সম্রাট মুখোপাধ্যায়: বাসনার সেরা বাসা রসনায়। ‘‌আহা রে.‌.‌.‌’‌ রসনাসিক্ত করারই ছবি। কিন্তু শুধুই রসনায় তার আবেদন নয়। বরং এ’‌ছবি মন আর চোখকেও সিক্ত করে। ‘‌আহারে’‌ না হয়ে পুরোপুরি, রঞ্জন ঘোষের এ’‌ছবি হয়ে ওঠে বরং ‘‌আহা রে.‌.‌.‌’‌।
এ’‌ছবির রান্নায় মূল উপাদানটি হল ভালবাসা। তা দিয়েই হরেক রকম ব্যঞ্জন বানিয়েছেন কাহিনিকার–পরিচালক রঞ্জন। যৌবনের অপরিণত প্রেম, অসমবয়স্ক পরিণত প্রেম। বাবা–‌মেয়ে, শ্বশুর–‌পুত্রবধূ, দিদি–‌ভাই, দেওর–‌বউদি, বন্ধু–‌বন্ধু হরেকরকম ভালবাসা থালা–‌ভরে সাজানো এ’‌ ছবি জুড়ে। সেইসব স্বাদ খুঁজে পাওয়া আর হারিয়ে ফেলা নিয়ে এ চিত্রনাট্য। মশলার অনুপাত, নুন–‌মিষ্টি সব ঠিকঠাক সমেত।
হ্যাঁ, রান্না–‌খাওয়ার ব্যাপারটা আছে এ’‌ছবিতে। একেবারে শুরু থেকে শেষ। আর সেটা আছে অনুঘটক হিসেবে। প্রেমের ছবির শুরু অপ্রেম দিয়ে। সাকিন এ’‌বাংলা নয়, ও’‌বাংলা। ঢাকা নিবাসী খ্যাতনামা শেফ, যাকে নিয়ে আমেরিকার ‘‌টাইম’‌ পত্রিকা ফিচার লেখে, সেই ফারহাজ চৌধুরি ওরফে রাজাকে (‌আরিফিন শুভ)‌ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তার প্রেমিকা শাহিদা (‌অমৃতা চট্টোপাধ্যায়)–কে‌। শুরুর এই দৃশ্যটাই যে নাটক জমিয়ে দিয়েছে গোড়াতে, তার কারণ এই দৃশ্যে আরিফিন আর অমৃতার অভিনয়ে সংলাপ বলার ‘‌টাইমিং’‌ আর অভিব্যক্তির বোঝাপড়া। তাতে সামান্য ‘‌টাচ’‌–‌এই দু’‌জনের ভেতর সম্পর্ক হারিয়ে যাওয়ার নাটকটা অল্পকথায় উঠে এসেছে। এমন টান–‌টান, নির্মেদ অথচ নাটকীয় দৃশ্য ইদানীং–‌এর বাংলা ছবিতে খুব কমই দেখা যায়। এরপর অবশ্য এ’‌ছবি এই প্রেমের টানাপোড়েনে আটকে না থেকে ঢুকে পড়েছে খাবার–‌দাবার–‌হোটেল–‌রেস্তোরাঁর অলি–‌গলিতে। হারানো প্রেমের স্মৃতি ভুলতে ঢাকার হোটেল বসের (‌আলমগির)‌ লোভনীয় অফার ছেড়েই কলকাতায় চলে আসে রাজা। তার আগে অবশ্য তার ব্যক্তিগত জীবনে মা (‌শকুন্তলা বড়ুয়া)‌ ও সৎ বাবাকে (‌দীপঙ্কর দে)‌ নিয়ে ছোট্ট একটা টানাপোড়েন আছে। যাই হোক এসব পেরিয়ে বা সরিয়েই সে কলকাতা চলে আসে। চাকরি নেয় এক বন্ধুর হোটেলে।
এর পাশাপাশি কলকাতার খাদ্য–সংস্কৃতি বুঝতে শুরু হয় তার ‘‌রেস্তোরাঁ–‌হপিং’‌। আর তারই ফাঁকে এক খাবারের দোকানে বসে খাবারের নুন–‌ঝাল নিয়ে ওয়েটারের সঙ্গে তুল্যমূল্য আলোচনা চালাতে গিয়ে আলাপ হয় এক মহিলার সঙ্গে, যে তাকে ওইদিনই এক বিব্রতকর পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচায়।

