সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ব্যোমকেশের বিরুদ্ধে বদলা। স্বয়ং সত্যান্বেষির ঘরে ছিদ্রান্বেষণ। গোপন কেচ্ছার হাঁড় ভাঙা।
এটাই ‘‌বিদায় ব্যোমকেশ’‌ নামক ‘‌স্পুফ’‌টির মূল এবং মোদ্দা দৃষ্টিভঙ্গী। যে ব্যোমকেশ রহস্য–‌সন্ধানে ব্রতী হয়ে বহু ঘরেই পৌঁছে গেছে যৌন–‌কেচ্ছায়। অবৈধ সম্পর্কে। তেমনই একটা ঘটনা যদি ঘটে যায় ব্যোমকেশের ঘরে, আর তার তদন্তে নেমে সেই বিপজ্জনক সম্পর্কের উৎসে পৌঁছে যেতে হয় তাঁকে, তবে কেমন লাগবে তাঁর!‌ কী হবে প্রতিক্রিয়া?‌ এটাই পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের চিত্রনাট্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু। খানিকটা যেন কাঁচের ঘরে এতদিন যে ঢিল ছুঁড়ছিল, এবার তাঁর কাঁচের ঘরে ঢিল এসে পড়া। হ্যাঁ, ব্যাপারটা একেবারে সরাসরি দৃশ্যগত ইঙ্গিতও আছে ছবিতে একটি মুহূর্তে। চার্লি চ্যাপলিনের ‘‌দ্য কিড’‌–‌এর একটি বিখ্যাত দৃশ্যের ক্লিপিংস ব্যবহার করে।
ব্যোমকেশ বক্সি এই ছবির চিত্রনাট্য অনুযায়ি বৃদ্ধ (‌‌বলা ভালো, অতি–‌বৃদ্ধ)‌‌ হয়েছেন। সত্যবতী ও অজিত দু’‌জনেই প্রয়াত। ছেলে অভিমন্যু (‌‌জয় সেনগুপ্ত)‌‌, ছেলের বউ অনসূয়া (‌‌বিদীপ্ত চক্রবর্তী)‌‌ আর নাতি সাত্যকিকে (‌‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌‌ নিয়ে তাঁর বর্তমান সংসার। পরিবারকে আর একটু ‘‌এক্সটেন্ড’‌ করলে এর সঙ্গে জুড়ে যাবে নাতির প্রেমিকা তুন্নাও (‌সোহিনী সরকার)‌‌। মজার কথা হল এই ছবিতে দাদু–‌নাতি দুই অবতাবেই চরিত্রাভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়।‌ আবার তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই এই দুই অবতারেই নায়িকা সোহিনী সরকার। মানে একই সঙ্গে সত্যবতী ও তুন্না। মেধাবিনী এবং আধুনিকা। সত্যবতীই তুন্না হয়ে পুনর্জন্ম নিয়েছেন কিনা, না, তেমন কোনও কথা অবশ্য পরিচালক ছবিতে বলেননি।
ব্যোমকেশ যেহেতু বিদায়–‌পর্বে (‌‌যদিও কেন যে ‘‌বিদায়’‌, কে জানে, চিন্তা–‌ভাবনা–‌তদন্তে–‌সক্রিয়তায় এখনও ব্যোমকেশ সবাইকে পেছনে ফেলে দিয়েছে!‌)‌‌ তাই ওই ছবিতে রহস্য–‌সন্ধানি থুড়ি ‘‌সত্যান্বেষি’‌ হল সাত্যকি বক্সি। তার অবশ্য কোনও অজিত নেই। পথে–‌ঘাটে–‌চিন্তায় –‌আলোচনায় তুন্নাই তার ‘‌অজিত’‌। বলা বাহুল্য ‘‌সত্যবতী’‌ ও । সাধন–‌সঙ্গিনী।
