সম্রাট মুখোপাধ্যায়: শিল্পের কোনও স্বদেশ হয় না। সবরকম রাষ্ট্রের বেড়া ভেঙে সে তার আবাস খুঁজে নেয় মানবিকতায়। আরেকবার এই কথাটা প্রমাণ করলেন মাজিদ মাজিদি। তাঁর ‘‌বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’‌ ছবিতে।
ইরানের ‘‌নিউ ওয়েভ’‌ পরিচালকদের মধ্যে মজিদ মাজিদি একটি নাম। ‘‌চিলড্রেন অফ হেভেনস’‌, ‘‌কালার্স অফ প্যারাডাইস’‌, ‘‌ফাদার’‌— মাজিদির উল্লেখযোগ্য ছবি।
পর্দায় গল্প বলার জন্য মাজিদি বেছে নেন মূলত একটি পারিবারিক গল্প। অনেকটা আবেগ, অনেকটা দুঃখ, অনেকটা লড়াই পোরা একটা গল্প। আর যে গল্পে ছড়িয়ে– ছিটিয়ে থাকে শিশুরা। সমাজের সব থেকে অরক্ষিত, দুর্বল অংশ। ঘটে চলা নানাবিধ শোষণের প্রকৃতি বোঝাতে এই সব শিশুর ওপর নানাবিধ অত্যাচার, তাদের কষ্ট ফিরে ফিরে আসে তাঁর ছবিতে। এবারও এসেছে।
এবারও মাজিদির ছবি চেনা মেজাজে ‘‌নরকের ফুল’। শুধু লোকেশনটা ইরানের কোনও গ্রাম বা মফস্বল না হয়ে, ভারতের মুম্বই। তা দেখার চোখ আর দেখানোর মতো কব্জির মোচড় আছে বটে মাজিদির। তাই এত বার দেখা মুম্বইকে পর্দায় বেশ খানিকটা অন্যরকম লেগেছে এ ছবিতে। তার কারণ মুম্বইয়ের মহানাগরিক কেন্দ্রগুলোকে এড়িয়ে মাজিদি চলে গেছেন অন্য কতকগুলো উপেক্ষিত এলাকায়। লঞ্চঘাটা, ধোবিঘাট, ছোট হাসপাতাল, জেলখানা, বেশ্যাখানার গলি— এ সব জায়গায়। আর ছবি শুরুর শট!‌ প্রথমে পর্দার সিংহভাগজুড়ে বিশাল আকাশছোঁয়া প্রায় ‘‌হোর্ডিং’। যেখানে একটি মোবাইল কোম্পানির ব্যবসায় বিপ্লব আনার কথা। এরপরই ক্যামেরা ‘‌টিল্ট ডাউন’‌ করে পাশের সাবওয়ের তলায়। যেখানে সুড়ঙ্গে অনেক পথজীবী মানুষ। তাদের রাস্তায় পাতা সংসার। আর এরপরের শটে সেখান থেকে ধুলো–‌ধোঁয়া কাটিয়ে বেরিয়ে আসা দুটো বস্তিবাসী ছেলে, বাইকে চেপে হু হু উড়ানে যারা এগিয়ে চলে, লম্বা টানা হাইওয়ে ধরে। তারা যাচ্ছে ড্রাগ পাচার করতে।
আর ছবির শেষ হয় আরও দুটো সুড়ঙ্গ, গর্তের গল্প দিয়ে। সে দুটো এক জেলখানায়। বন্দিনী তারা জেলের ভেতর আগলে রাখে আরেক মৃত বন্দিনীর ছেলে ছোটুকে। জেলখানার ভয়ঙ্করতা বোঝাতে এখানে লাঠি আসে না, কোনও অমানবিক আচরণ বা অত্যাচারও আসে না। আসে শুধু অসুখ, আকাশহীন, বন্ধ কতকগুলো কুঠুরি। যার ভেতরে সঙ্গহীন ওই শিশু খেলার সাথী করে নেয় একটা ইঁদুরকে। গর্ত থেকে বেরিয়ে  আসা সেই ইঁদুরটা তারপর একদিন আর আসে না। সেদিন গর্তের মুখে দিনজুড়ে বসে থাকা ছোটুকে দেখে বোঝা যায়, এমনকী একটা ইঁদুরও কতটা প্রয়োজনীয় হতে পারে একটা মানুষের জীবনে। ছোটুর শোক ভোলাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখাতে নিয়ে যায় তারা। এক রক্ষীকে নিজের যথা সর্বস্ব দিয়ে জেলখানার একটা জানলা খোলায় তারা। শুধু চাঁদটুকুকে দেখতে। শুধু দুটো হাত গরাদের বাইরে বেরিয়ে একটু বৃষ্টি যাতে স্পর্শ করতে পারে। ওই হারিয়ে যাওয়া ইঁদুর, এই দুই অসমবয়স্ক বন্দি, ওই দূরের চাঁদ, কান্না, বৃষ্টি সব মিলিয়ে এক মায়াচ্ছন্ন ‘‌দাস্তান’‌ তৈরি করেন মাজিদি। ছবির ওই শুরুটুকু আর এই শেষটুকু বললেই হয়তো বোঝা যায় একই সঙ্গে কতটা মানবিক আর বিশুদ্ধ সিনেমা তৈরির পথে হেঁটেছেন মাজিদি। প্রথম দিকে এ ছবি দেখে মনে হবে হয়তো সেই মুম্বই,সেই দারিদ্র‌্য, সেই ‘‌স্লামডগ মিলিওনেয়ার’‌–‌এর পথে হাঁটতে চলেছেন মাজিদি। একটু এগোতেই বোঝা যাবে, না, একেবারেই তা নয়। এরপর মনে হবে এ ছবি হয় আটের দশকের ভারতীয় অন্য ধারার সিনেমাকে অনুসরণ করছে। তারপর ছবি আরও একটু এগোলে বোঝা যাবে তাও ঠিক নয়। একদম অন্য, অচেনা একটা পথে হেঁটেছেন মাজিদি। সে হাঁটায় কোনও ফর্মুলা নেই, চেনা ছাঁচ নেই, এমনকী চেনা মাজিদিও নেই। বরং নতুন একটা পথ খুঁড়েছেন তিনি। যে চিত্রনাট্যের ওপর–‌ওপর একটা চেনা গল্পের ছাঁচ আছে। কিন্তু খানিক দূর এগোতেই সেই গল্পের থেকে যেসব ব্যঞ্জনারা বেরিয়ে আসছে, তারা বহুমাত্রিক। অচেনা। এই ছবি তাই একজন দর্শক যখন দেখবেন, তক্ষুনি তিনি একেবারে হইহই করে মজে যাবেন এমনটা ঘটবে না। কিন্তু এই ছবি একবার দেখলে সহজে মুক্তি পাওয়া যাবে না। মাথার ভেতর গেঁথে থাকবে অনেকদিন। তারপর মাঝে মাঝেই না–‌নিভন্ত স্মৃতির মতোই তোলপাড় করে যাবে হৃদয়কে।
ঈশান ড্রাগ চালান করতে গিয়ে পুলিসের তাড়া খেয়ে হাজির হয় ধোবিঘাট–‌এ। যেখানে দিদি তারা (‌মালবিকা মোহানন)‌ কাজ করে। তারা আর তার মালিক অক্ষি (‌গৌতম ঘোষ) সে যাত্রা বাঁচায় তাকে। কিন্তু পরে অক্ষি তারাকে ধর্ষণ করতে গেলে তারা পাথর দিয়ে তাকে এমন মারে যে অক্ষি প্রায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তারাকে পুলিস জেল কাস্টডিতে‌ রাখে। অক্ষিকে ঘৃণা করলেও, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয় আমির। ওষুধ কিনে দেয়, হাসপাতালে বসে থেকে শুশ্রূষা করে, যাতে তারার ফাঁসি না হয়। আর এরই সঙ্গে তারার ফাঁকা ঘরে নিজে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় করে দেয় গ্রাম থেকে আসা অক্ষির বুড়ি মা (‌শারদা)‌ আর দুই কন্যাকে। গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত পরিবার। আর এই পরিবারকে ঘিরে বড় মমতায় একটা কথা বলেন মাজিদি, মানুষ অন্যের কাছে শুধু আশ্রয় চায় না। সে নিজেও এক আশ্রয় হয়ে উঠতে চায়। সেই চাহিদাতেই অক্ষির পরিবার–‌এর আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে আমির। সেই চাহিদাতেই ওই ইঁদুরটিকে খোঁজে ছোটু। আর ছবিজুড়ে নানা দৃশ্যে ছাড়াবাজির খেলা আসতে থাকে মোটিফের মতো।
ঈশান খাট্টারের অভিনয় সাড়ে বড় বাস্তব, রুক্ষ এবং মায়াময়। মালবিকাও ভাল। গৌতম ঘোষ অব্যর্থ। অল্প অবকাশেই তন্নিষ্ঠা মনে থেকে যাবেন। তবে দক্ষিণী অভিনেত্রীর শারদার সারা ছবিজুড়ে মালয়ালম সংলাপ বলে যাওয়া, সাব টাইটেল বিহীন ভাবে, অথচ শুধু অভিব্যক্তিতে হৃদয় গলিয়ে দেওয়া, বহুদিন মনে থাকবে।
কতরকম নতুন সুড়ঙ্গ যে খুঁড়েছেন মাজিদি, এ ছবি জুড়ে!‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top