সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • গোল্ড। পরিচালনা:‌ রিমা কাগতি। অভিনয়ে:‌ অক্ষয়কুমার, মৌনি রায়, কুণাল কাপুর।
খেলার গল্প। আর তাকে ঘিরে অসামান্য চিত্রনাট্য।
টানটান কয়েকটা হকি ম্যাচ। অলিম্পিক্সে। ভারতের খেলা। আর তার চারপাশে মোড়ক হিসাবে ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৮— এই বারো বছরের ইতিহাসের দুর্দান্ত প্যাকেজ। খবরের কাগজের হেডিং আর নিউজ ফুটেজে সাজানো।
সঙ্গে খেলায় হারজিতের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের আনাচে–‌কানাচেও।
এই সব ধাপগুলোকে মিলিয়ে–‌মিশিয়েই এক টানটান ছবি বানিয়েছেন পরিচালক রিমা কাগতি। ‘‌গোল্ড’‌। যিনি মূলত বিখ্যাত জোয়া আখতারের ‘‌জিন্দেগি না মিলেগা দোবারা’‌ বা ‘‌দিল ধড়কনে দো’‌–‌র মতো ছবির চিত্রনাট্য লেখার জন্য!‌ মজার কথা, খানিকটা ‘‌সার্ভিস রিটার্ন’‌–‌এর ঢঙেই যেন এ ছবির সংলাপ লিখে দিয়েছেন জোয়ার বাবা জাভেদ আখতার। আর সে সব সংলাপ যে কীরকম আয় দিয়েছে, তা ছবি দেখলে বোঝা যায়।
‘‌গোল্ড’‌ অর্থে অলিম্পিক্সের সোনা বা স্বর্ণপদক। ছবির শুরু চূড়ান্ত উত্তেজক এক হকি ম্যাচ দিয়ে। ১৯৩৬–‌এর বার্লিন অলিম্পিক্সে হকি বিভাগের ফাইনাল। সেখানে ভারত, না ভুল বলা হল, তখনকার হিসাবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মুখোমুখি আয়োজক দেশ জার্মানি। গ্যালারিতে স্বয়ং রাষ্ট্রনেতা অ্যাডালফ্‌ হিটলার। মাঠে টেনে খেলানো আম্পায়ার। এক সময় জার্মানি এগিয়ে। তবু শেষমেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার নাটকীয় জয়। প্রায় শেষ মুহূর্তে। হিটলারের মাঠ ছাড়া।
এমন একটা টানটান ফাইনাল ম্যাচ আর তাতে স্বদেশের জয়— সাধারণত এটা ছবির ক্লাইম্যাক্স হিসাবে নির্ধারিত থাকে। কিন্তু এটা যদি ছবির শুরুতেই চলে আসে, তা হলে বাকি সওয়া দু’‌ঘণ্টা আর ছবিতে থাকল কী?‌ সেখানেই এ ছবির চমক।
১৯৩৬–‌এর সোনা জয়ের পরেই এ ছবির গল্প খেলার মাঠ ছাড়িয়ে চলে যায় রাজনীতি আর যুদ্ধের অঙ্গনে। দুটো ঘটনাই ফুটেজ আর ধারাভাষ্যে দারুণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছবিতে। প্রায় হলিউডি দক্ষতায়। বিশ্বযুদ্ধের কারণে দুটো অলিম্পিক্স পর পর বাতিল হয়। তারপর ১৯৪৮–‌এর লন্ডন অলিম্পিক্স যে হবে তার ঘোষণা হয় ১৯৪৬–‌এ। যখন এ দেশ স্বাধীনতার থেকে আর মোটে এক বছর দূরে দাঁড়িয়ে।
হিসাব কষে দেখা যায়, এই প্রতিযোগিতায় যে দল যাবে, সেটাই স্বাঘীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করা প্রথম দল। এই কথাটা হকির সঙ্গে জড়িত সব খেলোয়াড়–‌কোচ–‌কর্মকর্তা বোঝেন। কিন্তু এই ভাবনাটা নিয়ে যিনি চূড়ান্তভাবে আবেগতাড়িত হন, তিনি একজন বাঙালি, তপন দাশ। এই চরিত্রটিই এ ছবির চিত্রনাট্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
১৯৩৬–‌এর সোনাজয়ী হকি দলের ম্যানেজার ছিল তপন দাশ। দলের ক্যাপ্টেন সম্রাট (‌যে চরিত্রে সম্ভবত ধ্যানচাঁদের ছায়া)‌ যতটা দলের চালিকাশক্তি, ততটাই প্রাণকেন্দ্র এই তপন দাশ। যেটি যতদূর জানা যাচ্ছে সম্পূর্ণই কাল্পনিক চরিত্র। তবে চিত্রনাট্যে এই চরিত্রটিকে রক্তমাংসে এতটাই প্রাণবন্ত করে তোলা হয়েছে যে তুলনা নেই। ভারতীয় সিনেমায় নায়ক চরিত্রে উত্তর ভারতীয়দের যে দাপট, বাঙালি চরিত্রেরা সাধারণত সেখানে পার্শ্বচরিত্র হিসাবে কোণঠাসা। এ ছবি তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
১৯৪৭–‌এ দেশভাগ হয়ে যায়। ফলে ৪৮–‌এর অলিম্পিকের জন্য তৈরি যে টিম, তার ৬ জন খেলোয়াড় পাকিস্তানে আর ৩ জন খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। তপন দাশের স্বপ্নের টিম ভেঙে যায়। গোটা দেশ ঘুরে কীভাবে খেলোয়াড় সংগ্রহ করছেন তপন, সেটা এ ছবির দুর্দান্ত আকর্ষণীয় দিক, ফলে গোটা উদ্যোগ ভেঙে যাওয়াটাও দারুণ ট্র‌্যাজেডি নিয়ে আসে। তবে বলাই বাহুল্য তপন ভেঙে পড়ে না। শুরু হয় নতুন নাটক।
এই যে খেলোয়াড়দের ঘিরে ছোট ছোট সাবপ্লট, সেটাই এ ছবিকে অনেকগুলো পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশেষত হিম্মতকে ঘিরে আবেগবহুল সাবপ্লটটি যেভাবে শেষ সিকোয়েন্সের জন্য তুলে রাখা হয়েছে, তা বাহবা পাওয়ার মতো। সুপারস্টার অক্ষয়কুমার আছে বলে তাঁকে ঘিরেই যাবতীয় কিছু ঘটে চলবে এমনটা হয়নি। সত্যি বলতে, অক্ষয়কুমার এ ছবির চিত্রনাট্যে ‘‌রিলিফ মেটিরিয়াল’‌। তবে তিনি অভিনেতা হিসাবে যে কতটা পোক্ত এখন এ ছবি তার প্রমাণ রাখল।
আর একটা জিনিসও এ ছবিতে প্রশংসার্হ। অহেতুক পাকিস্তানকে ‘‌ভিলেন’‌ না বানানো। বরং তাদেরও একই স্বপ্ন দেখার শরিক করা। ভারতের খেলার আগে পাক অধিনায়ক গ্যালারি থেকে ‘‌ভিকট্রি’‌ চিহ্ন দেখাচ্ছেন। আর ভারতের খেলোয়াড়রা পাক ম্যাচে গলা ফাটাচ্ছেন সমর্থনে, এমন দৃশ্য বলিউড ছবিতে খুব একটা দেখা যায় না তো। একেই বোধহয় বলে রাজনীতি–‌রাষ্ট্রনীতি ছাপিয়ে ‘‌স্পোর্টসম্যান স্পিরিট’‌।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top