আর ব্যোমকেশ ও সাত্যকি –‌ এই দুই প্রজন্মের মধ্যে অভিমন্যুর অবস্থান খানিকটা বলিপ্রদত্তের। জোড়া খুনের অভিযোগে সে পুলিসের লক–‌আপে। প্রসঙ্গত:‌ অভিমন্যু নিজেও পুলিসের ডি সি। খুন করে নিজেই সে আত্মসমর্পণ করেছে। ওই ছবির শুরু সেই চমক দিয়েই। এমন খুনের ‘‌মোটিভ’‌ কী?‌ খুন হওয়া লোকটির লাশ কোথায় গেল?‌ একজন পুলিস অফিসার, যে আদ্যন্ত সৎ বলে পরিচিত, এমন পথ কেনই বা নিল?‌ এর সঙ্গে কি ব্যোমকেশ বক্সির পরিবারের কোন যোগ আছে?‌ এমন সব প্রশ্ন ছবির প্রথম আধ ঘন্টা সত্যিই দর্শকদের উত্তেজিত রাখে কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে রহস্যের ক্রমাগত গুলিসুতো ছেড়ে চলা ব্যাপারটাকে ক্লান্তিকর করে তোলে। দু’‌টো সমান্তরাল ট্র‌্যাকে গল্প চলতে থাকে। একটি অংশে সাত্যকি নিজের মতো করে খোঁজ খবর চালায়। অন্য অংশটিতে ব্যোমকেশ বাড়িতে বসে–‌শুয়ে ভেবে চলে। আর অজিত ও সত্যবর্তী (‌‌হ্যাঁ, তারাও ছবিতে আছে, কল্পনায়, এবং তারা না থাকলে বক্স অফিসও অটুট থাকবে না সম্ভবত:‌ এই বোধে)‌‌ কথা বলে চলে ব্যোমকেশের সঙ্গে। তাতে যে প্লট খুব এগোয়, এমনটা নয়, কারণ ওই সব কথার প্রায় সবটা জুড়েই আছে হয় অজিতের পুরোনো কথা তুলে দীর্ঘশ্বাস, অথবা ‘‌তুমি–‌বুড়ো–‌হয়ে–‌গেছ’‌ বা ‘‌খোকাকে–‌কেন–‌ছাড়িয়ে আনছ–‌না’‌ গোছের অভিযোগ। সত্যবতীর। মাঝে একবার খালি অজিত ‘‌আদিম রিপু’‌ বইটির কথা মনে করিয়ে দেয়। বোঝা যায় এই অজিত আসলে ব্যোমকেশের অবচেতন। কিন্তু ওই বইয়ের যে গুরুত্ব প্লটে, তাতে করে সিনিয়ার বক্সির তো ওই বইয়ের কথা ভোলা উচিত নয়!‌ ওই রকম অনেক অযৌক্তিক ঘটনা ঘটে চলে ছবিতে। শরদিন্দু–‌কাহিনীর আঁট–‌সাঁট ভাবের কথা সেখানে ভাবাই বাতুলতা।
আসলে, বড় বিপজ্জনক উপাদান নিয়ে খেলতে গেছেন দেবালয়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রহস্য–‌কাহিনী সিরিজের ‘‌স্পুফ’‌ বানানো সত্যিই সহজ নয়। প্রতিভা এই চিত্রনাট্যের নেই। ফলে ছবি পদে–‌পদে–‌পদে হাস্যকর হয়ে পড়েছে। হয়ে পড়েছে যেন মূল ব্যোমকেশের প্রতি ভ্যাংচানি!‌ সবচেয়ে বড় কথা রহস্যটাও যে জমাট নয়। শুধু সেলিব্রিটি–‌কেচ্ছা দিয়ে কি সব দুর্বলতা ঢাকা যায়?‌এ
আবির বৃদ্ধ ব্যোমকেশের মেক আপে আপ্রাণ ব্যোমকেশত্ব বজায় রেখে অভিনয়ের চেষ্টা করেছেন। আবার সাত্যকি চরিত্রে যেন ব্যোমকেশের কোন ছাপ না থাকে, সচেতন থেকেছেন সে ব্যাপারেও। দু’‌টো ক্ষেত্রেই তিনি সফল। অভিনয় করেছেন। অনুসূয়া চরিত্রের শুধু পুলিস কমিশনারের চরিত্রে গায়ক রূপঙ্কর চমৎকার চরিত্রানুশ অভিনয় করেছেন। অনুসূয়া চরিত্রের শুরু ও শেষ আছে। মাঝেখানটা নেই। তবু বিদীপ্তা চক্রবর্তী চরিত্রটায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top