এবার রহস্যপুরী। সমুদ্রের মতো হাতছানিময় আর বিপদসঙ্কুল সব সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া একদল নরনারী। এরপর খুন।
আর অকুস্থলে হাজির হনিমুনে আসা গোয়েন্দা।
সম্রাট মুখোপাধ্যায়
●‌ নীলাচলে কিরীটী। পরিচালনা:‌ অনিন্দ্যবিকাশ দত্ত। অভিনয়ে:‌ ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অরুণিমা ঘোষ, সমদর্শী দত্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়, ঋষভ, সুচন্দ্রা।
সম্পর্ক এবং সমুদ্র। দুটোরই ভেতরে একটা রোম্যান্টিক সৌন্দর্য আছে। দুটোরই ভেতরে আছে অজানার বিপদ।
আর নীহাররঞ্জন গুপ্তর ‘‌বসন্তরজনী’‌ থেকে সিনেমা করতে গিয়ে পরিচালক অনিন্দ্যবিকাশ দত্ত তাই আলাদা করে ‘‌আন্ডারলাইন’‌ করেছেন ওই দুটো ব্যাপারকে। সম্পর্ক আর সমুদ্র।
বলাই বাহুল্য, এটিও কিরীটী–কাহিনী। এবং বাড়তি ব্যাপার যেটুকু তা হল, ক্রাইম–কাণ্ডগুলি ঘটছে কিরীটীর ‘‌হনিমুন’‌ ট্যুরে। কৃষ্ণাকে বিয়ে করেছে কিরীটী। আর মধুচন্দ্রিমার জন্য বেছে নিয়েছে পুরীর সমু্দ্রতটকে। প্রসঙ্গত এটা বলে রাখা যাক, এটা মূল কিরীটী–কাহিনীর পাঁচ কিংবা ছ’‌য়ের দশকের পুরী নয়। বরং একেবারে হাল আমলের মোবাইল–ইন্টারনেট–সিসি টিভি শোভিত পুরী। কিরীটী উবাচ অনুযায়ী ‘‌রহস্যপুরী’‌। সেটাও এ ছবির নাম হতে পারত।
সন্দেহ নেই, গল্পের ভেতরে থাকা রহস্যের অলিগলিগুলোকে ভালই ব্যবহার করেছেন পরিচালক চিত্রনাট্যে এবং পর্দায়। একটি রহস্যময় অন্তর্ধান, দুটি খুন এবং একটি হত্যা–প্রচেষ্টায় রহস্যের শুরু এবং বিস্তার। সমুদ্রতট থেকে যা হোটেল ব্লু ভিউ ছুঁয়ে চলে গেছে এক আবাসিক নৃত্যগ্রাম পর্যন্ত। আলগোছে শুরু হওয়া কয়েকটা অদ্ভুত ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন ঘটনা জুড়তে জুড়তে তৈরি করে ফেলেছে এক ঘূর্ণি। বোঝা যায়, এই কাহিনীর ভিতর দিয়ে হাঁটতে থাকা চরিত্রদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক আর অতীত জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্যের মূল চাবি। কিন্তু কোথায়, কেন, কীভাবে— সেই উত্তরটার জন্য ছবির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। অনেকগুলো চমক আসে। বাঁক আসে। কিন্তু কোথাও পরিচালকের হাতের লুকোনো তাস আলগা হয় না। আগের ‌কিরীটী–‌ছবি ‘‌কিরীটী ও কালো ভ্রমর’‌ চমৎকার বানিয়েছিলেন অনিন্দ্যবিকাশ। এবারও বানালেন।
পুরীতে কিরীটীর সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে যায় পুরোনো পরিচিত কালী সরকারের (‌অভিষেক চট্টোপাধ্যায়)‌। এক নাচের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে। এর পরই কালীবাবু যে হোটেলে আছেন সেখানে গিয়ে কিরীটী জানতে পারে কালীবাবুর হঠাৎ অন্তর্ধানের কথা। এর পরপরই সমুদ্রতটে পাওয়া যায় ওই হোটেলের ওয়েটার আলির মৃতদেহ। জানা যায়, আলির সঙ্গে কালীর সমকামী সম্পর্ক ছিল। আলির ব্যাগে কালীর