অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌আরেকটি প্রেমের গল্প’‌য় ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরেছিলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। সে ছবিতে অভিনেতা হিসেবে এসে পরিচালক কৌশিককে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। সে কথা স্বীকারও করেন কৌশিক। আজ, ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌ ছবি তৈরি করে গুরু-‌প্রণাম সারলেন কৌশিক। এ-‌ছবির গল্পের কাঠামো ঋতুপর্ণর। ফলে, অনেকদিন পরে বাংলা ছবির পোস্টারে এল ঋতুপর্ণ ঘোষের নাম। এবং ‘‌আরেকটি প্রেমের গল্প’‌ যদি কৌশিকের চলচ্চিত্রকার জীবনে একটি বাঁক এনে থাকে, তাহলে, ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌ও তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রায় আর একটি বাঁক হয়ে উঠল, সন্দেহ নেই।
ছবির নাম ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌ হলেও এই ছবি শুধুই দুই পুত্র—জ্যেষ্ঠ আর কনিষ্ঠের সম্পর্ক বা দ্বন্দ্ব নিয়ে নয়। অনেকগুলো সম্পর্ক এখানে উঠে আসে আলো-‌অন্ধকার নিয়ে। বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী বাবার মৃত্যুর পর বাংলার এক গ্রাম বল্লভপুরে আসে জ্যেষ্ঠপুত্র ইন্দ্রজিৎ (‌প্রসেনজিৎ)‌। ইন্দ্রজিৎ এখন  বাংলা ছবির সুপারস্টার। সমুদ্র সৈকতে শুটিং করতে করতেই খবর পায় বাবার মৃত্যুর। প্যাক আপ করে সঙ্গে সঙ্গে বল্লভপুরে আসার সিদ্ধান্ত। মুখ্যমন্ত্রী ব্যবস্থা করে দেন হেলিকপ্টারের।
আকাশ থেকে নামছে হেলিকপ্টার। উড়ে যাচ্ছে মাটিতে বিছিয়ে থাকা গাছের পাতা। অসাধারণ এক দৃশ্যায়ন। ওই হেলিকপ্টারে আছে জ্যেষ্ঠপুত্র ইন্দ্রজিৎ। রিকশায় তখন কনিষ্ঠ পার্থ (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌। সে তাকিয়ে দেখে আকাশের দিকে। আকাশে ইন্দ্রজিৎ, মাটিতে পার্থ—দুই ভাইয়ের অবস্থান চিহ্নিত হয়ে গেল শুরুতেই।
বাড়ির উঠোনে বাবার মৃতদেহ। কিন্তু সুপারস্টার ইন্দ্রজিৎ এসে পৌছনোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মেলা বসে যায় তারকা দর্শনের। পুলিস, সিকিউরিটিরা নাজেহাল ভিড় সামলাতে। ইন্দ্রজিৎ বাড়িতে এসেই খোঁজ করে ‘‌মেজো’-‌র অর্থাৎ বোনের (‌সুদীপ্তা)‌। মনোরোগী বোনকে ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। ইন্দ্রজিৎ তার ঘরের শেকল খুলে দেয়।
শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ক্রমশ একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামনে আসে ইন্দ্রজিতের প্রাক্তন প্রেমিকা সুদেষ্ণা (‌গার্গী রায়চৌধুরি)‌, যে এখন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, যেখানে তার বাবাও একদা শিক্ষক ছিলেন। আসে বাচাল পারুল (‌দামিনী বসু)‌। বাড়িতে আছে পার্থর স্ত্রী (‌শ্রেয়া ভট্টাচার্য)‌ আর বহুদিনের কাজের লোক (‌প্রদীপ ভট্টাচার্য)‌। এছাড়া স্কুলের শিক্ষক, পাড়ার কাকা-‌জেঠারা তো আছেই।
ইন্দ্রজিৎ, পার্থর বাবা মারা গেছেন সিঁড়ি থেকে পড়ে। অপঘাতে মৃত্যু। তাই পারলৌকিক কাজ হবে তিনদিনের দিন। ফলে, শেষকৃত্যর পরে পরেই তোড়জোর শুরু হয় শ্রাদ্ধর। তারই মাঝখানে ইন্দ্রজিৎকে ঘিরে উন্মোচিত হয় এক একটা চরিত্র।
ইন্দ্রজিৎ সুপারস্টার। পার্থ ছোটখাটো চাকরি করে এবং থিয়েটার করে। ইন্দ্রজিৎ নিজেদের বাড়িতে না উঠে কাছেই একটা বাংলোয় থাকে সিকিউরিটি, মহিলা সেক্রেটারি এবং পুলিস প্রোটেকশন সহ।
দাদার সঙ্গে ভাই মুখোমুখি হয়। মদ্যপান। কথা বিনিময়। ক্রমশ তর্ক। পার্থ মনে করে, সে দাদার চেয়ে বড় অভিনেতা। কিন্তু ঘটনাচক্রে (‌দুর্ঘটনা চক্রে? না, ভাগ্য-‌চক্রে?‌)‌ ইন্দ্রজিৎ আজ সুপারস্টার।
এই জায়গাটা চমৎকার ধরেছেন কৌশিক। দুই ভাই-‌ই উগরে দেয় ভেতরের চাপা কথাগুলো। পরস্পরের কাছে যা ‘‌বিষ’‌ লাগে। কিন্তু তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ‘‌সত্যি’‌গুলোও।

