সম্রাট মুখোপাধ্যায়:
●‌ চার দিকের গল্প। পরিচালনা:‌ প্রণবেশ চন্দ্র। অভিনয়ে:‌ সমদর্শী দত্ত, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
চারটি গল্প। একটি ‘‌জার্নি’‌। কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাত্রায়। ট্রেনে। এক চিত্র–‌পরিচালক আর এক সেলসম্যান— দুই সহযাত্রীর এক রাতের আলাপে উঠে আসা চারটি টুকরো–‌টুকরো গল্প। যা নিয়ে তরুণ পরিচালক প্রণবেশ চন্দ্রের প্রথম ছবি ‘‌চার দিকের গল্প’‌। প্রতিটিরই কথক দ্বিতীয়জন। যিনি এক সময় গল্প লিখতেন, তারপর গল্প চুরি হতে দেখে একের পর এক, লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। আর প্রতিটিরই শ্রোতা প্রথমজন। চিত্রপরিচালক সপ্তর্ষি রায় (‌সমদর্শী দত্ত)‌। যাঁর বানানো প্রায় প্রতিটি সিনেমাই হয় ক্যানবন্দী, না–‌হয় অসমাপ্ত হয়ে পড়ে থাকে। প্রযোজক–‌পরিবেশকদের অসহযোগিতায়।
চারটে বিচ্ছিন্ন গল্প। চার আলাদা থিম‌–‌এর। আবার এদের ভেতর কোথাও সাযুজ্য এবং যোগাযোগও আছে। আর সেটাই এ ‌ছবির অন্তর্লীন রাজনীতি। এ ‌ছবি বারবারই নানারকম শ্রমিকের গল্প বলে। কখনও তারা নারী। কখনও পুরুষ। কখনও হতদরিদ্র কোচোয়ান, আবার কখনও মৃৎশিল্পী। এমনকী নির্মমভাবে ‘‌শো–‌বিজনেস’‌–‌এর ওপরের রঙিন পরতগুলোকে খুঁটে তুলে প্রণবেশ দেখিয়ে দেন, এর ভেতরে থাকা ‘‌গ্ল্যামার–‌গার্ল’‌ বা ‘‌গ্ল্যামার–‌বয়’‌রাও আদতে ঘাম–‌রক্ত–‌দীর্ঘশ্বাস ঝরানো শ্রমিকই। সবারই প্রতিবাদ, ব্যর্থতা আর সমঝোতার গল্পগুলো একইরকম।
চার–‌চারটে গল্প। আর তার ভেতরে থাকা চরিত্রদের মূলত দুটো স্তর। এক, যারা খাটছে, যারা স্বপ্ন দেখছে। যারা কিছু গড়ছে।
আর, দুই, যারা পরের শ্রম আত্মসাৎ করছে। এদের টাকা আছে। ক্ষমতা আছে। অতএব ভোগ আছে। এরা কেউ মানুষ হিসেবে ভাল, কেউ মন্দ, কেউ মাঝামাঝি, কিন্তু এরা সকলেই অন্যের শ্রম, শরীর, উৎপাদনকে আত্মসাৎ করে, ভোগ করে। আর প্রথম পক্ষ চলে যায় ‘‌মার্জিন’‌–‌এর বাইরে। কখনও লড়াই, কখনও সমঝোতা নিয়ে। এমন আদ্যন্ত শ্রেণি–‌সচেতন বাংলা ছবির চিত্রনাট্য শেষ কবে পেয়েছি গালে হাত দিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
প্রথম গল্পের কেন্দ্রে এক মৃৎশিল্পী হরি। সে মাটির পুতুল গড়ে। মেলায় বিক্রি হয় না। সে এক কুমোরের কারখানায় কাজ নিয়ে অনবদ্য চোখ আঁকে প্রতিমার। মালিক–‌কুমোরের ঈর্ষা তাকে কর্মচ্যুত করে। উন্নয়নের হিড়িকে তার বসত‌ বাড়িটুকুও হাতছাড়া হয়। যে সকালে তাকে বাড়ি ছাড়তে হবে তার আগের গোটা বিষাদ–‌রজনী জুড়ে সে এক পাথরের কালীমূর্তি বানায়। তারপর ভোরে গ্রাম ছাড়ার আগে সে