সম্রাট মুখোপাধ্যায়: গরমকাল আসবে। আর গরমকাল এলে ঠিক হয়ে যাবে আলিফাদের অবস্থা। আলিফার বাবা আলি আবার কাজ পাবে। তার মুখে হাসি ফুটবে। বন্ধ হবে বাবা–‌মার রোজ রাতের ঝগড়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, আলিফা আর তার ভাই আবার ভর্তি হবে পাহাড়ি জঙ্গলে নতুন করে খোলা স্কুলটায়। আলিফার মা ফতিমার ঘনিষ্ঠতা রকিবের সঙ্গে। আলির সঙ্গে তাই রকিবের সংঘর্ষ থেমে থাকে না। কিন্তু যখনই এই গল্প ত্রিকোণ সম্পর্ক যেদিকে বাঁক নিতে পারে বলে মনে হয়, তা থেকে অন্য দিকে সরে যায় গল্প। 
আসলে দুটি উপাদানের ওপর ভর রেখে দাঁড়িয়ে আছে ‘‌আলিফা’‌। এবং একটি পরিবারের চারজন সদস্যের চারটি ‘‌জার্নি’‌, চারটি খোঁজ। পাহাড়–‌জঙ্গল ঘেঁষে বেঁচে থাকা এক শ্রমিক পরিবার। তার গায়ে যেন পুরানের ভাষ্য ফুটিয়ে তুলছেন পরিচালক। প্রসঙ্গত এ ছবির পরিচালক দীপ চৌধুরির এটা প্রথম ছবি। আর এ ছবির জন্যই প্রতিশ্রুতিবান পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন দীপ। প্রথম ছবিতে তাঁর কাজ সত্যিই চমকে দেবার মতো। 
গল্পে এমনভাবে বাঁকগুলো আনা হয়েছে যে সবরকমের পূর্বপ্রত্যাশাকে তা তছনছ করে দেবে। কখনও এর গল্পে পাওয়া যাবে বিভূতিভূষণের মেজাজ। কখনও মহাশ্বেতা দেবীর। তবে দুটি অতীত কাজের সঙ্গে ইচ্ছাকৃত সাদৃশ্যকে জেনেবুঝে ব্যবহার করেছেন দীপ। তার প্রথমটি ‘‌পথের পাঁচালি’‌র সঙ্গে। 
তবে দ্বিতীয় মিলটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। আলিকে তার স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে ক্রমাগত উত্তেজিত করে চলে বন্ধু সৈফুদ্দিন। যা দাম্পত্য সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে চলে এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে। এই অংশে এই প্ররোচনা, এই ঈর্ষা দারুণভাবেই মনে করিয়ে দেয় ‘‌ওথেলো’‌র কথা। হয়ত এই অংশটির কথা ভেবেই আলির চরিত্রে দীপ বেছে নিয়েছেন আসামের বিশিষ্ট মঞ্চ শিল্পী বাহারুল ইসলামকে। বাহারুল অসামান্য চরিত্রায়ন করেছেন গোটা ছবি জুড়ে। কঠোরে–‌কোমলে–‌ঈর্ষায়–‌অসহয়তায় সর্বত্রই বাহারুল সমান দাপুটে। পর্দায় একজন দারুণ অভিনেতাকে ভারতীয় সিনেমা পেল। তার বন্ধুর চরিত্রে সত্যরঞ্জনও দারুণ।
আবার এটাও ঠিক এই সব ক্লাসিকধর্মীতা আনতে গিয়ে দীপ কোথাও শ্রমিক–‌জীবনের যন্ত্রণাকে হারিয়ে ফেলেননি। বরং যে ছবি বানিয়েছেন, তাকে ‘‌শ্রমিক–‌পুরাণ’‌ বলা চলে। গোটা ছবি জুড়ে অরণ্য, পাহাড়, প্রকৃতির যে বিস্তার তা এ গল্পকে পৌরাণিক বিভা দিয়েছে। আবার গোটা ব্যাপারটার ভেতরে উচ্ছেদের আশঙ্কার মতো বাস্তবিক সমস্যা যেমন এসেছে, এসেছে বনরক্ষীর আর্থিক শোষণ, তেমনই কড়া বাস্তবতাকে ভেঙে এর ভেতর যাদু–‌বাস্তুবতার মতো যেন ঢুকে পড়েছে এক বাঘ। যাকে ‘‌রূপক’‌ও ভাবা যেতে পারে। এই যে ছবি জুড়ে নানা তল, তাই এই ছবিকে ‘‌পিওর সিনেমা’‌ বানিয়েছে।
ফতিমার ঘাম, কান্না, রক্ত সব কিছুকে দারুণভাবে ধরেছেন জয়াশীল ঘোষ। চূড়ান্ত ডি–‌গ্ল্যামারে। এ ছবিতে নতুনভাবে অভিনেত্রী জয়ার জন্ম হল বলা যায়। একটি দৃশ্যে ভিক্টর ব্যানার্জি সুপ্রযুক্ত। প্রসূন গাইনও অনবদ্য করেছেন প্রেমিক রফিকের চরিত্র। ‌ভাল লাগে স্বপ্না দে-‌কে।  তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছে কিশোরী আলিফার চরিত্রে পাকিজা হাসমি। নিখুঁত স্বরক্ষেপণে। কখনও কখনও নীরব চেয়ে থাকার। এমনকি শূন্য অভিব্যক্তিতেও। পাকা অভিনেত্রীর মতো লেগেছে তাকে। তার ভাই ফয়জলের চরিত্রে রায়ান আবদুলও চমকে দিয়েছে।
‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top