সম্রাট মুখোপাধ্যায়: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌কাল্ট’‌ হয়ে যাওয়া উপন্যাস ‘‌দেবদাস’‌ নিয়ে এটি কত নম্বর ছবি তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শুরুতেই স্পষ্ট বলে নেওয়া যায় এ’‌সিনেমা আর যাই হোক ‘‌দেবদাস’‌ নয়। এই চিত্রনাট্যের ওপর জোর ক‌রে ‘‌দেবদাস’‌–এর ছায়া বা প্যাকেজিং না চাপালেই ভাল হত।
বরং এ’‌সিনেমা অনেক বেশি ‘‌শেক্সপিয়রিয়ান’‌। ইংরেজ মহাকবির বহু নাটকের বহু চরিত্রের ছায়া এবং ‘‌সিকোয়েন্স’‌ এখানে বারবারই উঁকি দিয়ে গেছে। হ্যামলেট, জুলিয়াস সিজার, মার্ক অ্যান্টনি, ক্লিয়োপেট্রারাই বারবার ঢুকে পড়েছে উত্তর–ভারতীয় বাস্তবতায়। সাম্প্রতিকের ভেতর। সেখানে অহেতুক বঙ্গীয় রোমান্টিক দেবদাস মুখুজ্যে বেচারিকে নিয়ে টানাটানি করার মানে ছিল না। আর যাই হোক, কোনও রসায়নেই ‘‌দেবদাস’‌ আর ‘‌হ্যামলেট’‌ শেষ পর্যন্ত মিলমিশ খায় না। খেতে পারে না।
সুধীর মিশ্রের এই চিত্রনাট্যে নায়ক দেবকে (‌রাহুল ভাট)‌ সেই ‘‌পাওয়ার স্ট্রাকচার’‌–এর ভেতরের একজন মানুষ হিসেবেই সারাক্ষণ দেখানো হয়। এমনকী এই কাহিনীর দুই নায়িকা পারো (‌রিচা চাড্ডা)‌ বা চঁাদনিও (‌অদিতি রায় হায়দারি)‌ নিছক দুই প্রেমিকা বা দেবদাস–অন্ত–প্রাণ নয়। তারাও রাজনীতি আর ক্ষমতাচক্রের দুই সক্রিয় অংশ। এদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের পার্বতী বা চন্দ্রমুখীর যতটা না মিল, তার থেকেও বেশি মিল লেডি ম্যাকবেথ বা ক্লিয়োপেট্রার।
গল্পে দেবদাসের বাবা–কাকার অংশটা তো একেবারেই ‘‌হ্যামলেট’‌ থেকে সরাসরি নেওয়া। দেবের রাজনীতিবিদ বাবা (‌অনুরাগ কাশ্যপ, যিনি একদা ‘‌দেব ডি’‌ বানিয়েছিলেন মনে করে দেখুন)‌ নিহত হন হেলিকপ্টার বিস্ফোরণে। পার্টি ও প্রশাসনের দখল নেয় দেবার কাকা (‌সৌরভ শুক্লা এ’‌চরিত্রে শুধু মাথায় একটা ‘‌উইগ’‌ পরে নিজের ‘‌লুক’‌টাই আদ্যন্ত বদলাননি, বদলে ফেলেছেন নিজের অভিনয়ের যাবতীয় ‘‌ম্যানারিজম’‌ আর অনবদ্য অভিনয়ে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন চক্রান্তে আর স্নেহময়তায়)‌। যে কাকার সঙ্গে দেবের মা সুশীলা দেবীর প্রবল প্রণয় চলেছে এক সময়। কিন্তু ওই মৃত্যুর জন্য কি শুধুই দেবের কাকাই দায়ী?‌ নাকি আরও অনেকে?‌ যথা বিরোধী দলের কুচক্রী এক নেতা (‌বিপিন শর্মা)‌, বাহুবলী প্রভুনাথ (‌দীপরাজ রানা)‌ অথবা কর্পোরেট লবির এক চঁাই (‌দলীপ তাহিল)‌। এই রহস্যটাই আসলে চিত্রনাট্যের মূল ভরকেন্দ্র।
যেরকম অবসাদগ্রস্ত দেবদাস বা পাগলাটে হ্যামলেটকে আমরা বহুবার দেখে–পড়ে অভ্যস্ত, এ’‌ছবির দেব তার কোনওটাই নয়। প্রথম দিকে একটা এপিসোড আছে ঠিকই তার ‘‌ড্রাগ’‌–সেবন নিয়ে, তবে তা দ্রুতই ঠিক হয়ে যায়। দেবই তা ঠিক করে নিজের মনের জোরে। আর এ’‌কাজে তাকে সাহায্য করে 
চঁাদনি। দেবের চঁাদনি–নির্ভরতার সেই শুরু। চঁাদনি আসলে কর্পোরেট লবির ‘‌এসকর্ট গার্ল’‌। তবে ছবিতে তার মূল কাজ প্রভাব খাটিয়ে ‘‌সুপার–ওম্যান’‌–এর মতো দেবকে সব বিপদের হাত থেকে বঁাচানো। এই কাজটা ছবিতে এতবার করেছে চঁাদনি, তা ‘‌প্লট’–‌কেই দুর্বল করেছে।
রিচা চাড্ডার অতি–অভিনয় চরিত্রটিকে আরও বিপজ্জনকতায় নিয়ে গেছে। অদিতি রায় হায়দারি বরং অনেক শান্ত, যথাযথ, পরিণত অভিনয় করেছেন চঁাদনি চরিত্রে। রাহুল ভাটকে দেখে কখনই ‘‌প্যাশনেট’‌, বিভ্রান্ত, ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌– কোনওটাই মনে হয়নি।
আসলে আটের দশকের রাজনৈতিক ‘‌সিনেমা–মেকার’‌ সুধীর মিশ্র এখন পথ বদলেছেন। উত্তর ভারতের সেই নিচের তলার রাজনীতির নিষ্ঠুর গল্পকে নতুন ‘‌প্যাকেজিং’‌–এ আনতে চাইছেন। ‘‌দেবদাস’‌–এর ‘‌টপিং’–‌টা সেই চেষ্টারই অংশ। দরকার কী?‌ সেই আগের মেজাজেই ছবি বানান না, মিশ্রজি। চাইলে তা যে আপনি এখনও পারেন, তার ইঙ্গিত এ’‌ছবিতেও দু’‌–এক জায়গায় আছে যে। অসম্ভবের ছদ্মবেশ নাই বা থাকল।‌‌‌ ‌

জনপ্রিয়

Back To Top