সম্রাট মুখোপাধ্যায়: চমকে দিচ্ছেন সত্যি আয়ুষ্মান খুরানা। একের পর এক, এমন সব চরিত্র, যারা স্বাদে–গন্ধে- চরিত্রে সত্যিই আউটসাইডার‌। বলিউড এমন সব চরিত্র খুব কমই দেখেছে। সেউ ‘‌ভিকি জোনার’‌–এর ‌স্পার্ম ডোনার হোক বা ‘‌শুভ মঙ্গল সাবধান’‌–এর যৌন ভীতিতে ভোগা ছেলে বা ‘‌বরেলি কি বরফি’‌র লাজুক মফস্বলী লেখক, সর্বত্রই তাঁর অবাধ গতিবিধি। আর পাশের বাড়ির ছেলের ইমেজে তিনি তো এ’‌কালের অমল পালেকার।
এই ছবি ‘‌অন্ধাধুন’‌ যেমন। এছবির পরিচালক শ্রীরাম রাঘবনের বিশেষ খ্যাতিই আছে বলিউডে হাড় হিম করা থ্রিলার বানানোর জন্য। নিষ্ঠুরতা আর কৌতুক তাঁর দু’‌হাতে লোফালুফি খেলা। ফলে শ্রীরামও খুব সহজ ছকের বান্দা  নন। ‘‌জনি গদ্দার’‌ বা ‘‌বদলাপুর’‌–এর কথা ভাবলেই মনে পড়ে যাবে। একটা অপরাধ সেখানে প্রথমে ঘটে আর তারপর তা ডেকে আনে অপরাধ আর রহস্য–রোমাঞ্চমালার সিরিজকে। আর তারই মাঝে শ্রীরাম তাঁর নিজস্ব ছোঁয়াটুকু দেন। অপরাধের এই তরঙ্গভঙ্গের মধ্যে যারা থাকে, সেই সব চোর, খুনি, জালিয়াত বা গণিকাদের তিনি হিরো–ভিলেন–ভ্যাম্প–এর মহীয়ানতা দেন না। বলিউডের চেনা খেলাকে উল্টোপাল্টা করে দিয়ে কিনি এইসব চরিত্রদের ছটফটানিটাকে দেখান। অস্তিত্বের আর মনের ছটফটানি। নানা অচেনা সব কোন বেরিয়ে আসতে থাকে তাদের মধ্যে থেকে। ‘‌অন্ধাধুন’‌–এও সেই ধুনই বেজেছে।
ফলে তার কেন্দ্রীয় চরিত্রটা করা খুব একটা ‘‌চায়ের কাপ মুখে তুললেই হবে’‌ গোছের ব্যাপার ছিল না আয়ুষ্মানের কাছে। কত না বাঁক, কত না অচেনা পরত লেগে এই চরিত্রের গায়ে। কতকগুলো চেনা অভিব্যক্তির ‘‌এক্সারসাইজ’‌ আর জায়গা মতো কিছু মিষ্টি হাসি সজল কান্না জুড়ে দিলেই এ‌চরিত্র হবে না। ২০১০–এর এক ফরাসি ছবি ‘‌দ্য পিয়ানো টিউনার’‌ অবলম্বনে এ ছবি তৈরি। তার মূল চরিত্রের গায়ে সেই ইউরোপীয় নৈর্ব্যক্তিকতা তো লেগে থাকবেই,এ ছবিতে পিয়ানো বাদক আকাশ অর্থাৎ আয়ুষ্মান খুরানা অন্ধ, কিন্তু অন্ধ নয়। অর্থাৎ লোকে ভাবে সে দেখতে পায় না, কিন্তু সে সবই দেখতে পায়। সহানুভূতি জাগিয়ে কাজ পাবার সুবিধার্থে তার এই অন্ধ বেশ ধারণ। চোখে ধূসর কনট্যাক্ট লেন্স আর কালো চশমা লাগিয়ে রাখা। তবে ওটুকুকেই যথেষ্ট মনে করেন নি আয়ুষ্মান সতর্ক ক্যামেরা–চোখের জন্য। তাই চশমার নিচে জেগে থাকা চোয়ালে, কানে এনেছেন অন্ধদের সেই হিমশীতল কাঠিন্য অথচ সামান্য শব্দে খরগোশের মতো চঞ্চল হয়ে ওঠা নড়াচড়া, মুখের প্রতিটি পেশির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা দেখিয়েছেন।
