সম্রাট মুখোপাধ্যায়: না, বাঘবন্দী খেলা’‌ নয়, বরং বাঘ–বন্দি খেলা। তিনটে আলাদা তাস, তিনটে আলাদা আলাদা রঙের। এক বাক্সে পোরা। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘‌বক্স–স্টোরি’‌ বা বক্স মুভি।
তিন নক্ষত্র নায়ক, বাণিজ্যিক ধারার তিন নামী পরিচালক, আর অবশ্যই তিনটে আলাদা গল্প মিলিয়ে এই ছবি। একটায় অ্যাকশান, একটায় রোমান্স। আর একটায় কোর্টরুম থ্রিলার। একরকম না হয়ে তিনরকম উত্তেজনার খোরাক দেবার চেষ্টা। তিনধরনের দর্শককেই ধারার চেষ্টা করা।
বৃহত্তর দর্শক ধরার চেষ্টা অবশ্য অন্যত্রও আছে। তা নক্ষত্র–জালে বন্দী করে। আর তাই বাংলা সিনেমার তিন প্রধান নায়ক এ ছবিতে একসঙ্গে প্রসেনজিৎ, জিৎ, সোহম। তিনজন তিন অবতারে। জিৎ অ্যাকশন অবতারে। সোহম রোমান্সে, আর প্রসেনজিৎ টু ইন ওয়ান, উকিল এবং শাস্তিদাতা জোড়া অবতারে।
প্রথম গল্প এক আন্ডারকভার্ড পুলিশ অফিসারকে নিয়ে, যেমন চরিত্র হিন্দি ছবিতে সলমান খান বা অক্ষয়কুমাররা করে থাকেন। সেই ক্যারিশমা এখানে ভালোই সামলেছেন যিনি পর্দায় তাঁর নাম বারীণ ঘটক। এমন ছা–পোষা নাম শুনে যাঁরা হতাশ হচ্ছেন তাদের জানানোর এই নামটা এই চরিত্রের ক্যামোফ্লেজ। এই নামকে ছোট্ট করে বের করে আনা হয়েছে ‘‌বাঘ’‌কে। আসলে চিত্র নাট্যে জিৎ যেরকম। দড়ি দিয়ে ঝুলে ৫০ তলা বাড়ি থেকে নামতে নামতে উল্টোমুখ হয়ে গুলি চালানো!‌ জাহাজঘাটায় এক পাল কুংফু জানা গুন্ডাদলকে উড়িয়ে দেওয়া, খালি হাতেই। এসব জায়গায় জিৎ–এর অ্যাকশান দেখবার মতোই। তবে ভি এফ এক্স বা ক্যামেরার সপ্রতিভতায় খামতি আছে নিঃসন্দেহে। অবশ্য এ গল্পের মূল ইউ এস পি অ্যাকশনে নয়, কমেডিতে। এমন যে দুঁদে অফিসার বারীন ওরফে বাঘ, সে কিন্তু বাড়িতে বউ (‌সায়ন্তিকা)‌-‌এর ভয়ে কাঁটা!‌ পাঁচ টাকার খুচরো ফেরত পাওয়া নিয়ে ঝামেলা করে ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে, বাড়িওয়ালার গলা শুনে ভাড়া দেওয়ার ভয়ে গিয়ে লুকোয় বাথরুমে, এসবগুলো কারণ হিসেবে কতটা যৌক্তিক, কতটা বাড়াবাড়ি, বাথরুমে অতবড় একটা ট্রানসমিশান সিস্টেম এভাবে লুকিয়ে রাখা যায় কিনা, এমন একজন অফিসার ভাড়ার ট্যাক্সিতে চলাফেরা করবে কি না সে সব ব্যাপার যুক্তি দিয়ে বিচার না করতে যাওয়াই ভালো, তাহলে আর ছবি দেখা যাবে না। এটির পরিচালক রাজা চন্দ।