সম্রাট মুখোপাধ্যায়: কলঙ্ক। পরিচালনা:‌ অভিষেক বর্মন। অভিনয়ে:‌ মাধুরী দীক্ষিত, সঞ্জয় দত্ত, বরুণ ধাওয়ান, আলিয়া ভাট, আদিত্য রায় কাপুর, সোনাক্ষী সিনহা, কৃতি শ্যানন, কুণাল খেমু।
বিয়ে হওয়া স্বামীকে স্ত্রী চেনে না!‌ স্ত্রীকে স্বামী চেনে না!‌ যদিও অনুষ্ঠান করে সাতপাক ঘুরে তাদের বিয়ে হয়েছে। অন্তত এক রাতে মুখোমুখি কিছু কথাও হয়েছে। তবু তারা একে অপরকে চেনে না। স্বামী শিল্পপতি তথা সংবাদপত্র সম্পাদক দেব চৌধুরি (‌আদিত্য রায় কাপুর)‌ আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী রূপ (‌আলিয়া ভাট)‌ যখন মুখোমুখি হচ্ছে অফিসে, কেউ কাউকে চিনতে পারছে না!‌
দ্বিতীয় স্ত্রী কেন?‌ কারণ দেবের প্রথম স্ত্রী সত্য (‌সোনাক্ষী সিনহা)‌ অসুস্থ। ছবির শুরুতেই জানা যায় তার আয়ু আর এক কী দু’‌বছর। তো, মৃত্যুর আগে সে স্বামীর আর একটা বিয়ে দিয়ে যেতে চায়। যেন ‘‌রিটায়ারমেন্ট’–‌এর আগে ‘‌চার্জ’‌ বুঝিয়ে দিয়ে যাওয়া!‌ স্বামী ভদ্রলোক অবশ্য কী চায় বোঝা মুশকিল। কখনও নতুন স্ত্রীর প্রতি প্রবল উদাস, কখনও প্রবল উদ্বিগ্ন। চিত্রনাট্যের ধাঁধা–‌ধাঁধা খেলায় বেচারা আদিত্য রায় কাপুর প্রবল অসহায় বোধ করেছেন এ ‌চরিত্র করতে। আর সোনাক্ষী সিনহা তো ঠিকঠাক বললে ‘‌গ্লোরিফায়েড‌ একস্ট্রা’।‌
এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী রূপেরও মতিগতি বোঝা ভার। সালটা ১৯৪৬। এক রক্ষণশীল, হিন্দু, ধনী পরিবারের বউ সে। বিয়ের আগে সে গ্রামে কাটা ঘুড়ি ধরে বেড়াত মাঠে‌ঘাটে। কেন যে তাকে পছন্দ হল সত্যর তাও পরিষ্কার করে দেখানো হল না। যাই হোক, বিয়ের পরে এখন তার জেদ ঘুড়ি লোটায় নয়, বরং গান শেখায়। তাও শহরে বহু গায়ক–ওস্তাদ থাকলেও, তাদের কারও কাছে নয়, সে গান শিখতে চায় শহরের কুখ্যাত অঞ্চল হিরামণ্ডীর বদনাম বাইজি বাহারজানের (‌মাধুরী দীক্ষিত)‌ কাছে!‌ বাহারজানের গানের বৈশিষ্ট্য অবশ্য সিনেমায় কিছুই বোঝা গেল না!‌ বরং যেহেতু এই চরিত্রের খোলসের ভেতরে মাধুরী, ফলে তার নাচের ‘‌প্রোমোশন’‌–‌এ পরিচালকের যাবতীয় আগ্রহ বোঝা গেল। মাধুরী নেচেছেনও বেশ। তাঁর দ্রুত কোমর ঘোরানো, স্বচ্ছন্দ স্টেপিং ইত্যাদি দেখলে যে কোনও দর্শকই ‘‌নাঃ–মাধুরীর–এখনও–বয়স–হয়নি’‌ গোছের কথাবার্তা বলতে–বলতেই হল থেকে বেরোবেন। তো, রূপ বাহারজানের কাছে গান শিখতে যায়। এ ‌অনুমতি পেতে পর্দায় আর এক মিনিট দেরি হলে, সে ছাদ থেকে লাফ দিত!‌ গোটা ছবি জুড়েই এমন সব অর্থহীন অতি–‌নাটকীয় ঘটনার চাষবাস। অনুমতি দেওয়াটা ঝুলিয়ে রেখেছিল তার শ্বশুর বলরাজ চৌধুরি। এই চরিত্রে রয়েছেন সঞ্জয় দত্ত, কিন্তু তাঁর চরিত্র ঘিরে কোনও ‘‌অ্যাকশন’‌ই নেই। নিতান্তই পুরোনো আমলের বাবার কিছু তর্জন–‌গর্জন। তার সঙ্গে বাহারজান (‌ওরফে মাধুরী)‌ চরিত্রটির একটা অতীত ‘‌আশনাই’‌ ছিল ঠিকই। এটা শুনে যে সব অভিজ্ঞ দর্শক ‘‌অন–‌স্ক্রিন অফ–‌স্ক্রিন’‌ এফেক্টের কথা ভেবে স্মৃতিকাতর হচ্ছেন, তাঁদের জানানো বারুদের একটা সামান্য স্ফুলিঙ্গও নেই। একটি দৃশ্যে দু’‌জনের মোলাকাত আছে, সামান্য তর্কাতর্কি আছে, হয়তো সেটা এ ছবির সেরা দৃশ্যও দু’‌জনের অভিনয়গুণে, কিন্তু সে ওইটুকুই। মাধুরীর চরিত্রটাও ছবি জুড়ে সমান নীরক্ত যে!‌
তো, কী দাঁড়াল?‌ আদিত্য রায় কাপুর ধাঁধাপূর্ণ। সোনাক্ষী অসহায়। মাধুরী অপচয়িত। আর সঞ্জয় দত্ত তো মাঠেই নামতে পারেননি। পোস্টারের ছয়–‌তারকা তাসের মধ্যে হাতে রইল দুটো তাস। আলিয়া ভাট আর বরুণ ধাওয়ান। আলিয়া এখন এতটাই ‘‌এনার্জিটিক’‌ অভিনেত্রী যে, যে–কোনও রকম চরিত্র, সে যত শাঁসহীন, অন্তঃসারশূন্য, অবাস্তব হোক না কেন, ঠিক দাঁড় করিয়ে দেন, এ ছবিও তার ব্যতিক্রম নয়। গুমোট চিত্রনাট্যে আলিয়াই একমাত্র খোলা হাওয়া। বরুণ ধাওয়ানের সঙ্গে তাঁর জুটিটাও বেশ ভাল ফল দেয়। এ ‌ছবিতেও সে বোঝাপড়াটা বোঝা গেছে।
এই মূলত চতুষ্কোণ পারিবারিক ড্রামার আশপাশে দেশভাগ–‌দাঙ্গা ইত্যাদি নিয়ে একটা ‘‌টপিং’‌ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবি জুড়ে সেটা নিছক ‘‌টপিং’‌ই থেকে গেছে। চিত্রনাট্যের কলঙ্কের দাগগুলো মোছেনি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top