সম্রাট মুখোপাধ্যায়: উপন্যাস থেকে সিনেমা, উপন্যাসকে বজায় রাখা, সিনেমাকেও বজায় রাখা। এই ভারসাম্যের খেলাটা দারুণ খেলেছেন পরিচালক অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘‌গহীন হৃদয়’‌ ছবিতে। সুচিত্রা ভট্টাটাচার্যের উপন্যাস থেকে ছবি বানাতে গিয়ে।
একটি নয়। তিনটি হৃদয়। এই কাহিনীর কেন্দ্রে আছে এক ত্রিকোণ সম্পর্ক। ভাস্কর–‌সোহিনী–‌অনুপমের। সোহিনী (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌ ভাস্করের (‌দেবশংকর হালদার)‌ স্ত্রী। অসুখী স্ত্রী। এই অসুখের উৎস ভাস্করের স্বভাবের উদাসীনতা তথা উদ্যোগহীনতা। তার আপাত আলস্যকে ঘৃণা করে সোহিনী। তার এই অপছন্দকে বুঝেও বিশেষ আমল দিতে নারাজ ভাস্কর। সে উদাসীনতা এতটাই যে, যখন এক রাত্রে খাওয়ার টেবিলে বসে সোহিনী যখন ভাস্করকে বলে যে সে ওই দাম্পত্য ভেঙে বেরিয়ে যাবে, তখনও ভাস্কর উদাসীনভাবে রাধুনিকে বলে একটা অতিরিক্ত রুটি দিয়ে যেতে। চমৎকারভাবে এখানে এই ‘‌অ্যান্টি–‌ড্রামা’‌টি ব্যবহার করেছেন পরিচালক।
অন্যদিকে অনুপম (‌কৌশিক সেন)‌ ভাস্করের ছেলেবেলার বন্ধু। এক নিমন্ত্রণ বাড়ি–‌সূত্রে সোহিনীর সঙ্গে তার আলাপ। হালকা একটা ভাল–‌লাগা গড়ে ওঠা। তারপর দুজনের দুজনকে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরা। এই সম্পর্কের গভীর প্যাশনকে বোঝাতে একটি তুমুল শরীরি দৃশ্য আছে। সেটি অভিঘাতও তৈরি করছে। তবু এ দৃশ্যটি বাদ দিলেও অনুপম সোহিনীর মানসিক নৈকট্য বোঝাতে অসুবিধা হত না। কাহিনীতে–‌সংলাপে তার প্রচুর বিচ্ছুরণ রয়েছে, এ ছবি যেমন ত্রিকোণ সম্পর্কের ছবি, তেমনই ভাই–‌বোন –‌ভগ্নিপতি–‌মা মিলিয়ে এক পারিবারিক সম্পর্কেরও ছবি। সেই চালচিত্রেই যৌনতার টুকরোটুকুকে ইঙ্গিতে ছেড়ে দিলেই চলত।
অনুপমের চরিত্রটিকে চিত্রনাট্যে সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানায় ব্যবহার করেছেন অগ্নিদেব। চেনা পথে এগোলে এ চরিত্রটিও অতি–‌চেনা পতি–‌পত্নীর মধ্যে ‘‌ওয়হ’‌ হয়ে থেকে যেত। কিন্তু তা হয়নি। বরং প্রথমদিকে যে চরিত্রটিকে সংসারে আগুন লাগাতে বসা একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। আস্তে আস্তে তার দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, সংবেদনশীলতাগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। এক সময় সোহিনীকে ছাপিয়েই সে যেন হয়ে ওঠে অসুস্থ ভাস্করের আশ্রয়স্থল। কৌশিক সেন নিজের অভিনয়–‌ভাবনায় এই ‘‌শেডস’‌গুলো বড় নিপুণতায় ধরেছেন।
