সম্রাট মুখোপাধ্যায়: কলকাতায় কোহিনুর। পরিচালনা:‌ শান্তনু ঘোষ। অভিনয়ে:‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, বরুণ চন্দ, ইন্দ্রাণী দত্ত, দেবদূত ঘোষ, অঙ্কিতা মজুমদার, অনুপ পান, মোনা দত্ত।
একটু ‘‌বাজেট’‌ বাড়াতে পারলে, অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজাখুঁজিতে ‘‌লোকেশন’‌ আর ‘‌আউটডোর’‌ বাড়াতে পারলে, এ ছবি কিন্তু স্পিলবার্গের সেই বিখ্যাত ‘‌ইন্ডিয়ানা জোনস’‌ সিরিজকে মনে করিয়ে দিতে পারত। অন্তত গল্পে সেই রসদ আর হাতছানিটা ছিল।
কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে চিত্রনাট্য তো আর সিনেমা নয়। যেমন সিনেমা ‘‌বই’‌ নয়। সে এক প্রধানত দৃশ্যগ্রাহ্য শিল্প। চলমান চিত্রমালা। তার শিহরন–সৃষ্টির ক্ষমতা শুধু শ্রুতিতে নয়, বরং দৃশ্য–সৃষ্টিতে। ছবির আলো–আঁধারি–বৈচিত্র‌্যে তার রহস্যসৃষ্টির মূল ক্ষমতা। ‘‌নয়্যাঁর’‌ বা রোমাঞ্চ–ধারার সিনেমায় ক্যামেরার তাই এত দাপট সেই হলিউডি আদি–যুগ থেকে।
তাকে কিছুটা যেন উপেক্ষা করেই মূলত সংলাপনির্ভর একটা গল্প–শোনানোয় আস্থা রাখতে গেছেন পরিচালক শান্তনু ঘোষ। তাঁর ছবি ‘‌কলকাতায় কোহিনুর’‌–এ। আর তাতেই শক্তপোক্ত একটি কাহিনি ও চিত্রনাট্য মজুদ থাকতেও তাঁর ছবি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে মাঝে মাঝেই।
অথচ এ ছবির গোয়েন্দা বা রহস্যসন্ধানী যা–ই বলা যাক, সেই চরিত্রে আছেন স্বয়ং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যিনি এমন চরিত্রে থাকা মানেই বাঙালি দর্শকমানসে ‘ফেলুদা–নস্টালজিয়া’‌র অনিবার্য উত্থান। আর পরিচালকের বক্স–অফিসে একটা বাড়তি ‘‌ক্রাচ’‌ পেয়ে যাওয়া। এটা বেশ লক্ষণীয় বিষয় যে সেটা বুঝেও শান্তনু কিন্তু তাঁর ছবিতে সৌমিত্রবাবুকে ‘‌শ্যাডো’‌ ফেলুদা হিসেবে একবারও ব্যবহার করেননি। চালে–চলনে–ইমেজে কোথাও না। এমন সংযম সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। বরং সৌমিত্রবাবু যেন স্টিভেন স্পিলবার্গের সেই আটের দশকীয় ‘‌কাল্ট’‌ চরিত্র ইন্ডিয়ানা জোনস। পেশায় পুরাতাত্ত্বিক, গভীর পাঠক, মনস্ক জনপ্রিয় অধ্যাপক এবং বুদ্ধিতে ও অজানাকে জানবার ইচ্ছায় তুখোড় রহস্যসন্ধানী। বলাই বাহুল্য, ‘‌ইন্ডিয়ানা জোনস’‌–এর সেই মধ্য–তিরিশসুলভ (‌হ্যারিসন ফোর্ড করেছিলেন)‌ শারীরিক চটপটেপনা দেখানো মধ্য–আশির সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সংলাপের ক্ষুরধার বাচনে আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখের ঝিলিকে এক অন্য সপ্রতিভতা এনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অন্যভাবে দারুণ সামলেছেন এই ড.‌ সাত্যকি বোস চরিত্রটিকে। ছবি জুড়ে কোহিনুর হীরে সংক্রান্ত অসংখ্য তথ্য, তন্ত্র–মন্ত্র–মন্দির–উপাসনা ইত্যাদি সম্বন্ধীয় সংলাপের ভিড়—  তাকে কীভাবে বাচনের সরসতায় সামলাতে হয়, তা নবীন অভিনয় শিক্ষার্থীরা এ ছবি দেখে শিখতে পারেন। এ যেন সৌমিত্রবাবুর নেওয়া এক পর্দা–ক্লাস।
এ ছবিতে তো আবার জোড়া ফেলুদা–ছায়া। সৌমিত্র–উত্তর–ফেলুদা সব্যসাচী চক্রবর্তীও ছবিতে আছেন। তিনিও আরেক পুরাতাত্ত্বিক ড.‌ অর্ণব সেন। মিউজিয়ামের কোহিনুর–কক্ষে দাঁড়িয়ে দু’‌জনের ইতিহাস বলে যাওয়ার উতোর–চাপানটিই ছবির সেরা দৃশ্য। তবে দু’‌জনকে ঘিরে ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌ দৃশ্যটি আরও নাটকীয় হওয়া উচিত ছিল। এ দু’‌জনের মাঝে আরও এক প্রত্নতাত্ত্বিক চরিত্র আছে।
ড.‌ তাপসরঞ্জন সরকার। যাঁর নাতনির আঠারো বছরের জন্মদিনের জন্য রেখে যাওয়া উপহারের বাক্স নিয়েই যত কাণ্ডের সূত্রপাত। নাতনি অ্যাবিকে (‌মোনা দত্ত)‌ সেই বাক্স তুলে দিতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হচ্ছে সায়ন গুহ (‌দেবদূত ঘোষ)‌। অ্যাবির অভিনেত্রী মা’‌ও (‌ইন্দ্রাণী দত্ত)‌ সেই রহস্যে জড়িয়ে পড়ছে। সৌমিত্র–সব্যসাচীর মাঝে এই তৃতীয় পুরাতাত্ত্বিক চরিত্রটি যাতে হারিয়ে না যায়, তাই এ চরিত্রে বরুণ চন্দের সংযোজন খুবই কার্যকরী হয়েছে। দেবদূত, ইন্দ্রাণীও যথাযথ।
সবই ঠিক ছিল। কিন্তু ওই যে, কোহিনুরের ঝলক চোখকে চমকাল না যে পর্দায়!‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top