অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়:  স্বার্থপরের মতো নিজের জন্যে একটা পার্ট লিখেছি। বছর খানেক আগে ‘‌বিসর্জন’‌ রিলিজের আগে বলেছিলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। সেই স্বার্থপরতা দেখলাম আরও বেড়েছে!‌ সেটা পরিচালক কৌশিকের, নাকি, তাঁর অভিনীত গণেশ মণ্ডলের, এই প্রশ্নের মীমাংসা খুব কঠিন।
আসলে, জীবন যে অমীমাংসিত, এটাই কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘‌বিজয়া’‌র প্রাণবস্তু। ‘‌বিসর্জন’‌-‌এ পদ্মার পাড়ে কাদামাখা অচৈতন্য নাসির আলিকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে এসেছিল এক মানবী, যার নামও পদ্মা। তারপর এক উথাল-‌পাতাল ঢেউ উঠল নিস্তরঙ্গ পদ্মার জীবনে। সাদা-‌থান-‌পরা পদ্মা শেষ পর্যন্ত গণেশ মণ্ডলের অধিকারে চলে গেল নাসিরের প্রাণ বাঁচানোর শর্তে। রঙীন শাড়ি হল তার। মাথায় সিঁদুর। এবং একটি পুত্র সন্তান হল পদ্মার, যার পিঠে জন্মদাগ। ওই জরুল দর্শকদের কাছে প্রতিষ্ঠা করেছিল, ওই সন্তান আসলে পদ্মা আর নাসিরের।
ইতিমধ্যে পদ্মা দিয়ে অনেক জল বয়ে যাওয়ার পর, গণেশ মণ্ডল হৃদযন্ত্রে গুরুতর সমস্যা নিয়ে ভর্তি হল কলকাতার হাসপাতালে। পদ্মা এবং গণেশ মণ্ডল এল বাংলাদেশ থেকে কলকাতায়। এবং দেখা হল নাসিরের সঙ্গে। দেখা যে হবেই, সে তো জানা কথাই। কিন্তু ওই হাসপাতালেরই ওষুধের দোকানে কাজ করছে নাসির এবং কলকাতায় আসতে-‌না আসতেই পদ্মার সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাবে, এটা যেন বড্ড তাড়াতাড়ি ঘটে গেল। বোঝা গেল, কাহিনীকার ও পরিচালক চাননি, নাসিরের সঙ্গে দেখা হওয়া নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করতে।

কারণ, দেখা হলে, তবেই তো জীবন তার অমীমাংসার খেলাটা দেখাবে।
‘‌বিসর্জন’‌-‌এর চেয়ে ‘‌বিজয়া’‌য় জীবন এবং সংসার আরও জটিলতার দিকে চলে গেল। খুব কঠিন খেলাটা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবে সামলেছেন কৌশিক। শুধু বুদ্ধিদীপ্তই নয়, হৃদয়দীপ্তও।
হৃদয়পুরে জটিলতার খেলাকে সামলানো বেশ কঠিন, যখন ত্রিভুজের তিনটি বাহু-‌ই খুব কাছাকাছি এবং সংলগ্ন। একটা বাহু যদি দূরে চলে যায়, তাহলে ত্রিভুজ তো আর ত্রিভুজ থাকে না!‌
‘‌বিসর্জন’‌ সেরা বাংলা ছবির জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। মুগ্ধ হয়েছিলেন বহু দর্শক। ফলে, যখন এই ছবির সিক্যুয়েল ‘‌বিজয়া’‌ মুক্তি পেল, তখন দর্শক-‌প্রত্যাশা বেশি থাকাই স্বাভাবিক। মনে মনে সকলেই একটা গল্পের ভাবনা নিয়ে ছবিটা দেখতে আসবেন, এটাও জানা কথা। এবং, এই কথাটা সবচেয়ে ভাল জানেন পরিচালক স্বয়ং। ফলে, শুধু গল্প বলার জন্যেই গল্প নয়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এখানে সম্পর্কের বিচিত্র ও গভীর মাত্রাকে স্পর্শ করেছেন নিজস্ব ভাবনায়।
সেই ভাবনায় প্রেম, সম্পর্ক, দাম্পত্য, বিরহ, বিচ্ছেদকে উলটেপালটে দেখতে চেয়েছেন তিনি। দেখতে চেয়েছেন ভালবাসার গভীরতাকে। ভালবাসায় হেরে যাওয়ার যন্ত্রণাকে। ভালবাসলে কি কেউ হেরে যায়?‌ এমন প্রশ্নও জেগে ওঠে।
কলকাতায় যে বাড়িতে ভাড়া থাকে নাসির, সেখানে পদ্মাকে এবং গণেশ মণ্ডলকে নিয়ে আসা, বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দাদের কৌতুহল, বাড়িওয়ালার হুমকি ইত্যাদি নানা কিছুই ছিল। এবং ছিল দুই ধর্মের সম্প্রীতির বার্তাও।

কিন্তু সব ছাপিয়ে ছিল ভালবাসার গ্রহণ ও বর্জনের খেলা। গণেশ মণ্ডল যখন জেনে যাবে পদ্মা এবং নাসিরের মধ্যে গভীর ভালবাসার কথা, তখন স্বামী হিসেবে কী ভূমিকা নেবে সে?‌ মেনে নেবে?‌ হেরে যাবে?‌ পালিয়ে যাবে?‌ অথবা আর একবার সমূলে উপড়ে ফেলবে পদ্মা আর নাসিরের মধ্যে গড়ে ওঠা সাঁকো?‌
অনেক প্রশ্ন এবং চমক দর্শকদের জন্যে মজুত রেখেছেন পরিচালক। এবং অভিনয়ে, সন্দেহ নেই, আবার বাজিমাত করলেন গণেশ মণ্ডল তথা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। অ-‌সাধারণ শব্দটা যদি ক্লিশে হয়ে গিয়ে না থাকে, তাহলে বলতেই হচ্ছে অসাধারণ। জয়া আহসানের ‘‌পদ্মা’ খুবই মায়াময়। চরিত্রের গোপন যন্ত্রণাকে স্পষ্ট করেছেন জয়া। মুগ্ধ করেছেন আবির, নাসিরের চরিত্রে। এই চরিত্রের আবেগ ও ক্রোধকে যথাযথ ধরেছেন আবির। লিয়াকত চাচার ভূমিকায় অরুণ গুহঠাকুরতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ভাল লাগে শ্যামল দত্ত, অরিন্দোল বাগচি, তরঙ্গ সরকার এবং জয়দীপ মুখোপাধ্যায়কে। ‘‌লাউ’‌ লামা তো দারুণ। ছোট্ট হর্ষিলকেও‌ ভাল লাগে।
এখানেও কালিকাপ্রসাদের সঙ্গীত বাড়তি প্রাপ্তি। সঙ্গে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত তো আছেনই।
প্রেম, বিবাহ, বিরহ, সম্পর্ক নিয়ে বেশ গভীর খেলায় দর্শকদের নিয়ে গেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। পদ্মা আর নাসির তো সুগভীর প্রেমের বন্ধনে নাজেহাল। তবে আরও ‘‌গভীরতা’‌ গণেশ মণ্ডলের। তার কাছে তো পদ্মা আর নাসির শিশু।
শোনা যাচ্ছে, ‘‌বিজয়া’‌তেই শেষ নয় ‘‌বিসর্জন’‌-‌এর গল্প। বিজয়ার পরে কি ‘‌আবাহন’‌? আমরা অপেক্ষা করছি, গণেশ মণ্ডল।‌

জনপ্রিয়

Back To Top