সম্রাট মুখোপাধ্যায়: চালচিত্রের জয়। চারদিক দিয়েই। এক, গল্পে দুর্গাপুজো। দুই, রহস্যের ম্যাপ চালচিত্রে। তিন, চালচিত্রের ‘‌টিম দুর্গা’‌র মতোই টিম সোনাদা জমজমাট। চার, ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে এক (‌পিসি)‌মা ও তার গোটা পরিবার, মায় অসুরসমেত।
ঠিক এক বছর আগে গরমের ছুটিতে বেরিয়েছিল সোনাদা ওরফে সুবর্ণ সেনের প্রথম অ্যাডভেঞ্চার ‘‌গুপ্তধনের সন্ধানে’‌। সে ছবি দেখেই বোঝা গিয়েছিল ভরা–‌ফেলুদা–‌ব্যোমকেশ–‌কিরীটীর বাজারে নতুন ‘‌ফ্র‌্যাঞ্চাইজি’‌ রহস্য‌সন্ধানী টিম আনতে চাইছেন পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় আর কাহিনিকার শুভেন্দু দাশমুন্সি। সুবর্ণ সেন আদতে অক্সফোর্ড প্রত্যাগত ইতিহাসের অধ্যাপক। অতএব তার খোলা রহস্য–‌জটের গিঁট ইতিহাসের গোলকধাঁধায়। আর শেষে প্রাপ্তি প্রাচীনকাল থেকে বাংলার মাটিতে রক্ষিত গুপ্তধন। যারা ইতিহাসের কোনও–না–কোনও পালাবদলের সাক্ষী।
গতবার তা ছিল মুঘল সম্রাট শাহজাহানের মেজ পুত্র তথা সুবে–‌বাংলার একদা শাসনকর্তা শাহ সুজার রেখে যাওয়া গুপ্তধন। গোয়েন্দা–‌সিরিজের প্রথম কাহিনিতে সাধারণত গোয়েন্দা বা তার সহকারীর পরিবারেই প্রথম রহস্য‌সন্ধান ঘটে, সে নিয়ম মেনেই সে গুপ্তধন রক্ষিত ছিল সোনাদার পরিবারেই। আর তা খুঁজতে গিয়েছিল সোনাদা‌ (‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌, তার ভাইপো (‌যদিও সে সোনাকাকাকে ডাকে ‘‌সোনাদা’‌ বলে)‌ সদা– খাই–খাই আবির (‌অর্জুন চক্রবর্তী)‌, আর আবিরের হবু বউ তথা ভাল ছাত্রী ঝিনুক (‌ঈশা সাহা)‌। এবার তাদের গন্তব্য বনপুকুরিয়ার দেবরায় বাড়ি। কারণ হঠাৎ–‌প্রাপ্ত এক ঐতিহাসিক ছোরা সূত্রে সোনাদা বুঝতে পারে, ওই বাড়িতে লুকোনো আছে জগৎ শেঠের গুপ্তধন। মানে এবারের গল্পে ইতিহাসের সময়– চৌহদ্দি ১৭৫৬–‌৫৭। নবাব সিরাজদ্দৌলার আমল।
এ ‌সিনেমার আসল গুপ্তধন তো রহস্যের তদন্ত নয়, আদতে ইতিহাসের তদন্ত। ফলে ‘‌দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’‌ ছবি জুড়ে উঠে এসেছে বারবার ইতিহাসের নানা ‘‌অ্যানেকডোটস’‌। সেই জায়গাগুলোয় এ ‌ছবি ঠিক দেখার নয়, শোনার। যেন গরমের ছুটিতে কিশোর–‌কিশোরীদের জন্য সরস ইতিহাসের ক্লাস। ছবির শুরুতেই সিরাজ–‌জগৎ–‌পলাশি পর্বের ইতিহাসটাও জমজমাট একটা ‘‌অ্যানিমেশন–ক্যাপসুল’‌–‌এ দেখানো হয়ে যায়। সন্দেহ নেই, বেশ ‘‌স্মার্ট’‌ উপস্থাপনা। ছবির মেজাজটাও ধরিয়ে দেয় শুরু থেকেই।
