সম্রাট মুখোপাধ্যায়: কেউ জীবনের স্বাদ পেতে চায় সদ্য–‌পরিচিত বান্ধবীর প্রিয় পাত্রকে খুঁজে এনে দিয়ে। দরকারে বৃদ্ধাবাস থেকে পালিয়ে। কেউ আবার অফিসের কাউন্টারে মাঝে–‌মাঝে আসা এক মহিলাকে দীর্ঘ চিঠিতে জানায় নিজের জীবনের সব ‌কথা।
কেউ ফাঁকা ফ্ল্যাটে চুরি করতে গিয়ে খুঁজে পায় আর এক চোরকে, আর তারপর এগোয় জীবনের জুটি বাঁধতে।
কারও জীবনে আবার মৃত্যু ছায়া ফেলেছে। তবু সে নিজের প্রিয় নক্ষত্রের আসন্ন ‘‌রিলিজ্‌ড’‌ সিনেমাটি দেখে যেতে চায়, তারকার পাশে বসে।
আলাদা করে দেখলে এরা এক গন্ডা ছোট ছবি। আর একসঙ্গে করে দেখলে এগুলো সবই আসলে জীবনের দিকে যাত্রা। বাঁচাটাকে দুর্মর ভালবেসে।
মাঝে মাঝে জীবনের, বাঁচার শূন্যতাটাকে কেবল অর্থময় করে তুলতে অন্যরকম কিছু ‘‌অ্যাডভেঞ্চার’‌–‌এর খোঁজ। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি পুরুষের হাত ধরা একটি নারীর হাতে।
চার রকমের রঙ্গ। চার রকমের গল্প। ‘‌আহারে মন’‌–‌এর চিত্রনাট্যে। এরা আবার দুই দুই ভাগে জোড়া। মানে একটি গল্পের ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–‌এর চাবি পড়ে রয়েছে অন্য গল্পের বাক্সে। সংযোগগুলো অবশ্য দর্শক একেবারে শেষে গিয়ে চমকের মতো আবিষ্কার করবেন। একটি সত্যিই চমক। অন্যটি অবশ্য কিছুটা সহজে অনুমানযোগ্য হয়ে গেছে। এহ বাহ্য। চারটি গল্পের মিলমিশ হয়েছে ভাল। চার আলাদা স্বাদের হওয়ায়। একটি শেষ করে অন্যটি, এমন গোলগাল ক্রমে এগোননি পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত। বরং টুকরো ‌টুকরো করে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে প্রতিটি গল্প। প্রতিটি টুকরোর ‘‌কাটিং পয়েন্ট’‌টা সম্পাদনার সময় ঠিকঠাকভাবে বের করে আনার কৃতিত্বে বাহবা পেতে পারেন এডিটর শুভজিৎ সিংহও। সন্দেহ নেই সৌমিক হালদারের ক্যামেরাও এ ছবির চিত্রনাট্যের বৈচিত্র‌্যকে একটি চরিত্র দিয়েছে। চারটে গল্পের কোনওটা শহরের পথে পথে, কোনওটা হাসপাতালের বিছানায় আটকানো, কোনওটা আবার বন্ধ ফ্ল্যাটের চার ‌দেওয়ালে বাঁধা। প্রতিটির জন্য আলাদা রঙের প্রাবাল্য, আলাদা মেজাজের দৃশ্যকোণ ভেবেছেন সৌমিক।
একটি গল্পের কেন্দ্রে এক বৃদ্ধাবাস। সেখানে সদ্য আসা চারুলতার (‌মমতাশঙ্কর)‌ সঙ্গে এক অদ্ভুত নির্ভরতা ও আকর্ষণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বরুণের (‌অঞ্জন দত্ত)‌। স্বামীহারা চারুলতা বরুণকে জানায় তার জীবনের অন্য এক পুরুষের কথা। এরপর তাকে খুঁজতে চারুলতাকে নিয়ে বৃদ্ধাবাস থেকে পালায় বরুণ। শেষমেশ তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে এক বড় চমক।
অন্য গল্পে আসে ‘‌ইমিগ্রেশান’‌ অফিসের এক বয়স্ক কর্মী। নাম তার পূর্ণেন্দু পাহাড়ি (‌আদিল হুসেন)‌। এই কাউন্টারেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় এক আশ্চর্য মেয়ের। তার নাম রমোনা (‌পাওলি দাম)‌। অনেক দ্বিধার স্তর কাটিয়ে পূর্ণেন্দু একসময় চিঠি লিখে নিজের মুগ্ধতার কথা জানায় রমোনাকে। আর তারপর গল্পে আসে নতুন এক বাঁক।
আরও একটি গল্পে ক্যান্সার–‌আক্রান্ত এক মেয়ের কথা। যে চিত্রাঙ্গদা চক্রবর্তী চিত্রতারকা দেবের অন্ধ ভক্ত। দেবের কথা ভেবে সে নিজের রোগ–‌যন্ত্রণার কথাও ভুলে থাকে। একদিন তার কাছে হাসপাতালে ফোন আসে দেবের। সত্যি না মিথ্যে তাই নিয়ে এরপর শুরু হয় এক গোলোকধাঁধা। এই গল্পের অনেকগুলো জায়গা চোখের কোল ভিজিয়ে দেবে। কিন্তু মাঝে মাঝে এই মেয়েটিকে যেন বয়সের তুলনায় বড় অপরিণত লেগেছে।
আর শেষ টুকরোটিতে মুখোমুখি দুই চোর। মাইকেল তেন্ডুলকার (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌ আর সুজি কিউ (‌পার্নো মিত্র)‌। দুজনের কারও‌রই এটা আসল নাম নয়। কিন্তু দুজনের ভেতর জন্ম নেওয়া প্রেমের রসায়নটা আসলই তৈরি হয়। শুরু হয় জুটি বেঁধে চুরি। চুরির গল্পগুলো অবশ্য আর একটু বাস্তব ও বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া উচিত ছিল। এই পর্বটাই ছবির দুর্বল অংশ।
এমন ‘‌অনসম্বল কাস্ট’‌–‌এর ছবিতে অভিনয়টাই সবচেয়ে বড় জোর হয়। তাই হয়েছে। গল্পের বুনোটও ভাল। তবে বাজিমাত করে দিয়েছেন অঞ্জন দত্ত আর মমতাশঙ্কর। তাঁদের এই পড়তি বেলার জুটিতেও।
পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত পরের পর ছবিতে চিত্রনাট্যে চালু ছকের বাইরে আসার চেষ্টা করছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর কাছে প্রত্যাশা বাড়ল।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top