উদ্দালক ভট্টাচার্য

 

আমরা কেন বেঁচে আছি?‌ এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর হয় না। হলেও, তা গুছিয়ে বলতে পারা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভব। অনুরাগ কাশ্যপ মনমর্জিয়া ছবিতে যে গল্পটা নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লড়ে গেলেন, সেটাও কিছুটা এই প্রশ্নের মতোই। লোকে কেন প্রেমে পড়ে?‌ মোদ্দা প্রশ্ন এটাই। উত্তর আছে কি না, সেটা দর্শক বুঝে নেবেন।

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন ছবির সংখ্যা ভুরিভুরি। তাহলে কেন?‌ মানে কাশ্যপ কেন বানাচ্ছেন এই ছবি?‌ কয়েকদিন আগে নেটফ্লিক্সে একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম, অনুরাগ বলছেন, ছোটবেলায় তাঁর গল্প স্কুলের পত্রিকায় নেওয়া হতো না। কারণ, সেই গল্পে ছিল অসংখ্য ‘‌ডার্ক এলিমেন্ট’‌। একটা সময়ে নিজেকে ‘‌মেন্টাল’‌ ভাবতে শুরু করেছিলেন অনুরাগ। কিন্তু পরে বিশ্ব সিনেমার সঙ্গে, সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর মনে হয়, যে না তিনি ‘‌মেন্টাল’‌ নন, স্বাভাবিক। 

মনমর্জিয়া সেই স্বাভাবিক অনুরাগের একটা স্বাভাবিক ছবি। ভিকি কৌশলের চরিত্রের নাম ভিকি, তাঁর সঙ্গে জাপটে জুপটে প্রেম করছে রুমি (‌অনুষ্কা শর্মা)‌। কিন্তু ভিকি উত্তম প্রেমিকই শুধু, আবেগি। তাঁর কাছে প্রেমই সব। বিয়ে–টিয়ের দায়িত্ব নিতে সে পারে না। কিন্তু রুমি চায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলুক ভিকি। বিয়ে করুক। একটা সামাজিক মর্যাদা পাক সম্পর্ক। তা বাস্তবায়িত হয় না, মাঝখান থেকে এসে পড়ে রব্বি ভাটিয়া (‌অভিষেক বচ্চন)‌। তাঁর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় রুমির। কিন্তু ভিকি না রব্বি, তাই নিয়েই সংশয় তৈরি হয় রুমির মনে। একদিকে ভিকির শরীরী প্রেম (‌সিনেমাতে যাকে ফেয়ার বলা হয়েছে)‌ আরেকদিকে রব্বির স্থায়ীত্ব, দুয়ের টানাটানিতেই কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে রুমি। দ্বিধা খুব স্বাভাবিক, কারণ তাঁর সামনে সম্পর্কের উদাহরণ হিসাবে যা আছে, তা বিয়ে করতে উপদেশ দেয়, কিন্তু শরীর টানে ভিকিকে। 

এই গল্পের কোনো শেষ হয় না। যদি শেষ হত, মানুষের জীবনের অর্ধেকের বেশি সমস্যাই মিটে যেত। তাই সিনেমা শেষ করতেও অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছেন অনুরাগ কাশ্যপ। কিন্তু সে অপরাধ আরাম করে মাফ করা যায়, কারণ, নতুন বোতলে পুরনো মদ উনি দেননি। রব নে বানা দি জোড়ি, কভি আলবিদা না কেহনা, অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল, কিম্বা ইমরান খানের অখ্যাত এক ম্যায় অওর এক তু বানাননি অনুরাগ। এই সবকটা সিনেমার গল্প কাছাকাছি, নায়ক নায়িকার প্রেম, অভিমান, দুঃখ, রাগ এসব প্রায় একই রকম ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে দেখানো হয়েছে। অনুরাগ সেটা দেখাননি, কোথায় এসেছে যমজ সাজেস্টিভ চরিত্র, কোথাও বিজিএমে এমন গান বাজিয়েছেন তিনি, যাতে এই সম্পর্কের একঘেয়েমি কাটেনি দর্শকের। সিনেমাটা দেখে খুব আবেগি দর্শকও একবারের জন্য কেঁদে উঠবেন না, কারণ সবটাই স্বাভাবিক, সাধারণ ভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক। অভিনেতারাও সেই কাজটা করে গিয়েছেন। ভিকি কৌশল, তাপসী পান্নু তো বটেই, অভিষেক বচ্চনও কিন্তু একটা অনাবিল সারল্য বজায় রাখতে পেরেছেন চরিত্র, যা ছবির শেষে শান্তি দেয়।

অনুরাগের পরিকল্পনায় গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের শেষ দৃশ্যটি নাকি মোট ১২ মিনিটের দাঁড়িয়েছিল। আর সেটা পরে কেটেকুটে হয় ন’‌মিনিটের। মনমর্জিয়ার শেষ দৃশ্যও তেমনই কম করে মিনিট পাঁচেকের। হাঁটতে হাঁটতে অভিষেক বচ্চন আর তাপসী পান্নু কথা বলতে থাকেন, নানা অ্যাঙ্গেল থেকে তাঁদের দেখাতে থাকে ক্যামেরা। সেই পথ শুরু হয় বিচ্ছেদের কাগজে সই করার পর, শেষ হয়। কিন্তু সত্যি শেষ হয় কি ? মনে হয় না। সিনেমার কাঁচা কাজ শুধু এটুকুই। ওভাবে গল্পে দাঁড়িটা না টেনে দিলেই পারতেন অনুরাদ কাশ্যপ। 

জনপ্রিয়

Back To Top