অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: সেজন্যই তিনি মহানায়ক। বীরেন্দ্রকৃষ্ণর ‘‌মহালয়া’‌র বদলে যখন নতুন ‘‌মহালয়া’‌ এল রেডিও–‌য়, সেখানে মাত্র মিনিট চারেক কণ্ঠ দিয়েছিলেন উত্তমকুমার। তবুও, সেই ‘‌মহালয়া’‌ চিহ্নিত হয়ে গেল উত্তমকুমারের ‘‌মহালয়া’‌ হিসেবে। এটাই মহানায়কের মহিমা।
কিন্তু, সেই উত্তম–‌মহালয়া প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বাংলার লক্ষ–‌লক্ষ মানুষ, আকাশবাণীর লক্ষ–‌লক্ষ শ্রোতা। ফলে আবার ফিরে এসেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। যদিও লাইভ নয়, ‘‌রেকর্ডিং’‌ নিয়ে। যে রেকর্ড–‌ই তখন বাজত মহালয়ার ভোরে। সেবার উত্তমকুমারের অনুষ্ঠান, ওই একবারই, বীরেন্দ্রকৃষ্ণর মহালয়াকে লগ্ন–‌চ্যুত করেছিল। সেবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণর ‘‌মহালয়া’‌ এসেছিল ষষ্ঠীর ভোরে। পরের বছর থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ যথারীতি বাঙালির পুজোর আবহ এনে দিয়েছেন মহালয়ার ভোরে।
এক ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই ঘটনাকে ফিচার ফিল্মে নিয়ে এলেন সৌমিক সেন। এবং ফিচার ফিল্মের নিয়ম মেনেই বিস্তৃত জায়গা নিলেন উত্তমকুমার। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তো অনেকটা জুড়ে থাকবেন-‌ই। কারণ, মহালয়া মানেই তো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
যেহেতু ডকুমেন্টারি নয়, তাই কল্পনার অনেকটাই স্বাধীনতা নিয়েছেন পরিচালক। এবং ফিচার ফিল্ম হিসেবে ‘‌মহালয়া’‌ সত্যিই অন্যরকম ছবি। না, তথাকথিত কোনও ফর্মুলা নেই ছবিতে। বাঙালির হৃদয়ে প্রোথিত একটি চিরকালীন অনুষ্ঠানকে ঘিরে এমন একটি ছবির পরিকল্পনা সত্যিই অভিনব।
এই ছবিতে উত্তমকুমার এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এসেছেন স্বনামে। মহালয়া–‌র আর এক স্তম্ভ পঙ্কজকুমার মল্লিকও স্বনামেই আছেন। কিন্তু বিকল্প অনুষ্ঠানের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যিনি ছবিতে আছেন, তাঁকে ‘‌বড়দা’‌ বলে ডাকা হলেও, তিনি আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই।
এ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও পঙ্কজ মল্লিকের ব্যক্তিত্বের সংঘাতকে নিয়ে আসা হয়েছে ছবির গল্পের স্বার্থে। কিন্তু, সেই সময়, জরুরি অবস্থার চাপেই যে পাল্টে ফেলতে হল চিরাচরিত মহালয়ার অনুষ্ঠান, সেটা কিন্তু স্পষ্টভাবেই চিহ্নিত হয়েছে ছবিতে। যা কিছু ‘‌চিরাচরিত’‌, যা কিছু ‘‌পুরনো’‌, তাই বাতিল করার জরুরি-‌ফরমান সেই সময় তছনছ করেছিল বহুকিছু।

তারই একটা দৃষ্টান্ত— মহালয়া। ফলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নন, পঙ্কজকুমার মল্লিককে ‘‌বাতিল’‌ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল রেডিও–‌র বস্‌–‌এরও বস্‌— যাঁকে ছবিতে দেখা যায়নি। সেই সময় বাঙালিকেও তুচ্ছ-‌তাচ্ছিল্য করার নমুনা চিহ্নিত করেছে এই ছবি। এবং, সেই সব তুচ্ছ–‌তাচ্ছিল্যকে নস্যাৎ করে চিরাচরিত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ছবিতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালবাসা ও প্রতিবাদ যে বস্‌–‌এর বস্‌–‌কেও নস্যাৎ করে দিতে পারে, মহালয়া সেটাও প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে ছবির স্বার্থে, কাহিনীর নাটকীয়তার জন্যে হেমন্ত–‌পঙ্কজ ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত ছবিতে এলেও, দুই শিল্পীর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জয়ী হয়েছে শেষ পর্যন্ত। জ্যেষ্ঠ আশীর্বাদ করেছেন কনিষ্ঠকে। আর, একদা ‘‌গুরু’‌–‌র গাওয়া ‘‌দিনের শেষে ঘুমের দেশে’‌ যখন গেয়ে ওঠেন ‘‌শিষ্য’‌, তখন পঙ্কজ–‌হেমন্ত সঙ্ঘাত মিথ্যা হয়ে যায়। এক গভীর অনুভূতিময় দৃশ্য তৈরি হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণর জয় দেখাতে গিয়ে উত্তমকুমারকে ছোট করা হয়নি ছবিতে। স্বয়ং উত্তম–‌ই অনুভব করেছেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণর মহালয়া না শুনলে, পুজো–‌পুজো ভাবটাই আসে না। এখানেই জিতে যায় ‘‌মহালয়া’‌ ছবি। সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র এ–‌ছবির আবহকে মর্যাদা–‌সম্পন্ন করেছেন। মৃন্ময় নন্দীর ক্যামেরাও প্রশংসাযোগ্য।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণর ভূমিকায় শুভাশিস মুখোপাধ্যায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তবে, সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল যিশু সেনগুপ্তর। উত্তমকুমার হয়ে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু যিশু দক্ষতার সঙ্গে নিজের মতো করে উত্তমকুমার হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। দুই সঙ্গীত পরিচালকের চরিত্রে শুভময় চট্টোপাধ্যায় ও সপ্তর্ষি রায় ভাল অভিনয় করেছেন। জয়ন্ত কৃপালনি, কাঞ্চন মল্লিক, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়কে ভাল লাগে।
আর, এছবির সত্যিকারের ভিলেন, ‘‌শশী’‌র ভূমিকায় চমকে দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। নিজে প্রযোজক হয়ে নিজেকেই এমন একটা চরিত্রে নিয়ে আসার সাহস তিনিই দেখাতে পারেন। একটা বাড়তি সাবাস তাই প্রসেনজিতের প্রাপ্য।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top