সম্রাট মুখোপাধ্যায়:  ●‌ ব্ল্যাকমেল। পরিচালনা:‌ অভিনব দেও। অভিনয়ে:‌ ইরফান খান,কীর্তি কুলহারি, অরুণোদয় সিং;‌ দিব্যা দত্ত, ওমি বৈদ্য, ঊর্মিলা মাতন্ডকার, প্রধুমন সিং, অনুজা শাঠে, গজরাজ রাও।
গল্পটা শুরু হয়েছিল বড় মামুলিভাবে। এক সন্ধেয়। একটা ছোটমোটো ‘‌অ্যাক্সিডেন্ট’‌ দিয়ে।
জাঁ পল সার্ত্রে তাঁর বিখ্যাত ‘‌দ্য ডার্টি হ্যান্ড’‌ নাটকে এক সংলাপে লিখেছিলেন, মানুষ তার জীবনে বহুক্ষেত্রেই না–‌জেনে ভুল দরজাগুলো খুলে ফেলে। আর সেই খোলা দরজা তাকে টেনে নিয়ে যায় এমন সঙ্কটের আবর্তে যে যা থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘‌ট্র‌্যাজেডি’‌গুলো লেখা হয়!‌
ছবির শুরুতেই তেমনই এক দরজা দুর্ঘটনাবশত‌ খুলে ফেলে দেব (‌‌ইরফান)‌‌। এক টয়লেট পেপার কোম্পানির সেলস এগজিকিউটিভ। যে বন্ধু আনন্দের পরামর্শ মতো একদিন একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল বউ রিনাকে (‌‌কীর্তি কুলহারি)‌‌ ‘‌সারপ্রাইজ’‌ দিতে। এক্ষেত্রে হাতে ফুল থাকা দস্তুর। অথচ সেদিন গোটা ফুলের মার্কেট বন্ধ। সুতরাং অভিযান–‌প্রিয় দেব সেই গোলাপের গুচ্ছ সংগ্রহ করল এক কবরখানায় কবরের ওপর রেখে যাওয়া ফুলের গোছা থেকে!‌ ছবি শুরুর মিনিট দশেকের মধ্যেই এমন ‘ব্ল্যাক হিউমার’‌ বুঝিয়ে দেয় ছবি কোনদিকে যাচ্ছে। বস্তুত‌ ছবিজুড়েই এমন অসংখ্য মন্তব্যময় ‘‌ক্লু’‌ ছড়ানো, যা এ ছবির চিত্রনাট্যকে সাহিত্যমূল্য দেয়।
দেব চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকে এবং আবিষ্কার করে তার স্ত্রী এবং অন্য এক পুরুষ (‌‌অরুণোদয় সিং)‌‌ তারই রাতের বিছানায়। দেবের দুটোই নেশা। এক, ভিডিও গেমস। দুই, অন্য নারীর ছবি দেখে আত্ম–সুখ। এই দুই কৃত্রিম উত্তেজনায় অভ্যস্ত দেবের পক্ষে বাস্তবে সামনা–‌সামনি ‘‌রি–‌অ্যাক্ট’‌ করা সম্ভব হয় না। সে কল্পনায় অনেক –‌ রকম লড়াইয়ের কথা ভাবে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে পরাজিতের মতো চুপিচুপি পালায় ঘর থেকে।
এরপর শুরু হয় তার অন্যপথে প্রতিশোধ নেওয়ার খেলা। যার সঙ্গে চরিত্রে, কাঠামোয় তার প্রিয় দুই অভ্যাসের মিল আছে। কল্পনায় যেমন সে পছন্দসই নারীকে ভোগ করে তাকে জানতে না দিয়ে, তেমন ভাবেই স্ত্রী প্রেমিক রঞ্জিতকে সে ‘‌ব্ল্যাকমেল’‌ করতে শুরু করে, নিজের পরিচয় জানান না দিয়েই। যেভাবে সে রঞ্জিত–‌এর নাড়ি–‌নক্ষত্র জোগাড় করে, তার পিছু ধাওয়া করে, তার ভেতর থেকে যায় তার ‘‌ভিডিও গেমস’‌ খেলার কৌশল আর নিষ্ঠা।
তবে শুধুই তো থ্রিলার বানাতে তো চাননি অভিনব। তাই আলাদা করে দেখার তাঁর ছোট ছোট দৃশ্য সাজানোগুলো। কখনও দেব আর আনন্দ নিজেদের ‘‌ব্ল্যাকমেলিং’‌ নিয়ে তর্ক আর লোহার পাইপ দিয়ে ‘‌সোর্ড ফাইটিং’‌ চালিয়ে যায় সিঁড়ির দুই স্তরে। কখনও আবার অস্ত্র ব্যবসায়িনী আর গোয়েন্দাকে পাওয়া যায় একই বিছানায়। কখনও রিনা আর রঞ্জিত তাদের গুপ্ত ষড়যন্ত্র চালায় ‘‌বি গ্রেড’‌ সিনেমার এক হলে। এই সব আলগা ‘‌চিরকুট’‌–‌এরা যেন বহুস্তরিক মন্তব্যের মতো জমতে থাকে মূল প্লট–‌এর গায়ে।
আসলে এ’‌ছবি যে একটা খোলাবাজার, আর একটা ক্ষমতাতন্ত্রের খাঁচার গল্প বলছে তা বোঝা যায় দেবের অফিসের গল্পটায় এসে। এও তো আরেক ‘‌ব্ল্যাকমেলিং’‌–‌এর গল্প। যে ‘‌ব্ল্যাকমেল’‌–‌এর মধ্যে দিয়ে বাঁচতে বাঁচতে আমরা বেঁচে আছি। আমাদের চারপাশে বাজার বেঁচে আছে। ক্ষমতাতন্ত্র, রাষ্ট্র, সিংহাসন— সব, সব বেঁচে আছে।
‘‌দিল্লি বেলি’‌–‌র পর এমন আর একখানা অনবদ্য ‘‌ব্ল্যাক কমেডি’‌ বানাতে অভিনব’‌র প্রায় সাত বছর লাগল। চাইব পরের ছবিটা যেন তিনি একটু দ্রুতই বানান।
আর গোটা ছবিজুড়েই অনবদ্য ইরফান খান। অভিব্যক্তিতে তো বটেই। এমনকী ক্ষেত্রেবিশেষে অনভিব্যক্তিতেও!‌ তিনি কেন অনন্য, প্রতিটি ছবিতেই স্পষ্ট করে দেন ইরফান খান। তিনি অসুস্থ এখন। তাঁর গুনগ্রাহী দর্শকরা চান, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন ইরফান। পর্দায় তাঁর আরও অনেক ম্যাজিক বাকি। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top