জায়গা এবং টুকরো টুকরোভাবে মান্টোর গল্পের চিত্রায়ণগুলি। এই জায়গাটায় নন্দিতার জিতে যাওয়ার আরও একটা কারণ আছে। এক গাদা দক্ষ শিল্পীকে ব্যবহার করা। পরেশ রাওয়াল, দিব্যা দত্ত, রণবীর শোরে, তিলোত্তমা সোম প্রমুখ।
এই ছবির আরেক জোর, বলাই বাহুল্য, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। শুধু চেহারার স্থাপত্যে নয়, চাউনির সিনে–ভাষায় নয়, আমর্মই যেন তিনি হয়ে উঠেছেন মান্টো। এমন চরিত্রায়ণ প্রবল একাত্মতা ছাড়া সম্ভব নয়। রসিকা দুগ্গলও যেন হুবহু মান্টোর স্ত্রী সোফিয়া। দর্শনে এবং মননে। তবে এই দু‌জনের মুখোমুখি কথাবার্তা যেন জায়গায় জায়গায় বড় বেশি শান্ত। সাজানো।
বছর তিনেক আগে পাকিস্তানের ছবি ‘‌মান্টো’‌ দেখেছিলাম। সারমাদ খুসত–এর পরিচালনায়। নাঃ, ব্যাপ্তিতে, প্যাশনে, যন্ত্রণায় সে–‌ছবিকে ছাপাতে পারল না এ–‌ছবি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top