একজন সুপারস্টার রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে যায় না। তার লড়াই, তার নিষ্ঠা, তীব্র প্রতিযোগিতায় তার মাথা তুলে দাঁড়ানোর জেদ কি কিছুই নয়?‌ থিয়েটারে অভিনয় করা ভাই কি সেসব ভেবেছে কখনও?‌ আবার, খ্যাতি নেই বলে থিয়েটারের অভিনেতা কি যথার্থ শিল্পী নয়?‌
এই তর্ক, বিতর্ক থেকে কোনও সমাধান না এলেও, ভাই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, শ্রাদ্ধের দিন দাদা ইন্দ্রজিৎ থাকবে না তাদের বাড়িতে। বাবার শ্রাদ্ধের দিনটা শুটিংয়ের দিন হয়ে উঠুক, পার্থ চায় না।
প্রধান শিক্ষিকার ভূমিকা পালন করতে করতে একটা কাঠিন্যের পোশাক চাপিয়ে নিয়েছে সুদেষ্ণা।  মিলতে মিলতেও কোথাও এসে মেলে না ইন্দ্রজিৎ আর সুদেষ্ণা।
যে সুপারস্টার, সেও একজন রক্ত-‌মাংসের মানুষ। কিন্তু তার বহু অনুভূতি প্রকাশের ‘‌প্রকাশ্য সুযোগ’‌ কেড়ে নিয়েছে তার সুপারস্টার সত্ত্বা, যার ‘‌ইমেজ’‌ সারাক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাকে। এই দ্বন্দ্ব, এই কষ্ট নিপুন সংযত অভিনয়ে প্রকাশ করেছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর অভিনয় জীবনের একটা সেরা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌র ইন্দ্রজিৎ। পাশাপাশি কনিষ্ঠপুত্র পার্থর চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী অনবদ্য। প্রসেনজিৎ-‌ঋত্বিকের দৃশ্যগুলি নবীন অভিনেতাদের পাঠশালা হয়ে থাকল।
মনোরোগী বোনের চরিত্রে সুদীপ্তা চক্রবর্তী মাত করে দিয়েছেন। চরিত্র এবং তাঁর অভিনয় এই সমাজকে একটা বার্তা দিল যে, ‘‌মনোরোগী’‌ তকমা দিয়ে তাঁকে যারা আটকে রাখতে চায়, মনোরোগী আসলে তারাই।
‘‌বাচাল’‌ পারুল হিসেবে দামিনী বসু হবহু ওই চরিত্রটা হয়ে উঠেছেন। আর, সারাক্ষণ কাঠিন্য বজায় রেখে সুদেষ্ণা দিদিমণির চরিত্রে অনবদ্য গার্গী রায়চৌধুরি। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আঁচকে ভেতরে বাঁচিয়ে, বাইরে তা প্রকাশ না-‌করার এক্সপ্রেশন মনে থেকে যাবে। ঋত্বিকের স্ত্রীর চরিত্রে নবাগতা শ্রেয়া ভট্টাচার্য সত্যিই গ্রামের এক নিপাট সরল নারী। বাড়ির কাজের লোক হিসেবে প্রদীপ ভট্টাচার্যর স্বাভাবিক অভিনয় নজর কাড়ে।
অতিনাটককে বর্জন করে, সহজ, গভীর নানান সম্পর্কের টানাপোড়েনকে কাব্যময় সিনেম্যাটিক ভাষায় পর্দায় নিয়ে এলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। সত্যিই কোথাও কোথাও ঋতুপর্ণ ঘোষের স্পর্শও পাওয়া যায়। ক্যামেরায় শীর্ষ রায় অসাধারণ। প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীতে মায়া আছে। তন্ময় চক্রবর্তীর শিল্প নির্দেশনা প্রশংসনীয়।
দু-‌একটা কথা তবুও বলার। যখন সুদেষ্ণা তথা গার্গী গাইছেন, ‘‌আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে’‌, তখন ইন্দ্রজিত তথা প্রসেনজিতের গান গেয়ে ওঠাটা একটু বেশি নাটকীয়, এই ছবির প্রেক্ষিতে। গ্রামের বাড়িতে বাবার মৃতদেহ যখন উঠোনে, তখন পাড়ার কাকা, জেঠাদের সামনে পার্থর সিগারেট ধরানোর দৃশ্যটা দৃষ্টিকটু। এটা গ্রামের বাড়িতে হয় কি?‌
‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’ যেভাবে অতিনাটককে বর্জন করে এগিয়েছে, সেখানে এইটুকু ‘‌নাটক’‌ও‌ যেন মানতে ইচ্ছে করে না।
আসলে শুধু একজনের জীবন নয়, একজনকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো জীবনকে সামনে নিয়ে আসে ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌। এবং এইসব জীবনকে নিয়েও, এক নির্জন, বিষণ্ণ পথে আমাদের পৌছে দেয় এই ছবি। এবং বাংলা ছবির দর্শকদের গভীরতাকে সম্মান দিয়েছে ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌। তাই ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌র দুই স্রষ্টা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষকে সম্মান জানাই আমরা, বাংলা ছবির দর্শকরা। সম্মান তো সবসময়েই পারস্পরিক।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top