(উত্তর কলকাতার চেনা জীবন। মতি নন্দীর কলমের নিজস্বতায়। তার ভেতরেই পাপ–‌পুণ্য, প্রেম–‌অপ্রেম, হত্যা–‌নিরাময়ের এক অদ্ভুত আখ্যান। পর্দায় তার বিশ্বস্ত অনুবাদ।)
সম্রাট মুখোপাধ্যায়:
●‌ বারান্দা। পরিচালনা:‌ রেশমি মিত্র। অভিনয়ে:‌ ব্রাত্য বসু, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শ্রীলা মজুমদার, সাহেব ভট্টাচার্য, মানালি দে, সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
সামাজিক বা রাষ্ট্রনৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে শিল্প–‌সাহিত্যের একটা মূলগত বিরোধ আছে। সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে যা অনৈতিক, অপরাধ, এবং যা করার জন্য একজন ব্যক্তি দণ্ডনীয়, তা চিহ্নিত করা এবং দণ্ড দেওয়াতেই পৃথিবীর তাবৎ প্রাতিষ্ঠানিক সংবিধান সীমাবদ্ধ।
কিন্তু এ সব ক্ষেত্রে যেখানে সমাজ বা রাষ্ট্র তার দায়িত্ব শেষ করে, ঠিক সেখান থেকেই শিল্প বা সাহিত্য তার আতশকাচ কিংবা মনশ্চক্ষুটি নিয়ে অনুপ্রবেশ করে কীটদষ্ট জীবনের এলাকায়। খুঁজে বের করার চেষ্টা করে বিচারসভায় অনুপস্থিত মনস্তত্ত্ব, নিয়তি বা সামাজিক অবদমন নামক ‘‌পাপ’‌ বা ‘‌দুর্ঘটনা’‌–র উৎসগুলোকে। দুষ্ট–‌ঘটনাকে সমর্থন নয়, বরং তৈরি করে নষ্ট–‌আত্মার জন্য এক শুশ্রূষা–‌ভূমি। মানবিকতার সংবিধান মেনে।
বাংলা গল্প–‌উপন্যাসে ছেলে ভুলোনো বানানো রূপকথা না লিখে যে ক’‌জন সাহিত্যিক জীবনের এই সব দংশনের উৎসে যেতে চেয়েছেন, নষ্ট ‘শসা’‌, ‘‌চালকুমড়ো’–‌র ছাঁচে ধরা জীবন–‌এর মাঝে মানুষ কিংবা মানুষির প্রকৃত মুখ দেখতে চেয়েছেন, মতি নন্দী তাঁদের অন্যতম, প্রধানতম কয়েক জনের মধ্যে অন্যতম। ‘‌বারান্দা’‌–ও তাঁর তেমনই এক উপন্যাস। যেখানে উত্তর কলকাতার দমচাপা গলি, হাঁফ ধরানো বদ্ধতা, এক ঘেয়ে নিঃসঙ্গতা আর ঘাম, বেকার মানুষের দল আর এ সবের ভেতরেই চোরা ঘূর্ণির মতো অবৈধ কাম, লোভ, চুরি, হত্যা। এদের আসার কোনও নির্দিষ্ট ক্রম নেই, যুক্তি নেই, প্রস্তুতিও নেই। নাটকীয়ভাবে হঠাৎ জীবনের মোড়ে প্রসাধনহীন জীবনের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া।‌
সন্দেহ নেই, এমন লেখা চিত্রনাট্যের পক্ষে আদর্শ। মতি নন্দীর গদ্যে উত্তর কলকাতা যেভাবে তাবৎ রূপ–‌রস–‌গন্ধ নিয়ে ভাষায় আটকে থাকে, তাকে শুধু পর্দায় ‘‌ভিস্যুয়াল’‌–‌এ অনুবাদ করে নেওয়া। এটা সহজ কাজ। পরিচালক রেশমি মিত্র বিশ্বস্তভাবে তা করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষত ফ্ল্যাশব্যাক অংশে ‘‌অ্যাম্বার সিপিয়া’–‌র ছোঁয়া অদ্ভুত এক বিষণ্ণ ধূসরতা এনে দিয়েছে শহরের বুকে। মূল চরিত্র গিরিজাপতির (‌ব্রাত্য বসু)‌ যৌবন, সেখানে নিজের হবু শাশুড়ির (‌শ্রীলা মজুমদার)‌ সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, আবার প্রায় নাবালিকা রুনুর প্রতি তার দোলাচল, বন্ধু মোহনের লোভের চটচটে ফাঁদের ভেতর সে ধীরে ধীরে সম্মোহিত শিকারের মতো জড়িয়ে যাচ্ছে বুঝেও, তার ভেতরেই আটকে পড়া— এই গোটা প্রক্রিয়াটার জন্য ‘‌ফ্ল্যাশব্যাক’–এ‌ এমন রং, এমন লোকেশন, এমন সব মানুষের ভাঙাচোরা মুখ প্রায় অব্যর্থ ছিল। রেশমি এবং তাঁর ইউনিট পেরেছেন।
