সম্রাট মুখোপাধ্যায়

কখগঘ ●‌ পরিচালনা:‌ কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় ●‌ অভিনয়ে:‌ পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, লামা, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সমদর্শী দত্ত, সায়নী ঘোষ, সৌরভ দাশ।

বাস্তব অবলম্বনে সিনেমা বানানো নয়। বরং সিনেমা অবলম্বনে বাস্তবকে গড়ে নেওয়ার চেষ্টা।
আর তাকে ঘিরেই এক ‘‌ননসেন্স অ্যাবসার্ডিটি’‌ বা ‘‌হাঁসজারু’‌ গোছের সিনে–বাস্তব গড়ার প্রয়াস। চিত্রনাট্যে। দৃশ্যের পর দৃশ্যে। এটাই কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচালিত সিনেমা ‘‌কখগঘ’‌–‌র নির্যাস।
যেখানে ঠিক ‘‌সিনেমার ভেতর সিনেমা’–‌র খেলা নয়। বরং মজাটা চিত্রনাট্যের ভেতর চিত্রনাট্যে। আর সেই চিত্রনাট্যকে ঘিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে এ নাটকের মূল চরিত্রেরা।
টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ার এক বৃদ্ধ চা–‌ওয়ালা মাধব দত্ত যে কাহিনীর সূচনা–বিন্দু। মাধব দত্ত একসময় এই স্টুডিওপাড়ায় পেশাদার অভিনেতা হতে এসেছিলেন। পারেননি। হয়ে গেছেন চায়ের দোকানদার ও মেসমালিক। মাধব দত্তের (‌পরান বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ যৌবন– পর্বের ফ্ল্যাশব্যাকটি বড় যত্নে এবং আধুনিক সিনেমা–ভাষায় নির্মাণ করেছেন পরিচালক কৃষ্ণেন্দু। ‘‌সিপিয়া টোন’‌–‌এর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার তো তিনি করেছেনই। উপরন্তু বৃদ্ধ মাধববাবু গল্প বলতে বলতে ঢুকে পড়েছেন ‘‌ফ্ল্যাশব্যাক’‌ অঞ্চলে, যা তাঁর বাড়ির ঘর ও তাতে উপস্থিত তাঁর বাবা–‌মা, মজার কথা গোটাটাই ঘটছে ফাঁকা স্টুডিও উঠোনে এবং পেছনে থিয়েটারের সেট সুলভ দরজা– জানলার ফাঁকা ফ্রেম বসিয়ে। এমন নতুন ভাবনার প্রয়োগের জন্য কৃষ্ণেন্দুবাবুর প্রশংসা প্রাপ্য।
মাধববাবুর মেসই মূল ঘটনাস্থল। যেখানে স্থান বরাদ্দ কেবলমাত্র টলিউডে কাজ খুঁজতে আসা ব্যর্থ তরুণদের। এদের ভেতরেই আছে ‘‌কখগঘ’‌, ‘‌ক’‌ মানে পরিচালক হতে চাওয়া কল্যাণ (‌সমদর্শী দত্ত)‌। ‘‌খ’‌ মানে চিত্রনাট্যকার খরাজ (‌ইমন চক্রবর্তী)‌। ‘‌গ’‌ মানে নায়ক হতে চাওয়া গণেশ (‌সৌরভ দাশ)‌। আর ‘‌ঘ’‌ হল হবু–‌ভিলেন ঘণ্টা (‌আরজে সায়ন)‌। এদের সাধ–‌বাস্তব–‌হতাশা নিয়ে ছোট–ছোট ‘‌ট্র‌্যাজি কমিক’‌ মুহূর্ত। যেমন ঘণ্টার শুটিং চলার সময় মার খাওয়া। প্রেমিকা প্রিয়ার (‌সায়নী ঘোষ)‌ কাছ থেকে হাত খরচা চেয়ে গণেশের দিন চালানো। অবাঙালি প্রযোজকের (‌সুমিত সমাদ্দার)‌ কাছে গিয়ে খরাজের হেনস্থা হওয়া। মাধববাবুর মেসে এদের সঙ্গে আছে কানাই কাঞ্জিলাল (‌লামা হালদার)‌। সে–‌ও একজন ‘‌একস্ট্রা’‌ অভিনেতা। তার জন্য অবশ্য চিত্রনাট্যে একটি ভারি মজাদার ‘‌ম্যানারিজম’‌ তৈরি করা আছে। ‘‌সিচুয়েশন’‌ অনুযায়ী এক–‌একটি সংলাপ, পুরনো বাংলা ছবি থেকে তুলে এনে আওড়ানো। তারপর সংলাপ কথক অভিনেতার নাম, ছবির নাম, মুক্তির বছর উল্লেখ করা। যেন বাংলা সিনেমার চলন্ত ‘‌ডিকসোনারি’‌।
