অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

‘‌আমি’‌ ‘‌আমি’‌ করে হেদিয়ে যাওয়া জগৎটাকে একটা বড় ধাক্কা দিল বছরের শুরুতেই মুক্তি পাওয়া ছবি ‘‌আমি জয় চ্যাটার্জি’‌। ছবির নামকরণে ‘‌আমি’‌ শব্দটা কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ, এই ছবি শেষপর্যন্ত সেটাই প্রতিষ্ঠা করে। এবং এমন একটা গভীর বিষয়কে ছবিতে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পরিচালক মনোজ মিচিগান গল্প বলার শিল্পের সঙ্গে কোথাও সমঝোতা করেননি।  শেষ পর্যন্ত টান টান রাখতে পেরেছেন ছবিকে।
এ’‌ছবির জয় চ্যাটার্জি (‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌ বিশাল বিজনেস হাউসের কর্মকর্তা। এবং কোনও কিছুই তার কথার বাইরে নড়চড় হবে না, এটাই তার জীবনের একমাত্র চালিকা শক্তি। অফিসে সবাই এই জয় তথা ‘‌জে সি’‌-‌র ত্রাসে কম্পমান। পান থেকে চুন খসলেই চাকরি খোয়ানোর পথ দেখতে হয় কর্মীদের। কোনও কর্মীর বাড়িতে অসুস্থ মেয়ে, তার চিকিৎসা চলছে, এটাও অনুপস্থিতির কোনও কারণ বলে ধর্তব্যের মধ্যে আনে না ‘‌জে সি’‌। সারা পৃথিবীটাকেই পকেটে পুরে ঘুরতে চায় সে। এমনকী তার বিপরীত স্বভাবের বান্ধবী ডাক্তার অদিতিও (‌জয়া এহসান)‌ অতিষ্ঠ জয়কে নিয়ে। প্রেমটাকেও নিজের আমিত্ব দিয়েই চালনা করতে চায় জয়। এমনই একটা সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি সৌন্দর্য্যে দুটে দিন কাটিয়ে আসতে যায় জয় আর অদিতি। রাস্তায় জয়ের গাড়ির সামনে দুর্ঘটনায় পড়ে এক ছোট্ট স্কুল পড়ুয়া। তাকে নিয়ে যখন শুশ্রূষায় ব্যস্ত এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী , তখন এক গোছা টাকা ধরিয়ে দিয়ে গা থেকে অনায়াসে এই দুর্ঘটনার দায় এড়িয়ে যায় জয়। এবং এই নিয়ে বান্ধবী অদিতির সঙ্গে মনোমালিন্য। মদ্যপান করে বেসামাল জয় টাল খেয়ে পড়ে। পরের দৃশ্যে দেখা যায় একটা এস এম এস আসে জয়ের কাছে। অদিতি জানায়, এই সম্পর্ক আর সে টানবে না।
ঘটনাবৃত্ত কখনও বর্তমানে, কখনও অতীতে ফিরে যায়। জয় কলকাতায় সোজা অদিতির চেম্বারে গিয়ে জানতে চায়, কেন সে এড়াতে চাইছে জয়কে। এখানেই ছবির গল্পের প্রথম বাঁক। জয়কে চিনতে পারে না অদিতি। এতটা আঘাত জয়ের প্রত্যাশার বাইরে। কিন্তু, আদতে জয়কে আর চিনতে পারছে না কেউই। নিজের অফিস থেকে, বাড়ি থেকে ঘাড়ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয় জয়কে। একদিন যে অনাথ আশ্রমের বৃদ্ধা কর্ত্রীকে (‌তপতী মুন্সী)‌ অপমান করেছিল জয়, সেই তাঁর কাছেই আশ্রয় জোটে কপর্দকহীন জয়ের। তাকে রাস্তা থেকে এই ভাঙাচোরা  ‘‌আশ্রম’‌-‌এ নিয়ে আসে অনাথ বালক পকাই। আশ্রম মানে  পাঁচটি অনাথ ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে একটা ডেরা। যেখানে যুবক ভোলা