সম্রাট মুখোপাধ্যায়: দ্বিতীয় পুরুষ। পরিচালনা:‌ সৃজিত মুখোপাধ্যায়। অভিনয়েঃ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, গৌরব চক্রবর্তী, রাইমা সেন, ঋদ্ধিমা ঘোষ, আবির চট্টোপাধ্যায়, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, সোমহ মৈত্র, বাবুল সুপ্রিয়, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
‘‌আইডেন্টিটি থ্রিলার’‌, মানুষের পরিচিতি আর প্রকৃত অস্বিত্বের ভেতর এক গুলিয়ে দেওয়ার খেলা। ইদানিং–‌এর হলিউডের বেশ পছন্দের ‘‌তাস’‌ নয় নয় করে যা বার চারেক খেলে ফেললেন পরিচালক চিত্রনাট্যকার সৃজিত মুখোপাধ্যায়। রহস্য–‌ছবি বানাতে বসে। প্রথমবার ‘‌বাইশে শ্রাবণ’‌ (‌২০১১)‌, দ্বিতীয়বার ‘‌চতুষ্কোন’‌ (‌২০১৪)‌, তৃতীয়বার ‘‌ভিঞ্চিদা’‌ (‌২০১৯)‌, আর এইবার ‘‌দ্বিতীয়পুরুষ’‌। এ’‌ ছাড়াও খেয়াল করে দেখলে তঁার নানারকমের ‘‌পিরিয়ড পিস’‌–‌এর মধ্যেও ছড়িয়ে আছে এই অস্তিত্ব নিয়ে রহস্যের প্রশ্নটী। যেমন ‘‌জাতিস্মর’‌, ‘‌এক যে ছিল রাজা’‌ বা হাল আমলের ‘‌গুমনামি’‌। এবারের ছবি ‘‌দ্বিতীয় পুরুষ’‌ ‘‌অবশ্য’‌ ‘‌অফিসিয়াল’‌ই ঘোষিত সাড়ে আট বছর আগের ছবি ‘‌বাইশে শ্রাবণ’‌–‌এর ‘‌সিক্যুয়েল’‌ হিসাবে, 
সেদিক থেকে ‘‌বাইশে শ্রাবণ’‌ যেখানে শেষ হয়, প্রায় সেখান থেকেই শুরু হয় ‘‌দ্বিতীয় পুরুষ’‌। মাঝখানে যেটুকু সময়ের ‘‌গ্যাপ’‌ আছে, তা ধর্তব্যের মধ্যে না আনাই ভাল। যেখানে ঐ ছবির চোর–‌পুলিশ খেলা, থুড়ি, বলা উচিত খুনি–‌পুলিশ খেলা শেষ হয়েছিল, সেখান থেকেই এ’‌ছবি শুরু হচ্ছে। ঐ ছবির শেষে সিরিয়াল কিলার প্রবীর রায়চৌধুরীর মৃত্যু হয়ে ছিল, যিনি একই অঙ্গে ছিলেন খুনী ও পুলিশ। এবারের ছবিও শুরু হচ্ছে এক ধারাবাহিক খুনীর কর্মকান্ড দিয়ে। আগের ছবির মতোই এ’‌ছবিরও খুনের কর্মকান্ড গুলো ঘটছে কলকাতার কিছু প্রান্তীয়, নিম্নবর্গীয় এলাকায়, যার ভেতরে ‘‌পশ’‌ ব্যাপারটা নেই। বরং বেশ খানিকটা অসমতল, পালিশহীন ব্যাপার আছে। সময় এগিয়েছে। সৃজিত ও খানিকটা ‘‌টেকনিক’‌ বদলেছেন। আরও রুক্ষ হয়েছেন। ‘‌বাইশে শ্রাবন’‌ এর গায়ে লেগে থাকা কবি–‌কবিতার আবহ, ভিজে মেঘলা দিনের দৃশ্যমালা, লিরিকাল মেজাজ এসব থেকে অনেকটা সরে এসে এ’‌ছবির ভিস্যুয়াল মেজাজে নিয়ে এসেছেন চড়া লাল রঙের প্রধান্য, কানে আঙুল দেবার মতো বাছবিচারহীন গালিগালাজ আরও বেশি রক্ত আর খুনের আগে পরে ‘‌ভায়োলেন্ট’‌ সব কান্ডকারখানা। দৃশ্যত যা চড়া মাপের কোরিয়ান থ্রিলারের