আসলে পুরনো বাংলা ছবির মেজাজকে না হলেও, কিছু কিছু উপাদানকে এ ছবি সযত্নে ‘‌রেফারেন্স পয়েন্ট’ হিসেবে ধরতে চেয়েছে। যেমন মেসবাড়ি, পার্শ্বচরিত্রদের গুরুত্ব, পুরনো সুরের গান ও আবহ সঙ্গীত, আসবাবপত্র— এগুলো খুব যত্ন করে ধরা। এ ব্যাপারে বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের ক্যামেরা আর অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত সত্যিই ছবির মেজাজকে গড়ে নিতে খুবই সহায়ক হয়েছে। তবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুরনো গানের রেকর্ডটি একটি মুহূর্তে ঠিকভাবে ব্যবহৃত হতে হতেও যেন পূর্ণতা পেল না।
এইসব চরিত্রদের কেন্দ্রে গল্পের দ্বিতীয়ার্ধে চলে আসে এক প্রযোজক তথা বিস্কুট ব্যবসায়ী ভবতোষবাবু (‌কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এমন এক চরিত্র করেছেন এবং এমন ভাবে করেছেন যা তিনি কখনই করেননি)‌ আর তার স্ত্রী মাধবীদেবী (‌অপরাজিতা আঢ্যই, সন্দেহ নেই, এমনভাবে দাগে দাগ মেলানো একটা চরিত্রকে প্রাণবন্ত করতে পারে)‌। প্রবল ঝগড়া করা এই দম্পতিই হয়ে ওঠে ছবির মূল আকর্ষণ। এই দুজনের সশরীরে বা ফোনে মুখোমুখি হয়ে ঝগড়া বা ভালবাসা বিনিময়ের দৃশ্যগুলো সত্যিই অনবদ্য তথা এই ছবির গড় মানের অনেকখানি ওপরে। কিছু কিছু জায়গায় তো তুলসী চক্রবর্তী আর মলিনা দেবীর সেই ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌–‌এর স্মৃতি মনে এনে দেয়।
খরাজের লেখা কিডন্যাপ‌কেন্দ্রিক একটি চিত্রনাট্য ভবতোষবাবুকে শোনাতে না পেরে, ওই চিত্রনাট্যের গল্প অনুযায়ী বাস্তবেও ভবতোষবাবুর স্ত্রীকে ‘‌কিডন্যাপ’‌ করে কখগঘ–সহ অন্যরা। এই অংশের ভাবনা খুবই হাস্যকর ও অবাস্তব, তবু অভিনয়গুণে দেখতে মজা লাগে। বিশেষত মাধবীর প্রতি বয়স্ক কানাইয়ের আকৃষ্ট হয়ে পড়ার নীরব মুহূর্তগুলি। এই অংশে অভিনেতা লামাকে দর্শক নতুন করে আবিষ্কার করবে। গোটা ছবিজুড়েই পরান বন্দ্যোপাধ্যায় যথারীতি অনবদ্য। তবু এ ছবি পুরোপুরি আঁট বাঁধে না। খানিকটা যেন ছোট–ছোট মজার সিকোয়েন্স নির্ভর ‘‌কমেডি শো’‌ হয়েই থেকে যায়। চিত্রনাট্যের দাবি অনুযায়ী হাসিটা যতটা ফোটে, চোখের জলটা ততটা ফোটে না।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top