সম্রাট মুখোপাধ্যায়
কালাকান্দি। পরিচালনা:‌ অক্ষত বর্মা। অভিনয়ে:‌ সইফ আলি খান, দীপক দোবরিওয়াল, বিজয় রাজ, কুণাল রায় কাপুর, শোভিতা ধূলিপালা, শেনাজ ট্রেজার।

 

একটি রাত। একটি শহর। এক ডজন জীবন। মানে চরিত্র। মোটামুটি সকলেই বিভ্রান্ত। এবং কমবেশি বিপাকে। রাতভর তাই ছুটে চলেছে মুম্বইয়ের রাস্তায়। কখনও বৃষ্টি। কখনও কুয়াশায়। চোর, গুন্ডা, নেশাড়ু, পতিতা, রূপান্তরকামী, পুলিস, হতে–‌চলা–‌এনআরআই, হবু বর, মৃত্যুপথযাত্রী, ভাড়াটে খুনি, ভিখিরি পরিবৃত এ এক অন্য মুম্বই। রাতের মুম্বই। আন্ডারগ্রাউন্ড মুম্বই। একটু চোখ পাল্টিয়ে দেখলে ম্যাজিক–‌রিয়েলিটির মুম্বইও!‌
এই চরিত্রদের প্রায় সবারই জীবন একটা অদ্ভুত বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তার থেকে তারা পালাতে চায়। সবার সমস্যা অবশ্য একরকম নয়। কেউ (‌সঈফ আলি খান)‌ আচমকাই জানতে পেরেছে, স্টমাক ক্যান্সারে তার দ্রুত মৃত্যু অনিবার্য। পরিস্থিতি এতই চরমে যে হাতে আছে মাত্র দু–‌তিন মাস। তারই ভাই অঙ্গদ, বিয়ের ‘‌এনগেজমেন্ট’‌–‌এর রাতে পালিয়েছে চুল কাটার নাম করে। সে জানে না কেন সে বিয়ে ভাঙতে চায়। তবু সে (‌অক্ষয় ওবেরয়)‌ পালায়। চলে যায় ফোনে পরিচিত এক যৌনসঙ্গিনীর কাছে। অন্যদিকে, সঈফ পথ থেকে জুটিয়ে নেয় এক রূপান্তরকামী দেহজীবীকে। মাদকের ঘোরে। এই মাদক বা ‘‌এলএসডি’‌ই তখন তার চোখের সামনে খুলে দিয়েছে এক আশ্চর্য রঙিন আকর্ষণীয় দৃশ্যমালা।
নেশার প্রসঙ্গটি আসে চিত্রনাট্যের উপাদান আরও একটি যুবক–‌যুবতীর দলকে ঘিরে। তারা গিয়েছিল এক ‘‌রেভ’‌ পার্টিতে। সেখানে পুলিসের হঠাৎ হানায় তারা পালায়। নানারকম কসরত করে। আর পালানোর পথে রাস্তায় ঘটিয়ে বসে মারাত্মক এক দুর্ঘটনা। তাতে মারা যায় এক বাইক আরোহী। অন্যদিকে, দুই গুন্ডা (‌বিজয় রায় ও দীপক দোবরিওয়াল)‌ ওই রাতে নিজেদের মধ্যে প্রথমে বন্ধুত্ব ও পরে লড়াইয়ের ঝুলি খুলে বসে। এই দু‌জনের কথাবার্তা, ব্যবহার ইত্যাদিতে তারান্তিনোর ‘‌পাল্প ফিকশন’‌–‌এর প্রভাব আছে। কিন্তু কিছুদূর এগোনোর পরে এই সাবপ্লটটি বড়ই ক্লান্তিকর লাগে। অসংখ্য হিন্দি ছবিতে এমন সব ‘‌গ্যাংস্টার’‌ চরিত্র দেখে–‌দেখে দর্শক এখন ক্লান্ত। তাই সারাক্ষণই বড় ‘‌ক্লিশে’‌ লাগে এদের দেখতে।
বোঝাই যাচ্ছে, রাতের ওই সফরে বেরনো যে ডজনখানেক চরিত্র, তাদের তিনটি ভাগে বা ‘‌সাবপ্লট’‌–‌এ ভাগ করেছেন পরিচালক–‌চিত্রনাট্যকার অক্ষত বর্মা (‌‘‌দিল্লিবেলি’‌র চিত্রনাট্য লিখেছিলেন)‌‌। ছবির শেষদিকে এরা আবার চমক দেখিয়ে একে অপরকে ছুঁয়ে গেছে। নেশাড়ু যুবক–‌যুবতীদের পার্টির অংশটা মজাদার হলেও, তার আগেরবারের অংশটি ক্লান্তিকর। একমাত্র সঈফ আর তার ভাইকে ঘিরে অংশটিই মজাদার। তার কারণ রূপান্তরকামীর সঙ্গে সঈফের মেলামেশার মজাদার অংশটি। সঙ্গে সঈফের দারুণ অভিনয় তো আছেই। এ এক অন্য পরিণত সঈফ। যিনি বিষণ্ণতার সঙ্গে ‘‌ব্ল্যাক হিউমার’‌–‌কে অবলীলায় মেশান।
তবে ছবির সবচেয়ে আপত্তিকর অংশটাও এই অংশেই। মৃত্যুপথযাত্রী সঈফ জীবনকে উপভোগ করতে ‘‌এলএসডি’‌ খায়। আর তারপর ছবি জুড়ে আপসোস, কেন সে এতদিন এই নিষিদ্ধ মাদক খায়নি!‌ যেন তাতেই জীবনের মোক্ষ!‌ কারণ ওই মাদকের প্রভাবে সে চোখের সামনে দেখতে শুরু করেছে রঙে–‌আকারে–‌শিল্পকর্মে অসাধারণ সব দৃশ্যকল্প। ‘‌ভিএফএক্স’‌–‌এর কারুকার্যে যা হলিউডি ‘‌সাই–‌ফাই’‌ ছবির দৃশ্যকেও হার মানাবে। এমন দৃশ্যায়ন এ ছবির দর্শকদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করবেই ওই মাদক সেবনে। বিশেষত, কমবয়সিদের মধ্যে। পর্দার তলায় পড়তে না পারার মতো অক্ষরে লেখা সাবধানবাণী সেখানে কোনও কাজই করবে না। ‘‌রেভ পার্টি’‌র অংশটিতেও এই মাদক–‌চালান ঠেকাতে পুলিসের যে অভিযান, তাকে প্রায় মানবাধিকার হরণের মতো করে দেখানো হয়েছে!‌
অনেক দর্শক মন্তব্য করছেন, এমন চিত্রনাট্য নাকি ভারতীয় ছবিতে প্রথম। নিষিদ্ধ, ক্ষতিকর এক নেশাকে ভারতীয় সিনেমায় প্রোমোট করার এমন কুপ্রচেষ্টা, সত্যিই প্রথম তাতে সন্দেহ নেই। আশ্চর্যের এটাই, ‘‌মি.‌ পারফেক্ট’‌ আমির খান বিজ্ঞাপনে এ ছবির প্রশংসা করেছেন!‌ শুধুমাত্র তাঁর ইউনিটে একদা কাজ করা অক্ষত বর্মা এ ছবির পরিচালক বলে কি?‌ এটা কী করলেন আমির!‌

জনপ্রিয়

Back To Top