অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‌কত কথা না-‌বলা থেকে যায় জীবনে!‌
তাই নিয়ে কত যে দূরত্ব তৈরি হয় এই পৃথিবীতে, তার বোধহয় ইয়ত্তা নেই। সম্পর্কের তেমনই এক দূরত্বের গল্প বলতে চেয়েছেন অর্জুন দত্ত, তাঁর প্রথম ছবি ‘‌অব্যক্ত’‌য়।
কোনও সন্দেহ নেই, এই ছবির বিষয়টা খুব সহজ নয়। এবং কোনও সন্দেহ নেই, সহজভাবে বিষয়টাকে পর্দায় তুলে আনতে চেয়েছেন অর্জুন। এবং, অর্জুন পেরেছেন, অনেকটাই পেরেছেন। নবাগত পরিচালক অর্জুন দত্ত লক্ষ্যভেদ করবেন, আরও, ভবিষ্যতে, এই ভরসা দিচ্ছে ‘‌অব্যক্ত’‌।
সাথী (‌অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়)‌ ও তার ছেলে ইন্দ্রর (‌অনুভব কাঞ্জিলাল)‌ গল্প বলে মনে হলেও এই ছবি শুধুই মা, ছেলের গল্প নয়। এই ছবি বাবা, ছেলেরও গল্প। বাবা কৌশিক (‌অনির্বান ঘোষ)‌ ও তার বন্ধু রুদ্র-‌র (‌আদিল হুসেন)‌ গল্পও বটে। এবং সাথী, কৌশিক, রুদ্ররও গল্প।
যৌনতা বাংলা ছবিতে আজ আর নতুন কোনও বিষয় নয়। সমকামিতাও নয়। কিন্তু কতটা শৈল্পিকভাবে পর্দায় কে কেমনভাবে বিষয়টা নিয়ে আসছেন, সেটাই বিবেচ্য। এবং কোনও বিষয় ছবির মূলভাবনাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে কিনা, সেটাও বিবেচনার বিষয়।
এ ব্যাপারে অর্জুন মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন সারা ছবি জুড়েই। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রথম দিকের ঋতুপর্ণ ঘোষের ছায়া আছে। এখানে অর্জুন কিছুটা একলব্যের ভূমিকা নিয়েছেন, অর্জুনের নয়। তাতে পরিচালক অর্জুন অনেকটা আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন, সন্দেহ নেই।
ছোট থেকে ইন্দ্রর ঝোঁক খেলনাবাটি খেলায়। মায়ের শাড়ি পরে সুন্দর হয়ে ওঠায়। কিন্তু ছেলের এই ‘‌মেয়েলিপনা’‌ কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সাথী। মারধোর করে ছেলেকে ‘‌ছেলে’‌ বানানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকে। আর, সাথীর চোটপাট একদিকে স্বামী কৌশিকের ওপর, অন্যদিকে কৌশিকের বন্ধু রুদ্রকেও সহ্য করতে পারে না সাথী। ফলে, মায়ের ওপর চূড়ান্ত রাগ নিয়ে ইন্দ্র বড় হয়। এখন দিল্লিতে থাকে। বাড়ি, সম্পত্তি বিক্রির কাজে তাকে কলকাতায় আসতে হয়। এখন তার বাবা কৌশিক নেই। সাথী একা থাকে বিশাল বাড়িতে। সম্পত্তির কাজে আসতে হল ঠিকই, কিন্তু মাকে সহ্য করতে পারে না ইন্দ্র।
এই দূরত্ব কি আদৌ সরে যাবে?‌ মায়ের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক কি সহজ হবে?‌ মায়ের কষ্ট কি বুঝবে ইন্দ্র?‌ ইন্দ্রর কষ্ট?‌ সেটা কি টের পায় সাথী?‌
প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে ‘‌অব্যক্ত’‌। যেহেতু সম্পর্কের রহস্য এছবির একটা বড় উপাদান, তাই প্রশ্নগুলোর উত্তর দর্শকদের জন্যেই তোলা থাক।
অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় সাথী-‌র চরিত্রে খুব সুন্দর অভিনয় করেছেন। মায়ের কষ্ট, যন্ত্রণাকে স্পষ্ট করেছেন অভিব্যক্তিতে, বাচিক অভিনয়েও। কিন্তু দুই বয়সের সাথী-‌র মধ্যে দৃশ্যত পার্থক্য করাটা বেশ অসুবিধে হয়ে পড়ে অনেক সময়। এব্যাপারে মেক-‌আপ নিয়ে পরিচালকের আরও মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল। ছেলে ইন্দ্রর চরিত্রে অনুভব কাঞ্জিলাল ভাল অভিনয় করেছেন। চরিত্রটা কঠিন, কিন্তু অনুভব পেরেছেন চরিত্রটার মধ্যে ঢুকতে। ছোটবেলার ইন্দ্র হয়ে স্যমন্তক দ্যুতি মৈত্র মন ছুঁয়ে গেছে। ভাল লাগে অনির্বাণ ঘোষ, দেবযানী চট্টোপাধ্যায়, খেয়া চট্টোপাধ্যায়, পিংকি বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু পুরনো চাল যে ভাতে বাড়ে, দুটি দৃশ্যে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন লিলি চক্রবর্তী। আর, রুদ্রর চরিত্রে, খুব কম সময়েই, স্বাভাবিক, গভীর অভিনয়ে আদিল হোসেন অনবদ্য। ক্যামেরায় ভাল কাজ করেছেন সুপ্রতীম ভোল।
সৌম্য-‌ঋত-‌র সঙ্গীত পরিচালনা ভাল। জয়তী চক্রবর্তীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ সুন্দর। কিন্তু আবহ মাঝে মাঝে একটু প্রকট হয়ে উঠেছে।
প্রথম ছবিতে যথেষ্ট ভরসা দিয়েছেন অর্জুন। নতুন পরিচালকের নতুন ভাবনার পাশে দাঁড়ানোর জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য তৃণা ফিল্মস আর রূপ প্রোডাকশনের।
সত্যিই অনেক না-‌বলা কথা থাকে জীবনে। থাকে না-‌বলা কথার আলো, অন্ধকার। সেই আলো, অন্ধকার পেরিয়ে কোথাও তো পৌঁছতে চায় মানু্ষ। সেটাই জীবনের ম্যাজিক। সেই ম্যাজিককে ছুঁতে চেয়েছে অব্যক্ত।‌

জনপ্রিয়

Back To Top