বরং তারপর ছবিটা মূল রহস্যে ঢুকতে যেন একটু বেশি সময় নেয়। সোনাদার বক্তব্যে বারবার যেভাবে ইতিহাসের কথা উঠে আসে, সেটা মাঝে মাঝে যেন জোর করে ক্লাস নেওয়ার মতো। একটু কাটছাঁট দরকার। আবির–‌ঝিনুকের প্রেমের খুনসুটি বড্ড ‘‌রিপিটেটিভ’‌। দেবরায়–‌বাড়ির অন্দরে ঝিনুকের অভ্যর্থনার অংশগুলোও অপ্রাসঙ্গিক। এ ‌ছবিতে অপুদা (‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌ চরিত্রটি সূত্রে এমনিতেই মজার প্রচুর উপাদান ছিল, বাড়তি রিলিফের জন্য আর এই আবির–‌ঝিনুক খুনসুটিটার দরকার ছিল না। যেমন, অত ‘‌স্মার্ট অ্যানিমেশন’‌ পর্বের পর একটু হাস্যকর লাগে জলের তলার দৃশ্য বা ভালুক আসার দৃশ্যের ‘‌ভি এফ এক্স’গুলো। জলের তলায় যেভাবে আবির তথা অর্জুন বহুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটা যেন জল-‌হীন চৌবাচ্চায় দাঁড়িয়ে থাকার মতো। এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটা লজিক্যাল হোয়া দরকার ছিল।
তবে এ ‌ছবিতে এসব দুর্বলতা সামাল হয়ে গেছে দুটো উপাদানের জোরে। এক, দেবরায়–‌বাড়ির পারিবারিক নাটক। সেখানে কেন্দ্রবিন্দু পিসিমাকে (‌লিলি চক্রবর্তী)‌ ঘিরে তিন ভাইপো— সোনাদাকে এই বাড়িতে টেনে নিয়ে যাওয়া সোনাদার কলেজ–‌ছাত্র ডম্বরুপানি (‌আরিয়ান)‌ ওরফে ডাম্বেল (‌এবার থেকে সেও কি টিম সোনাদার সদস্য হল?‌)‌, সদাশয়– অতিথিবৎসল পিনাকপানি (‌অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়)‌ আর সদা সন্দেহবাতিকগ্রস্ত–দুর্মুখ–‌স্বার্থপর পরিবারের ‘‌ব্ল্যাকশিপ’‌ ত্রিশূলপানি (‌কৌশিক সেন)‌। আছে বড় দুই ভাইয়ের বৌয়েরা আর মিষ্টি এক ছেলে। আছে বাড়ির চাকর সেজে আসা দুষ্টু এক চোর (‌লামা)‌, তার সহকারী, দুর্গামূর্তিকার (‌নিমাই ঘোষ)‌ আর হাস্যকর এক ড্রাইভার সমেত মজাদার অপুদা, যে বাড়ির ছেলের মতো। গুপ্তধন, পুজো, সম্পত্তি নিয়ে টানটান লড়াই থেকেছে ছবি জুড়ে পুজোর ক’‌দিন।
আর কৃতিত্ব নং দুই, রহস্যের শেষ দু‌টো প্যাঁচ মানে ‘‌গুপ্তধন কীভাবে’‌ ও ‘‌অপরাধী কে’‌ তা কিন্তু বেশ আস্তিনের তাসের মতোই পড়েছে শেষে। আবিরের অভিনয়ে কাঙ্ক্ষিত সপ্রতিভতা আর অর্জুনের অভিনয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্যাবলামি— দুটোই ঠিকঠাক ‘‌সাপ্লাই’‌ হয়েছে। ঈশা মানানসই। বিক্রম ঘোষের আবহ ছবির মেজাজ মুঠোবন্দি করে রেখেছে। এ ‌সিরিজ যেন এখন পুজোসংখ্যার ধারাবাহিক। বছর–‌বছর নতুন অভিযান। দেখা যাক এর পরের গুপ্তধনে ইতিহাসের কোন পাতা খোলে।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top