অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: প্রেমকে কেউ আকাশ বলেছেন। কেউ বলেছেন মোমবাতি। কত জন যে কত‌ কিছু বলেছেন, তবু প্রেমের রহস্য‌ মোচন হয়নি এতটুকু। তাই আজও এত গান, এত গল্প ও সিনেমা। এবং কৌশিক গাঙ্গুলির ‘‌দৃষ্টিকোণ’‌। আর যে বাংলা ছবিতে নায়ক, নায়িকা প্রসেনজিৎ আর ঋতুপর্ণা, সেখানে তাঁদের ঘিরেই যে প্রেমের গল্প তৈরি হয়ে উঠবে, তার কোনও সন্দেহ নেই। সে প্রেম যতই প্রাক্তন হোক কি বর্তমান!
ছবির শুরুতেই জানা যায়, শ্রীমতীর (‌ঋতুপর্ণা)‌ স্বামী পলাশ সেন (‌কৌশিক সেন)‌ মারা গেছেন। শুরুতেই দেখা যায়, অ্যাডভোকেট জিয়নের (‌প্রসেনজিৎ)‌ একটা চোখ মার্বেলের মতো সাদা। এবং সেই জিয়নের কাছেই আসে শ্রীমতী। কারণ, তার সন্দেহ, তার স্বামীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। বোঝাই গেল, প্রেমের সরল, সাধাসিধে গল্পে জিয়ন, শ্রীমতীকে টেনে আনছেন না পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি। ফলে, ছবিতে এসে পড়ল রহস্য। কিন্তু উকিলের সঙ্গে গোয়েন্দার কী তফাৎ?‌ এমন প্রশ্ন ছবিতেই তোলেন পরিচালক। এবং স্বামীর মৃত্যু-‌রহস্য উদঘাটনে এসে উকিলের পরিবারেই মিশে যায় শ্রীমতী। কিন্তু ঘরে তো জিয়নের স্ত্রী রুমকি (‌চূর্ণী)‌ আছে, দুই সন্তান আছে।
মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে আসলে কি জিয়ন আর শ্রীমতী জড়িয়ে পড়ল প্রেমে?‌ শ্রীমতীর ঘরে তার প্রায় পঙ্গু ভাসুর (‌কৌশিক গাঙ্গুলি), যে হাঁটতে পারে না, চলাফেরা করে হুইল চেয়ারে। তাকে দেখাশোনার মেয়েটি (‌দোলন রায়)‌ থাকে শ্রীমতীদের বাড়িতেই।
রহস্য, থ্রিলার, প্রেমে জমজমাট এক রুদ্ধশ্বাস ছবি তৈরি করেছেন পরিচালক। প্রেমের সঙ্গে থ্রিলার মেশানো যাবে না, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কিন্তু গল্পটা মানে সিনেমাটা প্রেক্ষাগৃহে গিয়েই দেখতে হবে। গল্প-‌বলা বারণ।
অভিনয়ে মুগ্ধ করেছেন শুধু প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণাই নন, চূর্ণীও। কৌশিক গাঙ্গুলি এবং দোলন রায়ও মনে থেকে যাবেন। কৌশিক সেনেরই খুব একটা কিছু করার নেই।
প্রথম অভিবাদন প্রাপ্য প্রসেনজিতের। একটা পাথরের মতো সাদা চোখ নিয়ে অভিনয় করার হিম্মত বাংলা ছবিতে এর আগে কেউ দেখাতে পারেননি। এবং পরিণত অভিনয়ের আর একটা দৃষ্টান্ত রাখলেন তিনি। এবং প্রেমে, আগ্রাসনে‌‌ ও বিষাদে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও স্মরণীয় অভিনয় করলেন। গভীরতাস্পর্শী অভিনয় চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের। এ ছবিতেও অনুপম রায়ের সঙ্গীত খুব ভালো, সন্দেহ নেই। কিন্তু এছবির দ্বিতীয়ার্ধের গতির সঙ্গে গান খুব সুপ্রযুক্ত নয়। গান কেন কৌশিকের ছবিতেও বি চৌধুরির মানে-‌বই হবে?‌ সুন্দর গেয়েছেন অনুপম, ইমন, পালোমা।
দৃষ্টিকোণ আসলে অন্য এক দৃষ্টি দিয়ে দেখা সম্পর্কের ছবি। যে গল্পে থ্রিলার আছে, যে গল্পে চোখে চুমু খেতে গিয়ে আশ্লেষে ঠোঁটে-‌ঠোঁট রেখে চুম্বন আছে, রহস্য আছে, সংসার ভাঙতে ভাঙতেও গড়ে তোলা আছে, খুন আছে, মৃত্যু আছে, জীবন তো আছেই, সেখানে ছবির গল্প নিয়ে বেশি কিছু বলার ‘‌হক’‌ প্রতিবেদকের নেই। কিন্তু প্রেম মানে যে শুধু বাঁধা পড়া নয়, দূরত্বও কখনও বেঁধে রাখতে পারে প্রেমকে, সেই বার্তা যে দিতে চেয়েছে ‘‌দৃষ্টিকোণ’‌, এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এ ছবির, শেষপর্যন্ত, তাই ধ্রুবপদ হতে পারে চন্দ্রবিন্দুর সেই লাইন দুটো— যদি বলো আড়ি, তোমাকেও ছেড়ে যেতে পারি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top