সম্রাট মুখোপাধ্যায়


জীবিতের শোক মৃতে গ্রহণ করে না।
তবু আমরা জীবনের দিক থেকেই বারবার মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করি। কারণ একজন মানুষের মৃত্যু রচিত হয় তাকে ঘিরে থাকা অন্য অনেক মানুষের কথা–কাজ–ভাবনার ভেতর দিয়ে। একটি মৃত্যু যেন একটি ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌। তাকে অজান্তে রচনা করে চলেছে ওইসব সংশ্লিষ্ট মানুষেরা।
একে ছেঁকে তুললেই নাটক। বা চিত্রনাট্য। উপন্যাসও। জীবনের আপাত অ–নাটকীয়তার ভেতরেও। মোস্তাফা সারওয়ার ফারুকীর আপাত অ–নাটকীয় চিত্রনাট্যের ভেতরও তেমন এক চলন আছে। বাইরে থেকে যা দেখলে মনে হয় যেন এর ভেতর কোনও নাটক নেই!‌ কোনও দ্বন্দ্ব নেই!‌ হয়ত বা এর কোনও ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌ও নেই!‌
কিন্তু প্রবল একটি ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌ আছে। যা হঠাৎ ঢেউয়ের ধাক্কার মতো আছড়ে পড়ে চিত্রনাট্যের উপকূলে। একটি মৃত্যু। এক তুমুল প্রতিভাধর, খ্যাতিমান লেখকের মৃত্যু। যার গায়ে বিষাদ ছাপিয়ে লেগে যায় ‘‌সেলিব্রিটি–ইভেন্ট’‌–এর ছায়া। ‘‌গ্ল্যামার’‌। বোঝা যায়, এমন একটি বড় এবং নাটকীয় ঘটনা ঘটিয়ে দেবেন বলেই ফারুকী এতক্ষণ তঁার চিত্রনাট্যে ঘনিয়ে রাখছিলেন অ–নাটকীয়তার ছায়াকে। প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন ঘটনা তেমনভাবে না ঘটার অ–চলনকে।
মূলত চারটি চরিত্র। কেউই বড় কোনও বৃত্তে ছড়িয়ে যান না। প্রধানত নিজের নিজের নিঃসঙ্গতা, অসম্পূর্ণতা, ব্যথাগুলোকে ঘিরেই ঘুরপাক খান। মনে–মনে। নীরব দৃষ্টিপাতে। 
ফারুকীর এ ছবিতে তাই কথা এত কম। সেই শূন্যস্থান পূরণ করে জলের শব্দ, গাছের পাতার ফঁাকে বয়ে চলা বাতাসের শব্দ। প্রায় মুদ্রাদোষের মতো করে এ’‌দুটি শব্দকে আর তার সঙ্গে মিলিয়ে পর্দায় নদী–পাহাড়–বৃক্ষচূড়ার লম্বা লম্বা সেমি ক্লোজ‌ আর ‌মিড লং শট রেখে যান ফারুকী। বোঝা যায় এরা পরিকল্পিত ‘‌সিকোয়েন্স’‌ বা ‘‌মিজোসিন’‌। আবার প্রয়োজন মতো সম্পাদনা টেবিলেও এদের গড়ে–পিটে নেওয়া হয়েছে। আর এর ভেতর দিয়েই পারিবারিক নাট্য বা ত্রিকোণ প্রেমের রগরগে চেহারাটাকে ভেঙেছেন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিভাবান পরিচালক।
মনে রাখতে হবে ফারুকীর হাতে এবার ছিল ইরফান খানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতা। ছিল পার্ণো মিত্রের মতো দাপুটে অভিনেত্রী। ফারুকীর এর আগের ছবিগুলোর অব্যর্থ তীর তথা আবেদন নুসরত ইমরোজ তিশাও ছিলেন। এবং ছিলেন ওপার বাংলার আরেক অভিজ্ঞ অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীও। এরা নিজের নিজের জায়গায় এবারও অনবদ্য। প্রত্যেকেই যেন চরিত্রের রক্ত–মাংস ভেদ করে হৃদয় পর্যন্ত অনুসন্ধান করেছেন। বিশেষত ইরফান সামান্য সুযোগেই, ক্যামেরার ক্ষণিকের অমনোযোগী দৃষ্টিপাতেও নীরবতার ভেতরে এমন সব অভিব্যক্তি চারিয়ে দিয়েছেন, যা দর্শক–মনে মুগ্ধতারও অধিক কিছু জন্ম দেয়। একটি চরিত্র, যে প্রবল ‘‌গ্ল্যামারাস’‌ জীবন যাপন করে, অথচ তার ভেতর দিয়েই সে যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে এক নিশ্চিত ইচ্ছামৃত্যুর দিকে, এমন চরিত্রে ইরফান আগে কখনও অভিনয় করেননি। তঁার অভিনয়ে, স্বরক্ষেপণে, অভিব্যক্তিতে মৃত্যুর ছায়া এবং তার বলয় ছবির চলনের সঙ্গে যেভাবে বেড়েছে, কোনওরকম অতিরিক্ত ইঙ্গিত