তা নামিয়ে রেখে আসে গ্রামের পুকুর পাড়ে। গ্রামের পুরোহিত (‌বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী)‌ আর তার ছেলের বউ রটিয়ে দেয় যে ওই দেবীমূর্তি তাদের স্বপ্নাদেশ ‌মতো গ্রামে এসেছে। ক্রমে এ ‌খবরে আসে পুরাতত্ত্ব দপ্তর, টিভি চ্যানেল, দূর গ্রামের ভক্তদল। মেলা ব‌সে। হরিও একসময় গ্রামে আসে, চিনতে পারে ওই মূর্তি। কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। এই মূর্তির পুজো ঘিরে যে বিশাল মেলা বসে, শেষ পর্যন্ত হরি সেই মেলাতেই নিজের অবিক্রীত পুতুলগুলো বেচতে বসে। নিজের তৈরি শিল্পকর্মের থেকে শিল্পীর যে বিচ্ছিন্নতা আধুনিক বাজারের দাপটে, সেই গল্পকে এভাবে বলেন প্রণবেশ।
দ্বিতীয় গল্পে আসে ‘‌সমঝোতা’‌ বৃত্তান্ত। অ্যাড ফিল্মের এক পরিচালক (‌অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়)‌, এক প্রযোজক (‌বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ আর দুই উঠতি মডেল প্রমোদ–‌সফরে বেরিয়ে এসে ওঠে এক সমুদ্র–‌সৈকতে অর্ধসমাপ্ত এক রিসর্টে। মিথ্যা সন্দেহে তারা চড় মারে এক দোকানদার কিশোরীকে। তার বাবা রাতে এসে সব কথা শুনে চড় মারে প্রযোজককে। কিন্তু পরের দিন দোকানের খাবার বেচার জন্য ওই বাবুদেরই লাগবে এই বোধে সমঝোতার কথা ভাবে। প্রতিবাদী বাবার উচ্চতাতেও প্রণবেশ ব্যবহার করেন সমুদ্রকে প্রেক্ষাপট হিসেবে। আবার গুটিয়ে যাওয়ারও সাক্ষী থাকে গর্জনময় সমুদ্র। এমন তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যকল্প মনে রাখার মতো।
তৃতীয় গল্পে সদাশয় মালিকও কেমনভাবে শোষণ করে কোচোয়ান খায়রুলকে (‌সুব্রত মাঝি)‌ তা দেখার মতো। আবার শেষ গল্প এতটা ভারী না হয়ে, বরং আসে খানিকটা হিউমারের ছোঁয়া নিয়ে। তবে ‘‌মধুরেণ সমাপয়েৎ’‌ নিয়ে নয়। বরং হাসির গায়ে লেগে থাকা চোখের জল নিয়ে। এই গল্পের চালবাজ অনীকদা (‌এই চরিত্রে চন্দ্রনীভ মুখার্জি এই ছবির আবিষ্কার)‌ সত্যিই এক স্মরণীয় চরিত্র হয়ে থাকবে। গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় জোর, এদের ভেতরে থাকা ‘‌আনপ্রেডিক্টেবেলিটি’‌। লুকোনো তাসের মতো ভাঁজগুলো। প্রণবেশ ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদক, ফলে নিখুঁত সম্পাদনায় ছবি দ্রুত এগিয়েছে। এতগুলো গল্প অথচ ছবি কোথাও স্লথ হয়নি। কখনও মাত্র ছ–‌সাতটি সিকোয়েন্সে গল্প আদ্যোপান্ত বলা হয়ে গেছে। কখনও ক্যামেরা স্থির থেকেছে পাঁচ–‌সাত মিনিট। আধুনিক বাংলা সিনেমার জন্য এমন সাহস আর উদ্ভাবনই তো জরুরি। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top