সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ গালি বয়। পরিচালনা:‌ জোয়া আখতার। অভিনয়ে:‌ রণবীর সিং, আলিয়া ভাট, কল্কি কাচলিন।
‘‌আপনা টাইম আয়েগা’‌
এই একটা লাইনেই বোধহয় গোটা ছবির চিত্রনাট্যটা বলা আছে। এটি ছবির মূল গানের লাইন। সিনেমায় গানটি গায় নায়ক মুরাদ (‌রনবীর সিংহ)‌। গানটি একটি ‘‌র‌্যাপ’‌ গান। এছবির নায়ক চায় ‘‌র‌্যাপার’‌ বা র‌্যাপ–‌গায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে। সে কথাই ওই গানে বলা আছে।
আর গানটা শুনলেই বোঝা যায়, এনায়ক  প্রতিষ্ঠা পাবেই। মুরাদ এ‌গানটি প্রথমবার গায় অপেক্ষাকৃত ঢিমে লয়ে। যখন সে ড্রাইভারের চাকরি করে। অপছন্দের চাকরি। তবু করতে বাধ্য হয় দাপুটে মিলিটারি মেজাজের বাবার (‌বিজয় রাজ)‌ চাপে। অপমান, উপেক্ষা, ছোট–‌হওয়া সেখানে নিত্যসঙ্গী। কখনও নাইট ক্লাবের দারোয়ানরা তাকে আপত্তিকর হাতের ইশারায় দরজার মুখ থেকে সরে দাঁড়াতে বলে। কখনও গাড়ির মালিক তার মেয়েকে বলে মুরাদকে দেখিয়ে, এখন তো সবাই–‌ই গ্র‌্যাজুয়েট হয়, ওর কোনও মূল্য আছে নাকি!‌ সেই মেয়ে আবার একদিন কাঁদতে–‌কাঁদতে যখন গাড়িতে ওঠে, ‘‌কী–‌হয়েছে’‌ জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও থমকে যায় মুরাদ, মনে রাখে সে এক ‘‌ড্রাইভার’‌ মাত্র। আর মনে মনে ভাঁজতে থাকে এক গানের সুর। এই যে শ্রেণী–‌ব্যবধান আর তাকে ঘিরে যে রাগ, প্রতিবাদ, তাকে বেশ রাজনৈতিকভাবেই ‘‌সাব–‌টেক্সট’‌–‌এ রাখেন পরিচালক জোয়া আখতার।
তো, এ’‌রকমই এক রাতে নাইট ক্লাবের সামনে অসম্মানিত হয়ে মুরাদ নিজেকে আটকে নেয় ড্রাইভারের সিটে। আর মনে–‌মনে লিখতে থাকে এই গানের কথা। আর এই গান দ্রুত লয়ে, পুরো মেজাজে মুরাদকে গাইতে শুনি, ছবির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে। যেখানে র‌্যাপ গানের এক বড় প্রতিযোগিতায় নেমে সেরার শিরোপা ছিনিয়ে নিতে চলেছে মুরাদ।
‘‌আপনা টাইম আয়েগা’‌। এই গান এই ‌ছবির বক্স অফিস–‌সাফল্যের অন্যতম প্রধান তীর। একটা গানে গোটা ছবির আত্মাকে ধরে রাখা— সেটাও কম কৃতিত্বের কথা নয়। আবার এক অর্থে এই ধরতাইটাই হয়ত এই ছবির মূল দুর্বলতাও। একটা দুর্দান্ত লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু এই লড়াই–‌এর শেষে কী আছে, তাও যেন জানা। পূর্বানুমানযোগ্য। প্রতিটি ধাপে–‌ধাপে লড়াকু নায়ক কীভাবে এগোবে চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে, তার প্রতিটা ধাপই যেন জানা। ফলে ইচ্ছা পূরণের ভালো লাগা আছে, কিন্তু চমকটা নেই।
এতকিছু চেনা–‌স্বাদ–‌গন্ধ স্বত্বেও যে এছবি বসে দেখতে হয় তার প্রথম তিনটি কারণ— রনবীর, রনবীর এবং রনবীর। অভিনেতা হিসাবে ক্রমশই তিনি শুধু যে পরিণত হচ্ছেন তাই নয়, এক–‌একটা চরিত্র নির্মাণ করছেন ‘‌আঁভা–‌গার্দ’‌ ছবির অভিনেতাদের নিষ্ঠায়। এই রনবীরই কিছুদিন আগে ‘‌পদ্মাবত’‌–‌এ আলাউদ্দিন খলজি–‌র মতো উদ্দাম খল একটা চরিত্রায়ণ করেছেন তা এ’‌ছবিতে তাকে দেখে বোঝারই উপায় নেই। এতটাই ‘‌ইন্ট্রোভার্ট’‌ এই চরিত্র। আর রনবীর তা করতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করেছেন চোখকে।
জীবনে সর্বত্র মার–‌খাওয়া এক যুবকের নিভে যাওয়া চোখ। এত অসাধারণভাবে একদিকে সেটা যেমন এনেছেন রনবীর, তার পাশে ছিটকে বেরোনো ‘‌র‌্যাপ’‌ গাওয়ার সময়— সেখানেও অনবদ্য তিনি।
এর পাশে আলিয়া যেন একরাশ স্বচ্ছন্দ খোলা হাওয়ার মতো অভিনয়ে। তার চরিত্রে কোনো ‘‌শেড’‌ নেই। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা আছে, তাতেই বাজিমাত। আর রনবীর–‌আলিয়ার জুটি জমেছেও ঘন হয়ে। এই ছবি বক্স অফিসে দাঁড়ানোর চতুর্থ কারণ আলিয়া হলে, পঞ্চম কারণ একঝাঁক দারুণ গান। এই ‌ছবি সূত্রে আবার ‘‌র‌্যাপ’‌–‌এর ধারা ফিরে এল বোধহয়।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top