কিন্তু এ’‌ছবির একটা কঠিন দিকও আছে। এ’‌উপন্যাসকে পর্দায় অনুবাদের একটা সমস্যাও আছে। এ’‌লেখা বিশুদ্ধ সাহিত্য, যার অনেকটাই চরিত্রদের মনস্তত্ত্বের রক্তমাংসে গড়া। আর তাকে পর্দায় অনুবাদ করা কিন্তু মোটেই সহজ কাজ নয়। রেশমির ছবির চিত্রনাট্য সবসময় সেই কঠিন কাজটুকুতে সাফল্য পায়নি। ফলে ঘটনাক্রমে কোথাও কোথাও এক–‌একটা উল্লম্ফন এসে গেছে। কোনও কোনও চরিত্রের ভাবনা, কাজকর্ম আরও একটু পরিসর দাবি করছে তাদের মনের গতি‌প্রকৃতি বোঝাতে, সেই অভাবটা বোঝা গেছে, প্রয়োজন ছিল আরও কিছু নীরব অথচ ‘‌সিনেম্যাটিক্যালি’‌ বাঙ্ময় মুহূর্তের। সেগুলো পাওয়া যায়নি।
যদিও এ সব অভাবের অনেকটাই ঢেকে দিয়েছেন ব্রাত্য বসু। তাঁর গিরিজাপতি চরিত্র রূপায়ণে। ছোট ছোট দৃষ্টিপাতে, ‘‌ক্লোজ টাইট ফ্রেম’‌–‌এও হাতের নিপুণ ব্যবহারে, সংলাপ বলার দোলাচলে, মুখের নিচের অংশের ভেঙে পড়া, ঝুলে পড়া অভিব্যক্তিতে ব্রাত্য একেবারে যেন আসল গিরিজাপতি। এ’‌ছবিতে এ’‌চরিত্রের তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তরে প্রৌঢ়, পঙ্গু, নিঃসঙ্গ গিরিজাপতি। যে বাড়ির বারান্দায় বসে থাকে এক ভগ্নস্তূপের মতো। একটু ছোট সাইজের ‘‌ক্রাচ’‌ ব্যবহার করার পরিকল্পনাটা দারুণ। দ্বিতীয় স্তরে অতীতে যুবক গিরিজাপতি, আপাত–‌লাজুক, অথচ চোরা–‌উদ্দামতায় সে ভাঙচুর করে ফেলে সামাজিক গণ্ডি, বাঁধন, নিয়ম। আর তৃতীয় স্তরে তার জীবনে আসে মোহনের (‌সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ আরেক নাবালিকা প্রতিম সঙ্গিনী বুলি (‌মানালি দে)‌, আর যার ছোঁয়ায় তার ভেতরে জেগে ওঠে আবার পুরনো উদ্দাম–‌বৃত্তিগুলো, পরিণতিতে এক ট্র‌্যাজেডির গহ্বরে প্রবেশ করে সে। যে ট্র‌্যাজেডি প্রায় গ্রিক–‌ট্র‌্যাজেডির সমান। এই চরিত্র, গিরিজাপতি, যেন আদ্যন্ত ‘‌ডস্টয়েভস্কিয়ান’‌ এক চরিত্র, যে ‘‌অভিশপ্ত’‌, ‘‌পাপগ্রস্ত’‌, ‘‌অবমানিত’‌ অথচ যেন তেমন এক চরিত্র যাদের দিয়ে ঈশ্বর এই পৃথিবীকে বর্ণিল রাখেন, ধীরে ধীরে তার পাখনা খোলা, চরিত্রের অজানা ভাঁজগুলো জানানো— অনবদ্যভাবে করেছেন ব্রাত্য। সিনেমায় এটাই বোধহয় তাঁর এখনও পর্যন্ত সেরা অভিনয়।
স্ত্রী রুনুর চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও যথাযথ। একদিকে যন্ত্রণা, অন্যদিকে পর–‌পুরুষের প্রতি সঠিক রসায়নে প্রলোভনের তীরটি ছুঁড়ে দেওয়া দুটো ‘‌শেড’‌–‌এই ঋতুপর্ণা অব্যর্থ। ফুটবলার ও প্রেমিক অম্বর চরিত্রে সাহেব ভট্টাচার্য ভালই করেছেন, তবে তাঁর প্রথম সত্তাটা ততটা ফোটেনি হয়তো চিত্রনাট্যেরই খামতিতে। সামান্য সুযোগেই শ্রীলা মজুমদার আজও অনবদ্য। চমকে দিয়েছেন মানালি দে। সংলাপে অন্তঃস্থিত বিষাদানায়। বিশেষত অন্ধ চোখের তারাটিকে মুখের অভিব্যক্তির সঙ্গে যেভাবে মানানসই করেছেন তিনি তা ভোলার নয়। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top