আলাপের স্বাদ প্রগাঢ় করবার সুযোগ আসে দ্রুতই। দেখা যায়, ওই মেয়েটিই অচেনা শহরে একা রাজার খাবার ‘‌সাপ্লায়ার’‌। মেয়েটির নাম বসুন্ধরা (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌ আর খাবার দিতে আসা তার ভাইয়ের (‌শঙ্খশুভ্র দাশ)‌ সঙ্গে ইতিমধ্যই রাজার ঘনিষ্ঠতা জন্মে গেছে।
ফারহাজ–‌বসুন্ধরা সম্পর্কের সূত্রপাত হয় দু’‌জনের মধ্যে রেসিপির আদানপ্রদান দিয়ে। দুই বাংলার দুই প্রতিনিধি একে অপরকে শেখাতে চায় অপর বাংলার রান্না। ফারহাজ সেই সূত্রে চেনে এশহরের বাজার–‌দোকান, পথ–‌হাট। প্রথমদিকে বসুন্ধরার বাড়িতে গিয়ে রাজার পরিচয়–পর্বের অংশটা কিছুটা ধীর। দোলের অংশটা তো একেবারেই বাড়তি। বরং শাহিদা যখন ফিরে আসতে চায় তার কাছে, সেই অংশটায় দু’‌জনের মধ্যে যে টানাপোড়েনটা তৈরি হয়, সেই অংশটা আরেকটু বিস্তৃত হলে নাটক আর চরিত্রদের মনস্তত্ত্ব দু’‌টোই আরও পরিষ্কার হত।‌ 
কারণ, এ’‌ গল্প, আবারও লিখছি, শুধু খাওয়ার গল্প‌ নয়। এ’‌ গল্প সম্পর্কের গল্প। আর তাই সেই গল্পে ঢুকে পড়ার পরেই সিনেমা ঠিকঠাক উড়ান পেয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে মানে ‘‌বসুন্ধরা’‌র গল্পে এসে। বয়েসে ঈষৎ বড় বসুন্ধরার প্রেমে পড়ে রাজা। আর চরম প্রত্যাখ্যাত হয়। কেন?‌ তার নেপথ্যে থাকে অদ্ভুত কিছু রহস্যের মনস্তাত্ত্বিক উন্মোচন, যা দর্শককে শেষপর্যন্ত বসিয়ে রাখবে। এই পর্বে অবশ্য পরান বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রটিই সেরা পদ। তার আকর্ষণ অন্য সবকিছুকে ম্লান করে দেয় চরিত্রে–অভিনয়ে–বার্তায়। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তও শক্ত ব্যক্তিত্বের অবদমনে গঁাথা সব অভিব্যাক্তিতে এ’‌ চরিত্রকে তঁার অভিনয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র করে তুলেছেন। তঁার পাশে সামান্য সুযোগেও উজ্জ্বল অমৃতা চট্টোপাধ্যায়। তঁার নিজের গলায় গাওয়া গান বাড়তি পাওনা। আর আরেক সেরা পাওনা আরিফিন শুভ। চমৎকার কণ্ঠস্বর, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা অথচ পাশের বাড়ির চেনা–‌শান্ত ছেলেটি গোছের ‘‌প্রেজেন্স’‌ তাঁকে ঘিরে একটা চমৎকার আবহ তৈরি করেছে, সঙ্গে দু’‌বাংলার বিনিময়ের প্রতিনিধিত্বটাও চিত্রনাট্যে থাকায় তা তাকে বাড়তি সুবিধে দিয়েছে। তবে শুভকে নিয়ে টলিউড আশাবাদী হতেই পারে। ভাল লাগে শঙ্খশুভ্র দাস ও অনুভব পালকে। স্যাভির সঙ্গীত পরিচালনা সুন্দর। অর্ক, সোমলতা, ঈশান ভাল গেয়েছেন।
আর নানা চেনা ঝঁাকের কই আর অতি চেনা ফর্মুলায় রাঁধা ‘‌ডিশ’‌–‌এর মাঝে এমন একটা নতুন, অন্য স্বাদের সুস্বাদু ‘‌খাবার’‌ পেয়ে বাংলা ছবির দর্শকরাও আশাবাদী হতে পারেন।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top