আবার ভাস্করের চরিত্রটাও পাল্টেছে। বোঝা গেছে তার আপাত–‌অলসভাব তার ভোঁতা মনের পরিচয় নয়। বরং গহীন হৃদয়ে সে এক অতি–‌অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ। এমন দ্বিতলিক চরিত্রে দেবশংকর হালদার পর্দায় এখনও পর্যন্ত তাঁর সেরা অভিনয়টি করেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে অভিমানের প্রকাশ, চরম অসুস্থতার কালে পাপবোধময় স্বীকারোক্তি, বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় সংশয়ময় আড় চোখের দৃষ্টিতে স্ত্রীকে লক্ষ্য করা— এমন ছোট ছোট কত যে জটিল অথচ মন ছোঁয়া দৃশ্যের অ্যালবাম দেবশংকরের অভিনয়কে কেন্দ্র করে!‌ বাংলা ছবিকে বরাবরই ঋদ্ধ করেছেন মঞ্চের অভিনেতারা। এই ছবিতেও দুটি জটিল চরিত্রে এই সময়ের মঞ্চের দুই প্রধান অভিনেতাকে মুখোমুখি লড়িয়ে দিয়ে সেই ডিভিডেন্ডটা ঘরে তুলেছেন অগ্নিদেব।
কিন্তু এই ছবি একেবারেই নাটক–‌নির্ভর নয়। বরং বিশুদ্ধ সিনেমার দিকে অন্তত এক পা এগিয়ে থাকতে চেয়েছে এই ছবি। আর তা পেরেওছে ছবি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা টুকরো টুকরো স্বপ্ন দৃশ্যগুলোর জন্য। যে স্বপ্ন দৃশ্যগুলোকে জুড়ে নিলে পাওয়া যায় তিনজনের গহীন হৃদয়ের ইচ্ছা–‌অনিচ্ছা–‌কামনার হদিশ। এই দৃশ্যগুলোকে মুখোশ নৃত্যের ঢংয়ে ভাবা হয়েছে। প্রধান তিন চরিত্রের অভিনেতা–‌অভিনেত্রীই এই সিকোয়েন্সগুলোতে অনবদ্য সব অভিব্যক্তি ব্যবহার করেছেন আর তাতে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে মনের না বলা কথারা। শুধু একটাই কথা, এই দৃশ্যগুলোতে তিনটি চরিত্রের স্বপ্নকেই রাখা উচিত ছিল। কোনও বিশেষ একজনের নয়।
আসলে মূল উপন্যাসের ‘‌টোন’‌–‌এর সঙ্গে ছবির ‘‌টোন’‌–‌এ একটা বড় ফারাক করেছেন অগ্নিদেব। মূল রচনাটির ভেতরে থাকা নারীর নিঃসঙ্গতা, নারীর প্রতি সহানুভূতি ইত্যাদি ‘‌ফিমেল গেজ’‌–‌কে তিনি যথাসম্ভব স্তিমিত করে দিয়েছেন। বরং জোর দিয়েছেন এক ‘‌নষ্টনীড়’‌–‌এর গল্প শোনানোয়। পারিবারিক অংশটাকে জোর দিয়ে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও অনবদ্যভাবে এই টানাপোড়েনগুলো ধরেছেন। নচেৎ ওই চরিত্রটি দর্শকের চোখে ভিলেন হয়ে যেত। স্বামীর অসুস্থতার সময়ও প্রেমিকের সঙ্গে ঘোরাফেরা বা প্রেমিকের সামনেই হাসপাতালে স্বামীর তাকে জড়িয়ে ধরা— সব রকম ক্ষেত্রেই ঋতুপর্ণা অমোঘ সব অভিজ্ঞতা ও স্বরক্ষেপণে এই চরিত্রের ভেতরের অস্বস্তি আর বাইরের ছদ্মবেশকে একইসঙ্গে ধরে রেখেছে। সমান্তরাল এক দম্পতির চরিত্রেও শংকর চক্রবর্তী আর লকেট চট্টোপাধ্যায়কে দারুণ বোঝাপড়াময় লেগেছে। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top