সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ খেলাঘর। রচনা:‌ হেনরিক ইবসেন। নাট্য অনুবাদ:‌ রতনকুমার দাস। পরিচালনা:‌ বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রয়োজনা:‌ প্রাচ্য।
এই নাটক এমন এক নাটক, মা বাংলা থিয়েটারের ব্রহ্মা–‌বিষ্ণু–‌মহেশ্বর শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত তিনজনেই মঞ্চস্থ করেছেন। শম্ভুবাবু সফল হয়েছেন। অন্য দু‌জন হননি। অর্থাৎ এ নাটকে হাতছানি ও চোরাবালি উভয়ই উপস্থিত চিরকাল।
ফলে আদতে ১৪০ বছরের পুরনো এ নাটক করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না পরিচালক বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। নারীর জীবনে অন্দরের অবরোধ আর তা থেকে মুক্তি খোঁজার এ নাটক এককালে বিদ্রোহের যে চমকটা তৈরি করত শেষে, যার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘‌স্ত্রীর পত্র’‌কে মিলিয়ে পড়তে চাইতেন অনেকে, সেই অবস্থাটা অনেকটা বদলে গেছে। নারীবাদী ধারণার প্রসার ও পাঠগুলো বদলে–‌বদলে যাওয়ার কারণে। আজ আর এ নাটকের অন্তিমে স্বামীর ‘‌চরণতলাশ্রয়ছিন্ন’‌ হওয়াটা ততটা চমক জাগাবে না, এটা বুঝেছেন বিপ্লব। আর তাই রতনকুমার দাসের এ বঙ্গীকরণে তিনি দু‌টো অন্য জায়গাকে ‘‌মাউন্ট’‌ করেছেন।
এক, নীরার আত্মপরিচয় খোঁজাকে নিছক দাম্পত্য সংলগ্ন না রেখে, তাকে বৃহত্তর মাত্রা দিয়েছেন। যা বোঝা গেছে বান্ধবী কাবেরীর সঙ্গে কথোপকথনে বা ড.‌ রক্ষিতের অস্ফুট প্রেম নিবেদনের মুহূর্তে, অথবা কালিকার চক্রান্তের ভেতরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর মোকাবিলায়। ইউসেনের নোরা এখানে বাঙালির সুনীল–‌মানস মথিত হয়ে যেন হয়েছে নীরা। এই প্রশ্ন বা সমস্যাগুলো মূল নাটকেও ছিল। বিপ্লবের পরিচালনায় তা ঈষৎ তীব্রতর হয়েছে আধুনিক জীবনের সংস্থাপনে। যেমন ডাক্তারকে সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে তমোনাশের ‘‌রি–‌অ্যাক্ট’‌ করা আর তার অভিঘাত নীরার ওপর পড়া। বা আগের দৃশ্যে প্রেম নিবেদন করা ডাক্তারকে দেখে পরের দৃশ্যে নীরার কুণ্ঠা ও কৌতূহলের মধ্যবর্তিতায় চলে যাওয়া।
সন্দেহ নেই, পরিচালকের এই পরিকল্পনা সফল হতে পারত না চৈতি ঘোষালের কুশলী অভিনয় ছাড়া। দ্বিধা, সংশয়, প্রশ্নে মথিত হওয়ার ছটফটানি, অসহায়তা থেকে দৃঢ়তার পথে জার্নি সবটাই ছোট ছোট অভিব্যক্তিতে কিন্তু যুক্তিসঙ্গত ধারাবাহিকতায় গড়ে তুলেছেন চৈতি। তাঁর ‘‌বহুরূপী–‌শিক্ষা’‌র ঐশ্বর্য এ নাটকে তিনি যেন উজাড় করে দিয়েছেন। একদিকে  চরিত্রের ধ্রুপদীয়ানাকেও তিনি ধরেছেন পরিশীলিত আভিজাত্যে, মৃদু চলনে, সংযমী অঙ্গ–‌সঞ্চালনে;‌ অন্যদিকে প্রয়োজনে চোখে, কণ্ঠে ঝড়ের ইঙ্গিতও রেখেছেন, যাতে ধরা পড়েছে আধুনিক নারীও। সন্দেহ নেই, তাঁর এই বিস্তীর্ণ ‘‌রেঞ্জ’–‌এর অভিনয়ই এ নাটকের মূল সম্পদ।
দুই, বিপ্লবের পরিকল্পনায়  নাটকে আর দাম্পত্যের বোঝাপড়া কেন্দ্রে না থেকে, বহিপরিসরে সরে গেছে। কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে নীতি–‌দুর্নীতির‌ প্রশ্নটি। দু‌টি দুর্নীতি মূলক ঘটনা ঐ নাটকে পরপর ঘটে। একটিতে আপাত আদর্শবান বলে পরিচিত অধ্যাপক স্বামী তমোনাশের কাছে স্খলিত বলে পরিচিত হতে পারে নীরা, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর তা হয় তমোনাশের কুটিল সহকর্মী কালিকার ‘‌ব্ল্যাকমেল’‌–‌এ। আবার সেই কালিকাই নীরাকে ধরিয়ে দিয়ে যায় তমোনাশের চরিত্রের মারাত্মক এক অসঙ্গতি। কোনটি বৃহত্তর, তা নিয়ে এবার শুরু হয় টানাপোড়েন। যেখানে এক বড় ভূমিকা পালন করে নীরার বান্ধবী কাবেরী।
মূল চরিত্র নীরার সঙ্গে স্বামী, ডাক্তার আর বান্ধবীর সংলাপ বিনিময়ই এ নাটকের প্রাণ। তা বুঝেই এ তিন চরিত্রে তিন অভিজ্ঞ অভিনেতা–‌অভিনেত্রীকে নেওয়া হয়েছে। তমোনাশ  হিসাবে দেবশঙ্কর হালদার চরিত্রের বহুমাত্রিকতাকে স্পর্শ করেছেন যেন সঙ্গীতের ‘‌রিড’‌ ছোঁয়ার মমতায়। ডাক্তার হিসাবে বিপ্লব স্বয়ং অনবদ্য। এবং সূক্ষ্মতম মাতাল হওয়ার দৃশ্যটিতে। ‘‌পজ অ্যাক্টিং’‌–‌এর কুশলী প্রয়োগে অঞ্জনা বসুও সহ–‌চরিত্রকে মুখ্য করে তুলেছেন। কালিকা চরিত্রে শান্তনু চট্টোপাধ্যায় প্রথমদিকে কিঞ্চিৎ অস্পষ্ট থাকলেও চূড়ান্ত দৃশ্যে সাবলীল।
বিপ্লবের পরিচালনা কর্ম তারিফ করার মতো। বিশেষত,‌ ‘‌স্পেস’‌ ম্যানেজমেন্ট–‌এ। ঝুলন্ত পর্দায় ফেলা ছাড়া দিয়ে দরজার বাইরের রহস্যকে ধরা;‌ বা মুক্তির পূর্বাভাস হিসাবে বারান্দার পরিসরটুকু বের করে সেখানে ঝুলন্ত আলোর দ্যোতনা আনা — এসব তো আছেই। অন্তিম দৃশ্য পরিকল্পনায় নীরার গৃহত্যাগে ঘরের দেওয়ালগুলির ধসে পড়া নিশ্চিতই বোঝায় কেন এই ‘‌ক্লাসিক’‌ যোগ্য হাতে পড়লে আজও প্রাসঙ্গিক।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top