নিজের চেনা ঢংগুলো ছেড়ে এবার অনেকটাই বেরিয়ে এসেছেন অঞ্জন দত্ত। অনেকগুলো প্লটকে একসঙ্গে বাঁধার চেষ্টা। অভিনয়েও অন্য ধরনের চরিত্রে এবার অঞ্জন। 
 

সম্রাট মুখোপাধ্যায়
●‌ আমি আসব ফিরে। পরিচালনা:‌ অঞ্জন দত্ত। অভিনয়ে:‌ অঞ্জন দত্ত, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, অঞ্জনা বসু, কৌশিক সেন, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, সুপ্রভাত, সৌরসেনী মিত্র, দর্শনা বণিক, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, সুদেষ্ণা রায়। 
মিউজিক থেরাপি। অশান্ত পৃথিবীতে সুরের শান্তি। সঙ্গীতের নিরাময়। 
পৃথিবীটা যখন পাল্টানো যাচ্ছেই না, নিজের জন্য অন্তত এক আশ্রয়–‌ভূমি খোঁজা যাক। আর তারপর সেই জায়গাটার সন্ধান দেওয়া যাক আরও দু–‌চারজনকে। 
এটাই অঞ্জন দত্তের এবারের ছবি ‘‌আমি আসব ফিরে’‌–‌র মূল কথা, যে ছবিতে বহুদিন পরে অঞ্জন তাঁর মুদ্রাদোষের মতো ‘অ্যাংলোইশ’‌ জীবন, দার্জিলিং, বো ব্যারাক, বড়দিন, পার্ক স্ট্রিট, জ্যাজ মিউজিক ইত্যাদিকে কাটিয়ে একটা নতুন গল্পের আড়মোড়া ভেঙেছেন। 
এবং ওপরের মিউজিক সংক্রান্ত কথাটুকু ছাড়াও এই ‌ছবিতে তাঁর আরও একটা ‘‌স্টেটমেন্ট’‌ দেওয়ার আছে। তা হল কেউই জন্ম অপরাধী নয়। পরিবেশ তার মধ্যে অপরাধের প্রবৃত্তিগুলো গড়ে তোলে বা খুঁচিয়ে তোলে। আর সেই অপরাধও একজনের জীবনের ভগ্নাংশ। তা দিয়ে একটা গোটা জীবনের মূল্যায়ণ করা যায় না। যে জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অমিত সম্ভাবনার বীজ। 
এই যে জীবন, সঙ্গীত, অপরাধ, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, মমত্ববোধ, অসুখ—এসব নিয়ে যে জটিল, বহুস্তরিক ‘‌টেক্সট’‌টা এবার তৈরি করেছেন অঞ্জন, আধুনিক সভ্যতার অসুখ, উদাসীনতা ইত্যাদিকে দেখান আর তারপর হাত ধরে নিয়ে যান নিরাময়ের গুহায়। না সে নিরাময় সার্বিক নয়, বরং ব্যক্তিগত। 
এই ছবিতে এতটা গল্পকে আঁটিয়েছেন অঞ্জন, যা তিনি এর আগে কখনই করেননি। পাশাপাশি চারটি ‘‌ট্র‌্যাক’‌–‌এ কাহিনী এগিয়েছে। সমান্তরালভাবে। প্রতিটিই ‘‌সাবপ্লট’‌। প্রতিটিই স্বাধীন। আবার প্রতিটি একে অন্যকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রভাবিত করছে। আর সবকটা উপ–‌গল্পকে শেষ পর্যন্ত গাঁথছে কয়েকটা গান। 
ছবি শুরু হয় এক ধর্ষণ–‌কাণ্ডের উত্তর–‌প্রতিক্রিয়া দিয়ে। ধর্ষিতা মেয়েটি (‌দর্শনা বণিক)‌ প্রবল অবসাদে ভুগে চলেছে। এই অবসাদে সে আদালতেও যেতে চায় না। বাবা (‌সুমন্ত মুখোপাধ্যায়)‌ ও পিসির (‌সুদেষ্ণা রায়)‌ বারংবার বোঝানো সত্ত্বেও। এই ধর্ষণ–‌কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত যে ছেলেটি (‌গোটা ছবিতে যাকে কোনওভাবেই দেখা যায় না, অথচ তার উপস্থিতির চাপই এই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়)‌ তার বাবা আর মা আলাদা থাকে। ফলে তাদের দু’‌জনকে ঘিরে দু‌টো আলাদা গল্পের বৃত্ত আসে। মা মালা (‌অঞ্জনা বসু)‌ ‘‌লিভ টুগেদার’‌ করে প্রাক্তন স্বামীরই এক বন্ধু দীপকের (‌সুপ্রভাত)‌ সঙ্গে। দীপক আর মালার সম্পর্কে নানা আলো‌ছায়া আছে। মালার মায়ের রোগশয্যা আছে। মৃত্যু আছে। মালার দীপককে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা আছে। আবার দীপকের বটগাছের মতো সব আগলে দাঁড়ানোও আছে। সব থেকে ভাল লাগে সেই দৃশ্যটি, যেখানে মালার মায়ের মৃত্যুর পরে মালার সঙ্গে তার প্রাক্তন স্বামী রনোর দেখা করিয়ে দেয় দীপক। আর নিজে দুর্গাপুর যাওয়ার নাম করে শহরে অন্যত্র রাত কাটায়। 
রনোকে ঘিরে গল্পটা অবশ্য এতটা ঘরোয়া নয়। রনোর (‌অঞ্জন দত্ত)‌ মূল সমস্যা ছেলের কাণ্ডকারখানা নয়। সে ছেলের এই কাজ এবং শাস্তি পাওয়াকে কোনও ভাবেই সহানুভূতি বা সমর্থন দিয়ে দেখতে রাজি নয়। বরং সে চায় ছেলের শাস্তি হোক। অবশ্য আরেকটা জিনিসও সে চায়। সেটা সিনেমার গল্পের ‘‌সাসপেন্স’‌–‌এর স্বার্থে বলা যাচ্ছে না। এই অন্য ‌চাওয়াটায় তার সঙ্গী হয় তার ভাড়াটে অর্ক (‌অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়)‌ আর তাদের ব্যান্ডের দল। অঞ্জন নিজের পরিচালনায় এমন জটিল, বহুস্তরিক চরিত্র এই প্রথম করলেন। নিজের অভিনয়ের কিছু ‘‌ম্যানারিজম’‌–‌কে মাঝে মাঝে আস্তিনের তলা থেকে বার করেছেন ঠিকই, কিন্তু অনেকটাই ভেঙেছেন নিজেকে। চরমভাবে ব্যর্থ, জীবনের সর্বত্র প্রহৃত, নিঃসঙ্গ এক প্রৌঢ়ের এই চরিত্রায়ণ ভোলা যাবে না। 
চতুর্থ ‘‌সাবপ্লট’‌টি ধর্ষিত মেয়েটির মধ্যবয়স্কা উকিল গার্গীকে (‌স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়)‌ ঘিরে। গার্গীর সমস্যা তার মেয়েকে নিয়ে। সেই মেয়ে (‌সৌরসেনী মিত্র)‌ ভালবাসে যে বয়স্ক পুরুষকে (‌কৌশিক সেন)‌ তাকে একসময় ভালবাসত গার্গী। তবে এই ‘‌সাবপ্লট’‌টির ভেতরে মালার প্রেমিক দীপকের এক রাত্রে ঢুকে পড়াটা একটু সাজানো লেগেছে। ভাল লাগে গোটা ছবি জুড়ে থাকা নীল আলোর আস্তরণটা। মন খারাপের মতো। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top