এই আকাশই একদিন ঘটনাচক্রে ঢুকে পড়ে এক বাঘিনীর ডেরায়। প্রাক্তন চিত্রতারকা প্রমোদ সিনহার (‌‌দারুণ ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ভুলতে বসা নায়ক অনিল ধাওয়ানকে তাঁর তাবৎ অঁরা’‌ সমেত)‌‌ স্ত্রী সিমি (‌টাবু)‌ সেই বাঘিনী। প্রমোদের ডাকে তার বিবাহ বার্ষিকীতে পিয়ানো বাজাতে ঢুকে ফ্ল্যাটে দ্যাখে পড়ে আছে প্রমোদের নিহত দেহ। আর বাথরুমে লুকিয়ে আছে খুনি পুলিস অফিসার মনোহর (মানব ভিজ)‌। সিমির সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এ’‌খুন ঘটিয়েছে তার সেই প্রেমিক। আয়ুষ্মান যে পুরো ব্যাপারটা দেখছে তা বুঝতে পারে না এ’‌দুজন। তারা ঐ মৃতদেহকে বাক্সে ভরে পাচার করে তার সামনেই। এই গোটা পর্বে এক অদ্ভূত হাসি ঝুলিয়ে রেখে পিয়ানো বাজিয়ে চলে আকাশ। সে অভিব্যক্তি না দেখলে বোঝা সত্যিই মুশকিল। এমন একটি কৃষ্ণ কৌতুকের দৃশ্য চ্যাপলিনের ‘‌মঁসিয়ে ভেদু’‌–কেই একমাত্র বোধহয় মনে করায়। তবে চমকের এখানেই শেষ নয়। তারা আসতেই থাকে ঢেউয়ের মতো ছবি জুড়ে।
এবং তারই একটা পর্বে সিমির চক্রান্তে দৃষ্টিশক্তি হারায় আকাশ। আর মজাটা হল ঠিক তার আগেই তার প্রতিবেশি এক ছেলে আর তার প্রেমিকা সোফি (‌‌রাধিকার অবশ্য বিশেষ কিছু করার নেই এই ছবিতে)‌ জেনেছে আকাশ চক্ষুস্মান!‌ এই যে অন্ধত্ব আর দৃশ্যমানতা — তার এক অনন্ত গোলোকধাঁধার মধ্যে যেন ঢুকে পড়ে আকাশ। আর এখানেই দর্শনে এ ছবি যেন বিকল্প ধারার সাহিত্য পাঠের মতো গভীর হয়ে ওঠে। শুধু দ্বিতীয়ার্ধে চমক দেওয়ার সংখ্যাটা আরেকটু কম হলে বোধহয় ভালো হত।
এ লেখা আয়ুষ্মানকে নিয়েই। তবে, ‘‌অন্ধাধুন’‌ টাবুরও ছবি। তাঁর বিশাল ভরদ্বাজের করা দুই ছবির কথা সবার মনে আছে। যেখানে তিনি লেডি ম্যাকবেথ আর হ্যামলেটের মা। এছবিতে তাঁর এই চরিত্র সেই ক্লাসিককেই ছুঁয়েছে। আর লোভে লালসার–প্রলোভন ছড়ানোয় টাবু থেকেছেন আদিম নারীর মতোই সরল এবং জটিল। অনায়াসে একাধারে। এবং টাবুর এই তীক্ষ্ণ অভিনয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়ুষ্মান বুঝিয়ে দিলেন, বহু দূর পাল্লার যাত্রী তিনি। ‘‌অন্ধাধুন’‌ –এর গায়ে–গায়েই মুক্তি পেল ‘‌বাধাই হো’‌। এখানে আবার অন্য এক আয়ুষ্মানকে আবিষ্কার করছেন দর্শক। সন্দেহ নেই, নিজের জন্যে স্টার–সুলভ ঢাক–ঢোল না পিটিয়েও হিন্দি ছবিতে এই সময়ের সেরা একজন অভিনেতার নাম আয়ুষ্মান খুরানা। তেমনই একজন অভিনেতা, যিনি অভিনয়ের গুণে অবশ্যই এক উজ্জ্বল তারকা। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top