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় গল্পে শুরুতে যেন ‘‌ব্যান্ড বাজা বরাতি’‌–র ছাপ। সেই দুই বন্ধু ‘‌ম্যারেজ ম্যানেজমেন্ট’‌–এর ব্যবসা করতে করতে নিজেরাই বিয়ে করার দিকে এগিয়ে যায়। এখানে ছেলেটির নাম হীরক (‌সোহম)‌, আর মেয়েটির নাম জয়ন্তী (‌শ্রাবন্তী)‌। তবে শুধু রোমান্সেই খুশি না থেকে পরিচালক সুজিত মণ্ডল এই চিত্রনাট্যে এনেছেন কিছুটা রহস্যের অ্যাঙ্গেল–ও। হীরকের ভিডিও ক্যামেরায় উঠে যায় এক খুনের ছবি। আর তাতে জড়িয়ে পড়ে এক অসৎ নেতা (‌ভরত কল)‌। ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে হীরক আর জয়ন্তী চলে যায় থানার পুলিস অফিসারের (‌বিশ্বনাথ বসু)‌ কাছে। সেই অফিসার আবার দু–পক্ষের মধ্যে খেলতে থাকে। এই অংশের থ্রিলিং ব্যাপারটা আরো আগে এলে ভালো হতো। অহেতুক রোমান্স আর ভাঁড়ামির পেছনে অনেকটা সময় নষ্ট করা হয়েছে।
এই ছবির তুরূপের তাস তৃতীয় অংশটি। আগের দুটির মতো ফর্মুলায় গাঁথা নয় এ অংশটি। বরং সমকালীন নানা ঘটনাক্রমের ছায়া আছে এতে। শেষটা ইচ্ছাপূরণের ঢংয়ে হয় ঠিকই কিন্তু তবু সময়ের নানা অসুখকে ছোঁয়ার চেষ্টা আছে এতে। হরনাথ চক্রবর্তীর ছবিতে সাম্প্রতিককালে এটা দেখা যাচ্ছে। ‘‌মিডল রোড’‌ সিনেমা বানানোর একটা সৎ চেষ্টা। এই‌ অংশের ছবিও তাই।
গল্পের কেন্দ্রে আছে এক আইনজীবী অগ্নিদেব রায় (‌‌প্রসেনজিৎ)‌। অগ্নিদেব এতটাই দুঁদে আইনজীবি যে তিনি নিশ্চিত জেলের হাত থেকে বাঁচিয়ে আনতে পারেন ধর্ষকদের। এই ‌ছবির শুরু তেমনই এক ঘটনায়। ধর্ষিতা মেয়েটি আত্মহত্যা করে। তার বাবা এই ঘটনার জন্য দায়ী করে অগ্নিদেবকেই। তাকে উপহার দিয়ে যায় মৃতদেহের খাট থেকে খুলে আনা একগোছা রজনীগন্ধা। এই চরিত্রে শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় মনে রাখার মতো। চরিত্রটির হতাশা, যন্ত্রণা, বিদ্রুপ, সব কিছুকে জ্যান্ত করে দিয়েছেন তিনি। অগ্নিবানের মেয়ের বান্ধবী ধর্ষিতা হয়। মেয়ে অদিতি (‌ঋত্বিকা সেন)‌ সেই ঘটনার সাক্ষী হয়। অদিতি অপরাধী দের শাস্তির দাবিতে সাক্ষী হয়। আর তার বাবা হয় অপরাধীদের উকিল। কোর্টে মুখোমুখি হয় দু’‌জনে, জমে ওঠে নাটক। ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়ানো উকিলও কেমনভাবে ভাঙতে থাকে ভেতরে ভেতরে আর তা তাকে নিয়ে যায় শাস্তিদাতার ভূমিকায় তা নিয়েই এই ছবি। ঋত্বিকা ভালই। তবে এই অংশে প্রসেনজিৎ–এর থেকে চোখ সরানো মুশকিল। দাপটে, স্নেহে, অসহায়তায়, প্রতিশোধে এমন এক বহুমাত্রিক চরিত্রকে ধারণ করা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। প্রসেনজিৎ তাঁর পরিণত অভিনয় দিয়ে অবলীলায় তা করেছেন।
 

জনপ্রিয়

Back To Top