কাছাকাছি। আর কাহিনীগত ভাবে  ‘‌পাল্ল–‌ফিকশান’‌–‌এর অনুগামী। ছবির মাঝপথে একটু পেলব ত্রিকোন সম্পর্কের একটা আভাস এসেছে। বেশ চেনা ‘‌লিরিকাল’‌ মেজাজ নিয়েই তা আসছিল। কিন্তু অল্পদূর এগিয়েই তা ভেস্তে গেছে। তাতে দ্বিতীয় নায়ক হিসাবে আবিরের (‌চট্টোপাধ্যায়)‌ ‘‌ট্র‌্যাক’‌ টা হয়ত অসমাপ্ত হয়ে গেছে বা রাইমা সেনের করা চরিত্রটার প্রাসঙ্গিকতাও অনেকটা খাটো হয়েছে, কিন্তু এটাও ঠিক এ’‌ছবির বুনো আঁশটে মেজাজের সঙ্গে ঐ সাব প্লট’‌টা যাচ্ছিল না। দ্রুতই গল্প ফিরেছে খোকাগুন্ডার ট্র‌্যাকে। খোকাই এ’‌ ছবির কর্ণ। খোকাই এ’‌ ছবির অর্জুন। খোকাই এ’‌ ছবির দুঃশাসন। হয়ত বেদব্যাসও। ছবিতে খোকা কী করে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সে একজন ‘‌সিরিয়াল কিলার’।‌ ছবি চালু–‌ছকের ‘‌হুডান ইট’‌ নয়। এ’‌ছবি হাউ ডান ইট’‌ ও নয়। এ’‌ ছবি রহস্যের চরিত্রের দিক থেকে বরং ‘‌হোয়াই ডান ইট’‌। কেন খুনগুলো হচ্ছে?‌ ছবির প্রথম রহস্যটা তৈরি হয় একটা অদ্ভূত কোন থেকে!‌ গল্প থেকে নয়। ‘‌কাস্টিং’‌ থেকে!‌ ‘‌খোকাগুন্ডা’‌টি কে?‌ ছবির প্রথম অর্ধে তার চরিত্রে দেখি কিশোর অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়কে। এ’‌ছবিতে তার অভিনয়ের ‘‌রেঞ্জ’‌, নিজেকে বদলে ফেলা, রুক্ষ সংলাপ বলার স্টাইল, মুখভঙ্গী থেকে মুখশ্রী সর্বত্রই সে অন্যরকম। চমকদার। এতটা দাগকাটা দাপুটে একজন অভিনেতা মধ্য পথে হারিয়ে গিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে চলে আসে অনির্বান ভট্টাচার্য। ‘‌খোকা’‌ হয়ে। এ’‌ছবিতে অনির্বান পাক্কা ‘‌সাব অল্টার্ন’‌। ধন্য তার সাহস!‌ তবে এই দুই চরিত্রই কিন্তু ছবির শেষ কথা নয়। কারন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। প্রবীর রায়চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে তার ছাত্র অভিজিৎ (‌পরমব্রত)‌ এবার রহস্য সন্ধানী। তার ডুবতে চলা বিয়ে আর একলব্যসম শিষ্য রজত (‌গৌরব চক্রবর্তী)‌ তার জীবনের দুই অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এরই মধ্যে ঢুকে পড়ে খোকাগুন্ডা–‌রহস্য। ‘‌খোকা’‌কে নিয়েই যত কাণ্ড এবং খোকার গল্প শেষপর্যন্ত খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্যও হয়ে ওঠে না। সৃজিত মুখোপাধ্যায় তো এর আগে তাঁর ছবিতে গল্পকে বেশ যুক্তি দিয়েই সাজিয়েছেন। এখানে সত্যিই তার অভাব ঘটেছে।‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top