সম্রাট মুখোপাধ্যায়: বাবাই। নাটক:‌ অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ। ভাবানুবাদ/‌পরিচালনা:‌ ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। প্রযোজনা:‌ উষ্ণীক
জীবনের রহস্য। যা আসলে প্রকারান্তরে সম্পর্কের রহস্যও। তাকেই নিজের মতো অস্তিত্ববাদী ধরনে ধরতে গিয়েছিলেন সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ। তাঁর ‘‌দ্য ফাদার’‌ (‌১৮৮৭)‌ নাটকে। যে নাটককে আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি ধ্রুপদী নাটকের একটির মর্যাদা দেওয়া হয়।
সম্প্রতি বাংলা মঞ্চে ধীরে ধীরে আবার ফিরছেন ইউরোপিয়ান নাট্যকাররা। মিলার পিরানদেল্লো, ইবসেনরা। সেই পথেই অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গও এলেন। আর এই কঠিন কাজটি করল ‘‌উষ্ণীক’‌। ঈশিতা মুখোপাধ্যায় বড় যত্নে নির্মাণ করেছেন ‘‌বাবাই’‌ মঞ্চ প্রযোজনাটি। কিন্তু পরিচালক ঈশিতাকে সবচেয়ে বড় ‘‌সাপোর্ট’‌টা দিয়েছেন নাট্যকার ঈশিতা। যেভাবে এ নাটকের বঙ্গীকরণ করেছেন তিনি, যথার্থ বাঙালি মেজাজে, বাঙালি সমকালীনতার বৈশিষ্ট্যগুলোকে যেভাবে তিনি খোদিত করে দিয়েছেন এ নাটকের দেওয়ালে, তা সত্যিই বাড়তি প্রশংসার দাবি রাখে। একসময় বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের মঞ্চে এমন সব বিদেশি নাট্যকারের যে ছিল অনায়াস আনাগোনা, তার কারণ ছিল এই ‘‌গ্লোবাল’‌ থেকে ‘‌লোকাল’‌–‌এর যাত্রাপথটা, সেই ধারাতেই আত্মবিশ্বাসী পায়ে হেঁটেছেন ঈশিতা।
এ নাটকের চরিত্রেরা একদিকে জটিল মনস্তত্ত্বকে বহন করে। তারা যা বলে করে, আর তাদের অন্তশ্চৈতন্য যা ভাবে, তা আলাদা। আবার কিছু চরিত্র পরিস্থিতির শিকার হয়। বাইরের জগৎ হয়ে ওঠে তাদের ভাবনার প্রতিকূল। এমন নাটক করতে গেলে দরকার একদল শক্তিশালী অভিনেতা–অভিনেত্রী। তা ঈশিতা পেয়েছেন। তাঁর এ প্রযোজনায় মূল তিন পুরুষ চরিত্রে পাশাপাশি অভিনয় করেছেন দেবশঙ্কর হালদার, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, প্রবীর দত্ত। এঁদের পাশেই প্রবীণা ছন্দা চট্টোপাধ্যায় ও নবীনা শ্রীজাতা ভট্টাচার্যও স্নিগ্ধ ও দাপুটে অভিনয় নিয়ে হাজির থেকেছেন। আর এমন টিম–‌এর জন্য ছোটবড় অজস্র নাটকীয় মুহূর্তের পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন ঈশিতা। যে কারণে আদ্যন্ত ভারী সংলাপের একটি নাটকও তরতর করে এগিয়ে গেছে।
প্রফেসর বোস (‌দেবশঙ্কর হালদার)‌ একজন তন্বিষ্ঠ গবেষক। যুক্তি দিয়ে জীবন ও প্রকৃতির মানে খুঁজতে চান। তাঁর স্ত্রী মায়ার (‌শ্রীজাতা ভট্টাচার্য)‌ সঙ্গে তাঁর সঙ্ঘাত মেয়ের ওপর অধিকার নিয়ে। দুজনের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন ক্ষমতার এক অনন্ত টানাপোড়েন। মায়া চক্রান্ত করে প্রফেসরকে পাগল প্রতিপন্ন করে। আর না জেনে এ কাজে তার সহায় হয় তিনজন। জীবনের তিনটি প্রান্ত বা মাত্রায় যাদের অবস্থান। বিজ্ঞান ছুঁয়ে থাকা ডাক্তার (‌শুভাশিস মুখোপাধ্যায়)‌, ধর্ম ছুঁয়ে থাকা পিসতুতো দাদা (‌প্রবীর দত্ত)‌ এবং মানবিক স্নেহ ছুঁয়ে থাকা মনুপিসি (‌ছন্দা চট্টোপাধ্যায়)‌, এঁরা কেউই সত্যকে বুঝতে পারেন না। চক্রান্তের কাছে হার মানে অসহায় পিতৃত্ব।
এ নাটকে ভাবনার সঙ্ঘাতগুলো স্পষ্ট না হলে, নাটকও পরিস্ফুট হত না। ঈশিতা শক্তহাতে হাল ধরে রেখেছেন। সেটের বাহুল্য কম থাকায় মঞ্চের ব্যবহারে স্পেস পেয়েছেন চরিত্রেরা। আবার এক নাটকীয় মুহূর্তে লাইট স্ট্যান্ড ছুঁড়ে মারার দৃশ্যটিও দারুণভাবে কার্যকরী হয়েছে। চরিত্রের জটিলতাগুলো অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দেবশঙ্কর। তাঁর পাশে এ নাটকের আবিষ্কার শ্রীজাতা। শুভাশিস মুখোপাধ্যায়কে নিজগুণে লেগেছে যেন ব্রিটিশ মঞ্চের এক অভিনেতা। শেষ দৃশ্যে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় চোখে জল এনে দেয়। নাটকের শুরু ও শেষে চমৎকার দুটো ধরা–‌ছাড়া আনেন মঞ্চে প্রবীর দত্ত। আর স্বল্প পরিসরেই মেয়ের চরিত্রে অরুণিকা দে–‌কে ভাল লাগে।
এ প্রযোজনা মূল নাটকের গভীরতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধরতে পারে।‌‌‌

বাবাই:‌ একটি দৃশ্যে দেবশঙ্কর হালদার, ছন্দা চট্টোপাধ্যায় ও শুভাশিস মুখোপাধ্যায়

জনপ্রিয়

Back To Top