সম্রাট মুখোপাধ্যায়: অক্সফোর্ড প্রত্যাগত ঐতিহাসিক দাদা। তুখোড় বাগ্মী। তুখোড় বুদ্ধির গোয়েন্দা। সঙ্গে নামেও একটা মজা। ফেলুদা–ঘনাদাদের ঘরানায় ‘‌সোনাদা’‌।
আদ্যোপান্ত পেটুক ভাইপো আবির। আইনের ছাত্র। বাংলা রহস্য–কাহিনীর ছক মেনে গোয়েন্দা কাকার সহকারী। তবে ‘‌কাকা’–‌কে ‘‌কাকা’‌ না বলে ‘‌দাদা’‌ বলেন। আনুগত্যে ‘‌তোপসে’‌। মজাদার কথা আর ভিতু আচরণে ‘‌লালমোহনবাবু’–‌ও। 
এই দু’‌জনের সঙ্গে আছে ঝিনুক। যাদবপুরের ‘‌কম্পারেটিভ লিটারেচার’‌। সাহসী। রসবোধসম্পন্না। গ্রামের বাড়িকেই ভালবাসে। আবিরকে পছন্দ করে ওকালতির কালো পোশাককে পছন্দ করে বলে। ‘‌ম্যান ইন ব্ল্যাক’‌। বাংলা গোয়েন্দা–কাহিনীর ‘‌টিম’‌ তৈরি হয় তিনজনে। এই সেই তিন নম্বর সদস্য।
এই তিনজনের ‘‌টিম’‌ এসে পৌঁছচ্ছে মণিকান্তপুর গ্রামের এক জমিদার বাড়িতে। চারশো বছরের পুরনো সিংহরায় বাড়িতে। যে বাড়িতে লুকোনো আছে মোগল আমলে রেখে যাওয়া শাহ্‌ সুজার ধনরত্ন। যার খবর জানলেও উদ্ধার করতে পারেনি কেউ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। হঠাৎই এর সন্ধান পেয়ে যান ওই বাড়ির হরিনারায়ণ সিংহরায় (‌গৌতম ঘোষ)‌। আর তারপরই ‘‌ভূত’‌ দেখে হার্টফেল করে মারাও যান হরিনারায়ণ।
হরিনারায়ণেরই ভাগনে হল আবির (‌অর্জুন চক্রবর্তী)‌। মামার স্মৃতি আর গ্রামের দারুণ খাওয়ার টানে অকুস্থলে এসে হাজির হয় আবির। সঙ্গে তার সোনাকাকা, থুড়ি সোনাদাদা। ওই দুজনের সঙ্গে জুটে যায় হরিনারায়ণের বাল্যবন্ধু অখিলেশের (‌কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়)‌ মেয়ে ঝিনুক (‌ঈশা সাহা)‌। এদের টিমের সাড়ে তিন নম্বর সদস্য হয় বাড়ির কেয়ারটেকার মহাদেবদার (‌নিত্য গাঙ্গুলি)‌ ডানপিটে গুলতি–হাতে ছেলে নীলু (‌উজান চট্টোপাধ্যায়)‌।
আর বিপরীতপক্ষে এক ভয়ের মুখোশ অঁাটা ‘‌ভূত’‌ এবং ওই সিংহরায় বাড়ির দখল নিতে চাওয়া ভয়ঙ্কর হাসির ভিলেন প্রোমোটার দশানন দঁা (‌রজতাভ দত্ত)‌। দারুণ সংলাপ, টানা পিছু নেওয়া আর রজতাভ দত্তের তুখোড় ‘‌এনার্জিটিক’‌ সংলাপের জোরে এ চরিত্র কখনও কখনও মনে করিয়ে দেয় মগনলাল মেঘরাজকে।
তবে এ’‌ছবির মূল ‘‌থ্রিল’–‌টা নায়ক বনাম ভিলেন বুদ্ধি আর বন্দুকের লড়াইয়ে নয়। বরং ধঁাধা ভাঙায়। যেসব ধঁাধার মাঝে লুকোনো আছে গুপ্তধনের সঙ্কেত। আর ধঁাধাগুলো সবই ছড়ায়। একটা ছড়ার রহস্য–উদ্ধার করলে আর একটা ছড়া— এভাবে ক্রমান্বয়ে চলেছে। মজার কথা— এই যে বিখ্যাত এক বংশ, ঐতিহাসিক ধনভাণ্ডার, তার হদিশ ছড়ায় রেখে যাওয়া উত্তরপুরুষের জন্য, ইতিহাসের অধ্যাপক বা ছাত্রের গোয়েন্দা হওয়া, রহস্যের মাঝে রিলিফ হয়ে আসা প্রেম— এই সব উপাদানকেই মূল করে মাত্র গত সপ্তাহেই আরও একটি বাংলা সিনেমা আমরা দেখেছি— ‘‌আলিনগরের 
গোলকধঁাধা’‌। গল্পে হয়তো সরাসরি মিল নেই, কিন্তু উপাদানে, কাঠামোয় প্রচুর প্রচুর মিল এই দুই সিনেমায়!‌ এক সময় বাংলায় সাহিত্যে ছিল ঐতিহাসিক রোমান্স–এর যুগ। এবার কি তা হলে বাংলা সিনেমায় ঐতিহাসিক রোমাঞ্চের যুগ শুরু হল?‌
ছবির বড় আকর্ষণ খাওয়া–দাওয়া নিয়ে আবিরকে ঘিরে মজা। সঙ্গে বাড়তি মজা জুগিয়েছে ঝিনুকের সঙ্গে তার ভিতু–ভিতু প্রেম। অর্জুন চক্রবর্তী চরিত্রটির মজা আর ছটফটানি– দুটোই খুব ভাল ধরেছেন। নীলুর চরিত্রে উজান চট্টোপাধ্যায় বুঝিয়েছেন পর্দাতেও তিনি মঞ্চের মতোই সম্ভাবনাময়। ঝিনুক হিসেবে ঈশা সাহাও ভাল। এ’‌রকম ‘‌ফর্মুলা’‌মাফিক তীক্ষ্ণ, সপ্রতিভ গোয়েন্দা চরিত্রে আবির চট্টোপাধ্যায় পরীক্ষিত নাম। ফেলুদা, ব্যোমকেশ করার পরে এ’‌চরিত্রেও আবিরের দাপট সন্দেহাতীত। হরিনারায়ণের চরিত্রে স্বল্প উপস্থিতিতেই গৌতম ঘোষ অনবদ্য। অ্যানিমেশন অংশের কাজও অনবদ্য। বস্তুত ধ্রুবর এ’‌ছবি দেখতে বড় ভাল লাগে। রহস্যের গা–ছমছমানিটা পাওয়া যায়, এর ‘‌মেকিং’‌–এর একরৈখিকতার জন্য। এ’‌কাজে দারুণভাবে সহায়ক হয়েছে বিক্রম ঘোষের সঙ্গীত–ভাবনাও।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top