বা মেকআপ ছাড়াই, তা দেখার এবং শেখার মতো। নিঃসন্দেহে ইরফান এখন অভিনয়ের এক খোলা কপিবুক। পার্ণো বা তিশা সুযোগ মতো নিজেদের জাত চিনিয়েছেন এটা যেমন সত্য, তেমনই এটাও আবার সত্য যে তঁাদের চরিত্রগুলো চিত্রনাট্যে যেন মাঝে–মাঝে হঠাৎ–হঠাৎ স্থানাঙ্ক পায়। আবার প্রত্যাশা জাগিয়েই হঠাৎ হঠাৎই অদৃশ্যও হয়ে যায়। ধারাবাহিক স্থিতি পায় না। জানি না এটা পরিচালকের বিশেষ কোনও কৌশল কিনা, কিন্তু এতে চিত্রনাট্য বড় বেশি জাভেদ হাসান মানে ইরফানকেন্দ্রীক হয়ে গেছে। ছবির প্রথম দিকে তঁার স্ত্রীর চরিত্র অর্থাৎ মায়াকে (‌রোকেয়া প্রাচী)‌ বরং অনেক রক্তমাংসময় মনে হয়েছিল। কিন্তু ছবির অন্তিম ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–এ তিনিও যেন কিছুটা অনুপস্থিত।
এটাই হয়ত এ’‌ছবির দুর্বলতা। এক পুরুষ, চলচ্চিত্র পরিচালক জাভেদ হাসান (‌ইরফান)‌ আর তঁার জীবনের তিন নারী প্রথমা স্ত্রী মায়া, মেয়ে সাবেরি (‌তিশা)‌ আর দ্বিতীয় স্ত্রী তথা একদা মেয়ের সহপাঠিনী নিতুর (‌পার্ণো)‌ মধ্যে টানাপোড়েনের গল্পই এ’‌ছবি। কিন্তু এই ‘‌থ্রি ইজ টু ওয়ান’‌ টানাপোড়েনের মূল ভরকেন্দ্র কোনটা হবে, তা বেছে নিতে গিয়ে চিত্রনাট্য যেন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। এমনকী দুই সহপাঠিনীর বহু বছর বাদে যে পুনর্মিলন দিয়ে ছবি শুরু, তা যখন যাবতীয় ফ্ল্যাশব্যাক–পর্ব সেরে ফিরে আসে ছবির শেষে, বোঝা যায় বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। কিন্তু অন্তিম টানাপোড়েন বা রচিত দূরত্বটুকু যথাযথ অভিঘাত পায় না। বরং কিছুটা যেন পূর্ব–নির্ধারিত লাগে। গোটা ছবি জুড়ে চালু মডেলের যেসব ‘‌ক্লিশে’‌গুলোকে সরিয়ে দেন ফারুকী, তা যেন ফিরে আসে মনে হয়। তুঙ্গ মুহূর্তটি তৈরি হয় না।
ফারুকীর ছবির যঁারা নিয়মিত দর্শক, তঁারা অবশ্য এ’‌ছবি দেখে অপরিচয়ের অস্বস্তিতে ভুগবেন অন্য একটা দিক থেকে। ‘‌থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’‌ থেকে ‘‌পিপড়া বিদ্যা’‌ পর্যন্ত ফারুকীর প্রতিষ্ঠিত যে মৌলিক সিনে–ভাষা, তাতে প্রাধান্য থাকত অর্ন্তবাস্তবতার। ‘‌পিপড়া বিদ্যা’‌য় যা চূড়ান্তে পৌঁছেছিল। বাইরের জগৎ প্রধান চরিত্রটির জীবনে যে সমস্যা, যে যন্ত্রণা তৈরি করেছে, তার থেকে চরিত্রটি মুক্তি খুঁজে পেত নিজের ভেতরে লালিত অন্য এক বাস্তবতায় ডুব দিয়ে। ফারুকীর ছবিতে বাস্তবতাকে ভাঙার এই চর্চা এই উপমহাদেশের ছবিকে এক নতুন ভাষা দিচ্ছিল। ফারুকীর মতো তরুণ পরিচালকের দ্রুত পরিচিতির ক্ষেত্রে যা ছিল প্রধান উপাদান।
এবারের ছবির নামে ‘‌ডুব’‌ থাকলেও, প্রধান চরিত্রটি আস্তে আস্তে সমস্যার কেন্দ্রে ঢুকে গেলেও, পরিত্রাণের জন্য ওই আলাদা বাস্তবতায় ডুব দেওয়াটা পেলাম না। পেলাম না, জাভেদের শিল্পকর্মের কিছু নমুনা, যেখানে ব্যক্তিগত সমস্যা ছায়া ফেলছে। বদলে এল কিছু ‘‌ফ্ল্যাশব্যাক’‌–এর ছেঁড়া–ছেঁড়া দৃশ্য। ফারুকীর শক্ত কব্জিগুণে যারা আলাদা–আলাদাভাবে দেখতে ভাল– এই যা। বাণিজ্যের বড় বাজার কি ফারুকীর ওপর তাহলে চাপ তৈরি করল?‌
অথচ এ’‌ছবিতেও ফারুকী অন্য একটা সাহস দেখিয়েছিলেন। ছবি দেখে দর্শকেরা বুঝবেন, বাংলাদেশের প্রবল জনপ্রিয় এক সাহিত্যিক তথা পরিচালকের সঙ্গে মিল আছে জাভেদ হাসানের। কিন্তু সংযত হাতে ওই মিলকে আপতিকতাতেই আটকে রেখেছেন ফারুকী। কেচ্ছা হতে দেননি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top