অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: যে মানুষ অন্য অনেক মানুষকে আনন্দের কথা শোনায়, কখনও সত্যি-‌সত্যিই ভরসা জোগায় শুধু কণ্ঠ-‌স্বর দিয়ে, তার সেই স্বর যদি কখনও রুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাকে কে ভরসা দেবে?‌ সত্যিই কি তাকে ভরসা দেওয়া যায়?‌
কঠিন প্রশ্ন। উত্তরও কঠিন। কিন্তু ‘‌কণ্ঠ’‌ ছবিতে সেই কঠিন প্রশ্নটাকে বাস্তবের হাত ধরে সমাধানের দিকে নিয়ে গেছেন দুই পরিচালক নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
এই ছবির প্রধান চরিত্র অর্জুন (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ একটি এফ এম চ্যানেলের উপস্থাপক। আজকের ভাষায় রেডিও-‌জকি। তার লাইভ অনুষ্ঠানে প্রচুর শ্রোতা প্রশ্ন করেন। অর্জুন সেইসব প্রশ্নের উত্তর দেন। গান বাজিয়ে শোনান। কিন্তু পেশার সঙ্গে যখন ভালবাসা মিশে যায়, তখন সেই কাজটা নেহাৎ-‌ই ‘‌কাজ’‌ থাকে না, দায়িত্ব-‌ও হয়ে ওঠে। ছবির শুরুতেই সেই দায়িত্ব থেকেই এক চরম হতাশায় আক্রান্ত কিশোরীকে জীবনে ফেরানোর জন্যে অস্থির হয়ে ওঠে অর্জুন। আর, ঘটনাচক্রে, সেই অর্জুনকেই জীবন থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে ক্যানসার। তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। বাদ যায় তার স্বর-‌যন্ত্র। তারপর শুরু হয় আসল লড়াই।
সেই লড়াইয়ে একসময় তার পাশে এসে দাঁড়ায় স্পিচ থেরাপিস্ট রোমিলা (‌জয়া আহসান)‌। শুরু থেকেই পাশে ছিল স্ত্রী পৃথা (‌পাওলি দাম)‌। ক্যানসারে কণ্ঠ রোধ হয়ে গেছে অর্জুনের, কিন্তু টেলিভিশনের প্রেজেন্টার পৃথাকে তো কাজ করতেই হয়। সেখানেও তো কণ্ঠকেই ব্যবহার করে পৃথা। তাতে যেন সঙ্কুচিত পৃথা। অর্জুন যে কথা বলতে পারে না!‌ এই ‘‌দ্বিধা’‌টুকুও বেশ ভালভাবে ধরা পড়েছে চিত্রনাট্যে।
এই চিত্রনাট্য একটা সময় প্রায় তথ্যচিত্রের ধাঁচে দর্শকদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে ক্যানসারে স্বরযন্ত্র বাদ যাওয়ার পরেও একজন মানুষ কীভাবে কথা বলবে। সেই পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় এই ছবি সত্যিকারের ল্যারিঞ্জেকটোমি রোগীদের সংস্পর্শে নিয়ে আসে আমাদের। এবং আমরা এক না-‌জানা জগতে ঢুকে যাই।
‘‌কণ্ঠ’‌ নেহাৎ-‌ই একটা ছবি নয়। বরং এক দায়বদ্ধতা। নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদের ছবিতে আবেগ থাকে। এখানেও আছে। কিন্তু তার পাশাপাশি ফর্মুলা অগ্রাহ্য করা একটা কাহিনিকে সহজ ও গভীরভাবে দর্শকের কাছে উপস্থাপন করেছেন এই দুই পরিচালক।
অর্জুনের ভূমিকায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় খুবই সুন্দর অভিনয় করেছেন। কণ্ঠহীন অর্জুনের ‘‌কণ্ঠস্বর’ ফিরে পাওয়ার জার্নিকে  অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিবপ্রসাদ। পৃথার ভূমিকায় সংবেদনশীল অভিনয় পাওলি দামের। রোমিলার চরিত্রে জয়া আহসানও সুন্দর। তাঁর বাঙাল ভাষা শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে। চিত্রা সেন, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, তনিমা সেন অনবদ্য। স্বাভাবিক অভিনয় ডাক্তারের চরিত্রে বিপ্লব দাশগুপ্তর। অর্জুন-‌পৃথার ছেলের চরিত্রে ঈশিত খুব সুন্দর। ভাল লাগে রোমিলার মেয়ের চরিত্রে সৃজনীকে।
ছবির মূল সুরকে বজায় রেখে সঙ্গীত করেছেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, অনুপম রায় আর প্রসেন।
সব মিলিয়ে অপরাজিত এক জীবনের কথা বলে ‘‌কণ্ঠ’, যা অনুপ্রাণিত করবে বহু মানুষকে। আর ছবিতে নজরুলের একটি বিখ্যাত কবিতাকে যে ভাবে র‌্যাপের ছন্দে ব্যবহার করা হয়েছে, তা সত্যিই অভিনব। হাজার বাধাতেও মানুষের ভেতরের কণ্ঠকে আটকে রাখা যায় না, এই বন্দনাকেই যেন কুর্নিশ জানিয়েছে নজরুলের কবিতার ব্যবহার। তবুও ছবি শেষে, রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়ে যায়—দু’‌বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না। হ্যঁা, এই কথাটাই শেষ পর্যন্ত বলতে চেয়েছে ‘‌কণ্ঠ’। বলতে চেয়েছে বেঁচে থাকার কথা। বলতে চেয়েছে, ক্যানসারের চেয়ে জীবন অনেক বড়। অনেক, অনেক।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top