মোবাইলও পাওয়া যায়। এই রহস্যের সুতো ধরে তদন্ত করতে করতে কিরীটী পৌঁছে যায় হোটেলের মালকিন রুনা সান্যালের (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌ কাছে। রুনা  এক রহস্যময়ী নারী। যার আচরণ, দৃষ্টিপাত, মাদকাসক্তি, সচেতনভাবে ছড়ানো আবেদন, অতীত জীবন— সর্বত্রই গা–ছমছমে রহস্য। অজানার হাতছানি। সদ্য গুলির হাত থেকে বাঁচার পরে গোয়েন্দার মুখোমুখি হয়ে নিজের অন্তর্লীন বিষণ্ণতার কথা বলা বা সেই কথা বলার মাঝেই আচম্বিতে সোনালি আগুন তরল ‘‌অফার’‌ করা— এমন সব রোমাঞ্চকর মুহূর্ত নাটককে ঘন করেছে। বর্ণিল রেখেছে। এমন চরিত্রে ঋতুপর্ণা নিজের গ্ল্যামার আর অভিব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করেছেন। আবার নীরব মুহূর্তগুলোতে তাঁর অভিনয় দেখার মতো।
জানা যায়, রুনার বর্তমান স্বামী হারিত সান্যালের (‌শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়)‌ পাশাপাশি তার প্রাক্তন স্বামীও জড়িত আছে এই রহস্যে। আবার রহস্য ঘনীভূত হয় যখন কালীর তরুণী স্ত্রী এবং আরেক অনুমিত সমকামী সঙ্গীর সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ঢুকে পড়ে কালী সরকারের নতুন উইল। রহস্যের কয়েক পরত জমে যায়।
অনিন্দ্যবিকাশের সফলতা এখানেই যে, এতটা জটিল এবং প্রসারিত রহস্যকে পরতে পরতে বজায় রাখতে পেরেছেন তিনি। সঙ্গে আরও কয়েকটি সিনেম্যাটিক উপাদানের চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি। স্বপ্নে অন্তর্হিত ব্যক্তির সঙ্গে দাবা খেলা, হোটেলের দেওয়াল জুড়ে আঁকিবুকি, সাউন্ড ট্র‌্যাকে ধ্রুপদী সঙ্গীতের রহস্যঘন ব্যবহার ইত্যাদি ছবির মেজাজ গড়ে দিয়েছে যথার্থভাবে। তবে ত্রুটিও আছে কোথাও কোথাও। যেমন, প্রথমার্ধে ধীরগতিতে গল্প এগোনো। কিছু কিছু চরিত্রের হঠাৎ আসা, হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়া। কিরীটীর বারবার ‘‌হোমসীয়’‌ কায়দায় সামনে থাকা অচেনা ব্যক্তির ব্যাপারে অনেক কিছু বলে যাওয়া। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাপারগুলো অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে।
ফেলুদা, ব্যোমকেশের মতো ‘‌সুপারস্লুথ’‌ ব্যাপারটা কিরীটীর মধ্যে রাখেননি অনিন্দ্যবিকাশ সচেতনভাবেই। তাঁর কিরীটী অনেকটাই ‘‌ডাউন টু আর্থ’‌। সেই ব্যাপারটা অভিনয়ে চমৎকার এনেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। আবার ভাবনার মুহূর্তগুলোতে তাঁর দৃষ্টিপাত বা অভিব্যক্তি উল্লেখযোগ্য। গল্পের মাঝপথে কলকাতা থেকে এসে যোগ দেয় সহকারী সুব্রত। এই চরিত্রে সমদর্শী দত্ত দারুণভাবে মানানসই। বরং কৃষ্ণাকে মাঝে মাঝে চিত্রনাট্যে বড় ঘ্যানঘেনে লাগে। অরুণিমা ঘোষের এই চরিত্রে বেশি কিছু করার ছিল না। অনেকদিন পরে অন্যরকম এক চরিত্রে বেশ ভাল লাগল অভিষেক চট্টোপাধ্যায়কে। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top