‘কবীর‌’‌ ছবির ধ্রুবপদ এটাই। প্রযোজক হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন দেব। পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় দক্ষতার সঙ্গে থ্রিলারের মেজাজে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ছবি এবং স্পষ্ট করেছেন এ ছবির ধ্রুবপদকে।
 

রাজ্যশ্রী বসু
প্রযোজক হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন দেব। ‘চ্যাম্প‌’‌ আর ‘ককপিট‌’‌-‌এর পর ‘কবীর‌’‌। প্রথমেই এ-‌কথাটা উল্লেখ করতে হল, কারণ মূলধারার ছবির প্রযোজক হিসেবে এসে দেব কিন্তু তথাকথিত ফর্মুলাকে অগ্রাহ্য করে এগোচ্ছেন। তাঁর প্রযোজনার তৃতীয় ছবি ‘কবীর‌’‌ আর একবার সেটা প্রমাণ করল।
একদা ‘আজকাল‌’‌ পত্রিকায় দাঙ্গাবিরোধী লেখা যখন নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে, তখন আজকাল-‌এর সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত একটা স্লোগান তৈরি করেছিলেন, যা ছাপা হত নিয়মিত। সেখানে লেখা হত, ‘‌দাঙ্গা হিন্দুরা করেনা, দাঙ্গা মুসলমানরা করেনা, দাঙ্গা করে দাঙ্গাবাজরা’‌। ‘কবীর‌’‌-‌এর পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, আজকাল সম্পাদকের ওই বয়ানই এই ছবির ধ্রুবপদ। সত্যিই ‘‌কবীর’‌ যেন এই কথাই বলতে চেয়েছে।
বাংলা ছবির এই আঙ্গিক সাম্প্রতিককালে দুর্লভ। গোটা ছবিটাই শুট হয়েছে ‘রোড মুভিজ‌’‌-‌এর ঢংয়ে। তফাৎ একটাই, হাইওয়ের বদলে এখানে রেলওয়ে ট্র‌্যাক!‌ হ্যাঁ ছবির গল্পটাই কয়েক ঘণ্টার, একটা ট্রেন জার্নিতে ঘটে যাচ্ছে ঘটনা। মুম্বই থেকে একই কমপার্টমেন্টে সহযাত্রী ‘‌আবির চ্যাটার্জি’‌ (দেব‌) এবং ইয়াসমিন খাতুন (‌রুক্মিণী মৈত্র)‌‌। প্রথমে মনে হতেই পারে সুন্দরী সহযাত্রীর সঙ্গে নিছকই ‘ফ্লার্ট‌’‌ করছে ‘‌আবির’‌। ধীরে ধীরে চমকের পরত খুলতে থাকে। ‘‌নিছক ফ্লার্ট‌’ যে একটা টার্গেটকে মাথায় রেখে, সেটা বুঝে ফেলার পরই দর্শকাসনে স্তব্ধতা বেশ রোমহর্ষক!‌ 
‘‌আবির চ্যাটার্জি’‌র কেমোফ্লেজে ‘‌আলতাফ কবীর’‌ ওরফে দেব-‌এর শরীরী ভাষা বদলে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে ওঠে দাঙ্গা বিধ্বস্ত এক পরিবার, ‘ইয়াসমিন‌’‌-‌এর শৈশব। বদলে যেতে থাকে রুক্মিণীর ‘ইয়াসমিন‌’‌-‌এর আপাত সাধারণ জীবনযাপনের অভ্যস্ত ফ্রেম!‌ কী হয় এরপর?‌ জিহাদের শপথে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় করেছে কে বা সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করার শপথই বা নিয়েছে কে, ছবির ক্লাইম্যাক্সে যখন এর উত্তর মেলে, তখন দর্শকরা হাঁপ ছাড়েন। 
প্রযোজক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তুলতে, অভিনেতা হিসেবে নিজেকে ভাঙায় মন দিয়েছেন দেব। অত্যন্ত সিরিয়াস অভিনেত্রী রুক্মিণী। অর্থাৎ নিষ্ঠাবান। শুধুমাত্র ঝকঝকে চেহারাই যে তারকা হওয়ার শেষ কথা নয়, তার জন্য অভিনয়েও শান দিতে হয়, এই সারসত্য বুঝে গেছেন তিনি। প্রতিটা ছবিতে নিজেকে আরও একটু ভাল করতে করতে এগোচ্ছেন।
দুরন্ত এক্সপ্রেসে একটানা জার্নির মধ্যে ছবির শুট হয়েছে, বেশিরভাগ সময়ই ব্যবহার করা হয়েছে প্রাকৃতিক আলো। ছবির চরিত্রের সঙ্গে যা পরিপূরক হয়ে উঠেছে অনায়াসে। কৃতিত্ব অবশ্যই চিত্রগ্রাহকের। 
অন্যান্য চরিত্রে শতাফ ফিগার, অর্ণ মুখোপাধ্যায় এবং কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি স্বচ্ছন্দ এবং বিশ্বাসযোগ্য। ভাল লাগে বরুণ চন্দ এবং প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে। যদিও পদস্থ পুলিস অফিসারের ভূমিকায় প্রিয়াঙ্কা সরকারকে খানিক অস্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর নেপথ্যের সুর যথাযথ। রবিরঞ্জন মৈত্রর সম্পাদনায় গতি পেয়েছে ছবি। হিন্দি বা দক্ষিণী ছবির বাজেট বা প্রযুক্তিগত সহায়তার সঙ্গে টক্কর দেওয়া সম্ভব না হলেও, ভাবনায় ওভার বাউন্ডারি অবশ্যই হাঁকিয়েছেন পরিচালক। ‘বাই বাই ব্যাঙ্কক‌’‌, ‘‌গোড়ায় গণ্ডগোল’‌-‌এর সিগনেচার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন স্বাক্ষর রাখলেন অনিকেত চট্টোপাধ্যায়, এবং সৌভাগ্যবশত এই প্রচেষ্টায় পাশে পেলেন প্রযোজক দেবকে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top