সম্রাট মুখোপাধ্যায়: অতিরিক্ত সাইবার–নির্ভরতা নিয়ে সাইবার–ফিকশান। কল্পবিজ্ঞানের আধুনিকতম ‘‌ফর্ম’‌।
সঙ্গে চোখ ধাঁধানো কম্পিউটার গ্রাফিকস।
এবং চোখ কপালে তোলা রজনীকান্ত দ্য গ্রেট। জোড়া অবতারে। মানুষ আর রোবট। না, বলা ভাল ত্রয়ী অবতারে। মানুষ। ভাল রোবট, আর খারাপ রোবট। সেই ‘‌২.‌০’‌।
এ ছবি বিশুদ্ধ ‘‌সিক্যুয়েল’‌। প্রথম পর্ব ‘‌রোবট’‌ (‌বা তামিল নামে ‘‌এনথিরন’‌)‌ যেখানে শেষ হয়েছিল, এ ছবি শুরু হচ্ছে একেবারে তার কয়েক বছর পর থেকেই। হলিউডের সুপার মুভির ধারা মেনে। প্রথম পর্বের শেষে রোবট চিট্টিকে (‌রজনীকান্ত ১)‌ ভেঙে টুকরো টুকরো করে বিজ্ঞান মিউজিয়ামে রেখে দিয়েছিল স্রষ্টা বিজ্ঞানী ডাঃ বশীকরণ (‌রজনীকান্ত ২)‌। চিট্টির পূর্বকৃত কিছু বেচালের জন্য।
আর এবার গল্পের প্রথম ভাগেই সেই চিট্টিকেই দায়ে পড়ে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হচ্ছে বশীকরণকে। এক সাঙ্ঘাতিক প্রতিপক্ষ পক্ষীরাজের মোকাবিলা করতে। এই পক্ষীরাজন (‌অক্ষয়কুমার)‌ আবার মানুষ নয়। পাখি নয়। রোবট–ও নয়। বরং সে এক প্রেত। অসংখ্য মৃত পাখিদের আত্মাকে যে নিজের মধ্যে সংহত করেছে। যে পাখিরা মোবাইল–ফ্রিকোয়েন্সির রেডিয়েশান–এ মারা গেছে। তারই প্রতিশোধ নিতে একদা পক্ষী–বিজ্ঞানী পক্ষীরাজনের প্রেত হয়ে ফিরে আসা। জীবিত থাকলে লড়াইটা সায়েন্স ফিকশানের চাতালেই থাকত পুরোপুরি। কারণ তখন ব্যাপারটা হত বিজ্ঞানী বনাম বিজ্ঞানী। কিন্তু ব্যাপারটা ভূত বনাম বিজ্ঞানী হয়েই প্রাথমিক গণ্ডগোলটা হয়ে গেছে। গাঁজাখুরির গন্ডগোল। যা প্রথম পর্বে ছিল না।
এই দুর্বলতার জায়গাটা পরিচালক শঙ্কর বুঝেছেন বলেই খুব মন দিয়ে ঐ প্রতিশোধ নেবার সিকোয়েন্সগুলোকে তৈরি করেছেন। ঐসব সিকোয়েন্সে সিবিআই–এর প্রয়োগ তো অনবদ্য বটেই, কিন্তু তার থেকেও বড় ঐ দৃশ্যগুলোর ‘‌ইমাজিনেশান’‌। ভারতীয় সিনেমার এমন সব দৃশ্যকল্প সত্যিই বিরল। প্রসঙ্গত, দক্ষিণের দ্বিতীয় জনপ্রিয়তম পরিচালক সম্মুগম শঙ্করের (‌প্রথমজন যদি এস এস রাজামৌলি হন)‌ সিনেমার বরাবরেরই পছন্দের থিম এই ‘‌রিভেঞ্জ’‌। প্রতিশোধ। ‘‌ইন্ডিয়ান’‌ থেকে ‘‌আই’‌ শঙ্করের চিত্রনাট্যে প্রতিশোধের অভিনবত্বই বক্স অফিসের ভরকেন্দ্র। এ ছবিও সেই ছকেই তৈরি।
ছবিতে এক মোবাইল কোম্পানির মালিকের মুখে ‘‌বুরে দিন’‌ আসার কথা দিয়ে ঘুরিয়ে ‘‌আচ্ছে দিন’‌কে ব্যঙ্গ করাও আছে। বোঝাই যায়, মোদি সরকারের অতিরিক্ত মোবাইল–ব্যবহারে জোরের প্রতি প্রখর সমালোচনা এই গল্পের ভেতর চিরকুটের মতো গুঁজে দিতে চাইছেন শঙ্কর। কিন্তু ছবি বেপথু হয়ে পড়ে যখন পক্ষীরাজন নিছকই ভিলেন হয়ে পড়ে গল্পে। যে সহানুভূতির সঙ্গে তাঁর গল্পকে আনা হয়েছিল, তা যেন উধাও হয়ে যায়!‌ ছবিও মুখ থুবড়ে পড়ে তাতে। এমন হল কি রজনীকান্তের চাপে?‌ তামিলনাড়ুতে ভোট–উত্তর সমঝোতার অঙ্কে মোদির দলকে যদি লাগে পাশে তা ভাবলেন রাজনীতিক রজনীকান্ত?‌ এ প্রশ্নটা এড়ানো যাচ্ছে না। আর এই শেষটা অন্যরকম হল বলেই কি এ ছবি বানাতে এত সময় লাগল?‌
এই উড়ো প্রশ্নময় চিরকুটের ওপর রজনী স্যার অবশ্য নিজেই এক মোক্ষম ‘‌পেপারওয়েট’‌। তাঁর অতুলনীয় ‘‌প্রেজেন্স’,‌ অনবদ্য অভিনয় এবং অব্যর্থ ক্যারিশমা সব কিছু ঢেকে দেয়। ম্যাজিক রিয়্যালিটির ফাঁকফোকর ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর একক ম্যাজিক। এই ৭০ ছুঁইছুঁই বয়েসেও!‌ তবে এটাও ঠিক যে এ ছবির সেরা চমক অক্ষয়কুমারই। নোলানের ‘‌দ্য ডার্ক নাইট’‌ সিরিজে যেমন জোকার ভিলেন হয়েও ছাড়িয়ে গিয়েছিল ব্যাটম্যানকে। এ ছবিতে অক্ষয়ের পক্ষীরাজনও একই খেল দেখাল। আর চিত্রনাট্য একটু সহায় থাকলে তো নায়ক আর খলনায়কের মধ্যে ঘর পাল্টাপাল্টি হয়ে যেত।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top