অনাথ দলবলের সবচেয়ে বড় সদস্য। এইসব ‘‌অবাঞ্ছিত’ লোকজনকে মানুষ বলে কখনও গণ্য করেনি জয়। অথচ, তাদের সঙ্গে বসেই  রুটি ভাগ করে খেতে হয় জয়কে। নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা জয়ের এই জার্নিতে অনাথ আশ্রমের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই অংশটুকুও খুব বিশ্বাস্যভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন পরিচালক।
সব মিলিয়ে, একটা টান-‌টান গল্পকে জীবনের একটা পরম সত্য আবিষ্কারের জার্নি করে তুলেছেন মনোজ মিচিগান। ছবির প্রথমার্ধে যা অবিশ্বাস্য মনে হয়, দ্বিতীয়ার্ধে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এই চমৎকার খেলাটা সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন মনোজ। তবে, পরিচালক এটাও বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান, যুক্তি নিয়ে অকাট্য প্রমাণের বদলে সিনেম্যাটিক‌  লাইসেন্সকে গ্রাহ্য করবেন দর্শকরা।
ছবিতে জয় চ্যাটার্জির ভূমিকায় আবির চট্টোপাধ্যায় ছাপিয়ে গিয়েছেন তাঁর আগের সব অভিনয়কে। জয়ের অহংকার, ‘‌আমি’‌-‌র ঘোরাটোপ, দাপট যেমন তাঁর অভিনয়ে স্পষ্ট, তেমনি অহংকার খোয়ানো, ‘‌আমি’‌-‌র  ঘোরাটোপ ভেঙে যাওয়া জয়ের অসহায়তা এবং মানবিক মুখটাও স্পষ্ট আবিরের অভিনয়ে। অদিতির ভূমিকায় জয়া এহসান সাবলীল ও স্নিগ্ধ। পুলিস অফিসারের স্মার্টনেস এবং দাপট শতাফ ফিগারের অভিনয়ে স্পষ্ট। নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলা এক টুকরো অনাথ আশ্রমের মায়ের ভূমিকায় তপতী মুন্সীর স্বাভাবিক ও অনুভূতিময় অভিনয় মন ছুঁয়ে যায়। অনাথ আশ্রমের পকাই তথা সুরজিৎকে আগে আমরা আবিষ্কার করেছি পাভেলের ‘‌বাবার নাম গান্ধিজি’‌তে। এখানেও পকাই হয়ে জমিয়ে দিয়েছে সুরজিৎ। তার সঙ্গী সাথী ছোটু (‌রাজা)‌, রুদ্র (‌প্রিয়ম)‌, স্যান্ডি (‌বনি)‌, স্নেহা (‌সুকন্যা)‌-‌ও কম যায়নি। তাদের ‘‌বড় দাদা’‌ ভোলার ভূমিকায় সৌম্যজিৎও চমৎকার। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ভূমিকায় সত্যিকারের সন্ন্যাসী দিগপাল ভিকুও বড় প্রাপ্তি। ছোট্ট ভূমিকায় সব্যসাচী চক্রবর্তী যথারীতি স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে, নতুন বছরে একটা মন ভালো করে দেওয়ার মতো ছবি উপহার দিলেন মনোজ মিচিগান। এমন একটা অন্যরকম ছবির প্রযোজক হিসেবে শিবাঙ্গী চৌধুরি ধন্যবাদ পাবেন দর্শকদের।
অন্যরকম ছবি, সন্দেহ নেই। সারা পৃথিবী যখন ছোট হতে হতে, অহংকারে, লোক দেখানো দাপটে ছোট্ট একটা ‘‌আমি’‌র খাঁচায় ঠুকে পড়তে চাইছে, তখন খাঁচা ভেঙে একটা বড় জগতের দিকে টান দিয়েছে ‘‌আমি জয় চ্যাটার্জি’‌। এ ছবি একটা জার্নির গল্প। এই জার্নি ‘‌আমি’‌ থেকে ‘‌আমরা’‌র দিকে নিয়ে যেতে চায়।    ‌

জনপ্রিয়

Back To Top