অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ১৮ বছর আগে হরনাথ চক্রবর্তী একটা ছবি করেছিলেন—‘‌শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’‌। সুপারহিট ছবি। কিন্তু সেই ছবির ঘরানা আজ শেষ। অথচ, ওই সব ছবিই একসময় বাঁচিয়ে রেখেছিল বাংলা সিনেমার তথাকথিত মূলধারাকে এবং ইন্ডাস্ট্রিকে।
এখন বাংলা ছবির মূলধারাটাই পাল্টে গেছে। ‘‌শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’‌ ছবির নায়ক, নায়িকা প্রসেনজিৎ এবং ঋতুপর্ণা এখন বাংলার অন্যধারার ছবিরও প্রধান মুখ। এই তো কদিন পরেই প্রসেনজিৎ আর ঋতুপর্ণাকে নিয়ে তৈরি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘‌দৃষ্টিকোণ’‌ মুক্তি পাবে।
নায়ক, নায়িকা নতুন পথে হাঁটছেন দ্রুতগতিতে। কিন্তু হরনাথ চক্রবর্তী কি সেই একই ধারায় থেকে গেছেন?‌
এই উত্তরটা যে একটা বড় ‘‌না’‌, সেটা প্রমাণ করলেন হরনাথ তাঁর নতুন ছবি ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এ। ‘‌‌দৃষ্টিকোণ’‌-‌এর প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণার সঙ্গে যেমন ‘‌শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’‌-‌এর কোনও মিল পাবেন না দর্শক, তেমন-‌ই ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এর সঙ্গে ‘‌শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’‌-‌এর হরনাথের কোনও মিল পাবেন না দর্শক।
কিন্তু ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এর হরনাথ প্রমাণ করে দিলেন, সিনেমাটা তিনি তৈরি করতে জানেন। এবং ঠিকঠাক কাহিনী পেলে তিনি আজকের নবীন অন্যধারার পরিচালকদের যে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারেন, এটা প্রমান করলেন ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এর হরনাথ চক্রবর্তী। তাঁর গায়ে স্ট্যাম্প মেরে দেওয়া তথাকথিত ফর্মুলার ধারা ভেঙে তিনি যে নতুন পথে হাঁটতে পারেন, তার প্রমাণ ‘‌ধারাস্নান’‌।
এই সময়ের লেখক উল্লাস মল্লিকের সমাজ ও রাজনীতি জড়ানো এক অন্যধারার কাহিনী নিয়ে এই ছবিটা তৈরি করেছেন হরনাথ। এমন একটা অন্যরকম বিষয় নিয়ে যে ছবি করার ক্ষমতা হরনাথের আছে, সেই বিশ্বাসটা তাঁর ওপর রাখার জন্যে ধন্যবাদ পাবেন ‘‌আত্রেয়ী নির্মান’‌ ও ‘‌গোল্ডেন আই’‌ প্রযোজনা সংস্থা।
এ ছবির কাহিনীর কেন্দ্র তমসা আর শান্তশীল। ঠকিয়ে তমসার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল শান্তশীলের। হতদরিদ্র অবস্থা থেকে সংসারকে দাঁড় করাতে গিয়ে তমসার লড়াই শুরু হয়। আর তার পাশে সফল ডাক্তার থেকে বিশাল ব্যবসায়ী এসে দাঁড়ায়, একদম বিনিময় প্রথার ধাঁচে। তমসার শরীরের প্রতি তাদের লোভটা প্রকট। এটা তমসা বুঝতে পারে। একটা সময় এটাই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে করতে তমসা অগ্রাহ্য করে তার ‘‌তুচ্ছ’‌ স্বামী শান্তশীলকে, চারপাশের জগৎকে। তমসার এই জার্নিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চারপাশের সমাজ ও রাজনীতি। শিকার ও শিকারীর অবস্থান বদলাতে থাকে।
অদ্ভুত একটা চরিত্র শান্তশীল। সেই ‘‌তুচ্ছ’‌, ‘‌দুর্বল’‌ মানুষটার সবল এক বন্ধু ‘‌ভিক্ষে’‌ করে টাকা রোজগার করে। সেও যে তুচ্ছ নয়, এটা প্রমান করতে একদিন শান্তশীলও ভিক্ষে করতে বের হয়। এক অসাধারণ বাঁক এই ছবির। কী যত্ন নিয়ে যে এই অংশটা নির্মান করেছেন হরনাথ, তারিফ না করে পারা যায় না।
শুধু এই অংশটা কেন, সারা ছবিটাই যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন হরনাথ চক্রবর্তী। সিনেমাটোগ্রাফার সৌভিক বসু দক্ষতার সঙ্গে পাশে থেকেছেন পরিচালকের। মনতোষ চক্রবর্তী যথার্থ সম্মান দিয়েই উল্লাস মল্লিকের কাহিনীকে চিত্রনাট্যে রূপ দিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত ভাল। কিন্তু ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌র অসাধারণ সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি এখানে কোনও কোনও ক্ষেত্রে লাউড। ঋতুপর্ণা আর সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের একটি কোলাজ দৃশ্যে গানের ব্যবহার এই ছবির মেজাজের সঙ্গে মানানসই নয়।
ঋতুপর্ণার জুটি কাঞ্চন—ধারাস্নান-‌এ এটাও পরিচালকের একটা মাস্টার স্ট্রোক। এবং ঋতুপর্ণা তো সুন্দর অভিনয় করেইছেন, বিস্মিত করেছেন কাঞ্চন। অভিনয়ে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, রাজেশ শর্মা, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্রীলা মজুমদার, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবরঞ্জন নাগ—প্রত্যেকে চরিত্র হয়ে উঠেছেন। আর, মুগ্ধ করেছেন দিশা। এক প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাতনি, যার মধ্যে সততা আছে, দাদুর প্রতি শ্রদ্ধা আছে, বুকের মধ্যে আগুন আছে। নবীনা অভিনেত্রী দিশা ধারাবাহিকে পরিচিত মুখ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন দিশা। যাওয়ার আগে তাঁর অভিনয়ের সেরা দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এ। নতুন পথে হাঁটতে গিয়ে হরনাথ চক্রবর্তী এ ছবির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে যথার্থ কারণেই যে খুঁজে নিয়েছিলেন দিশাকে, ‘‌ধারাস্নান’‌ দেখে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। ‘‌ধারাস্নান’‌-‌এ দিশাও অতুলনীয়। দর্শকের মনে আপনি থেকে যাবেন দিশা। এবং সন্দেহ নেই, দর্শকরা বুঝতে পারবেন, ধারাস্নান-‌এ এক নতুন হরনাথ চক্রবর্তী পরিচালক হিসেবে তাঁদের সামনে হাজির। আশা করা যায়, দর্শকরা স্বাগত জানাবেন ধারাস্নান-‌কে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top