বিদিশা রায় : প্রথমবার যখন আমেরিকায় বেড়াতে এলাম, যে শহর আমাকে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল সেটি হলো শিকাগো। (তখন যদিও জানতাম না পরের বছরই দেশ ছেড়ে এখানেই আস্তানা গাড়তে হবে!) বাঙালির শিকাগোর প্রতি দুর্বলতার কারণটি তো সর্বজনবিদিত, বিশ্ববন্দিত। আমি কিন্তু এই শহরের প্রেমে পড়েছিলাম আরেকটি বাঙালিতর  কারণে। প্রথম প্রথম বিদেশে এলে অনেকেরই যা ঘটে আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না - কলকাতাকে মিস করছিলাম। শিকাগোর পরতে পরতে আমি কলকাতাকে খুঁজে পেয়েছিলাম! বাহ্যিক সাদৃশ্য নয় - চরিত্রগত।

আমেরিকার অন্যান্য বড় বড় শহরের মতো শিকাগোও সাজানো গোছানো, সুন্দর। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় অনেককে দশ গোলে হারাবে। এরকম প্রতিবন্ধী-বান্ধব শহরও আমি বিশেষ দেখিনি। কিন্তু যেটা আমাকে আপ্লুত করেছিল সেটা এখানকার মানুষের ব্যবহার। দুপাশে টিউলিপ শোভিত রাস্তা দিয়ে হাঁটছি - উল্টো দিক থেকে যাঁরা আসছেন প্রায় প্রত্যেকে প্রীতি সম্ভাষণ করছেন, প্রত্যুত্তর দিলেই গল্প জুড়ে দিচ্ছেন। বাসস্ট্যান্ডে ম্যাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছি (মুঠোয় তখন ফোন ছিল না), শহরে আমি নবাগত বুঝে একাধিক মানুষ এগিয়ে এসে জানতে চাইছেন কোথায় যাব, কোনও সাহায্য লাগবে কি না - আমার তাবৎকালের বিদেশ ভ্রমণে এমন অভিজ্ঞতা কল্পনাতীত!

এই আন্তরিকতা যে মেকি নয় সেটা আরো বুঝলাম যখন এখানে পাকাপাকি (অস্থায়ী!) ভাবে থাকতে এলাম। দুটি ঘটনার কথা বলি। আমরা থাকতাম ডাউনটাউনে - আমার সংবাদপত্রের অফিসে যেতে হতো ঘন্টাখানেকের বাস যাত্রা করে। রোজ একই বাসে যাতায়াত করার কারণে চালকের সঙ্গে মুখ চেনাচেনি হয়ে গিয়েছিল। তারপর কলকাতায় একমাসের ছুটি কাটিয়ে প্রথম যেদিন অফিস যাচ্ছি সেদিন বাসে ওঠা মাত্র সেই চালক প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন 'ব্যাপারটা কী? তুমি ছিলে কোথায়? প্রায় একমাস তোমায় দেখিনি!'

দ্বিতীয় ঘটনাটি আমার কন্যের। শিকাগো বেড়াতে এসে পায়ে হেঁটে শহর ঘুরতে গিয়ে সে বাড়ি ফেরার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিল না। তার অবস্থা বুঝে অন্তত দশজন তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন এবং একজন তাকে বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যান। কলকাতা থেকে আসা সদ্য কিশোরীটি অবাক বিস্ময়ে আমাকে বলেছিল - এতো একেবারে কলকাতা!

এবার শিকাগোয় বাঙালির সেই তীর্থস্থানের কথা যার সামনের ফুটপাথের নাম 'স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ে'। (হ্যাঁ এখানে ফুটপাথেরও নামকরণ হয়)। নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সির অজস্র বাঙালি পরিবারের এক অভিজ্ঞতা - দেশ থেকে বয়স্ক বাবা মা এলেই তাঁদের শিকাগো নিয়ে যেতে হয়েছে শুধু একবার ওই ভবনটি দেখার আকাঙ্খা পূরণের জন্য - আর্ট ইনস্টিটিউট অফ শিকাগো। ২০১২ সালে এখানেই এক অন্য বঙ্গসম্মেলনের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় শিকাগো এলেন সাংস্কৃতিক দৌত্য সারতে। একেবারে জোড়া ফলা - রবীন্দ্রনাথ এবং বিবেকানন্দ - সার্ধ শতবর্ষ উদযাপন। (ভারে বিবেকানন্দ এগিয়ে থাকলেও শিকাগো কানেকশন-এ রবীন্দ্রনাথও কিন্তু খুব পিছিয়ে নেই - নোবেলপ্রাপ্তির বছরেই প্রথম এখানে আসা, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোয় ভাষণ দেওয়া, কবিদ্বয় Harriet Brainard Moody and Harriet Monroe-র সঙ্গে গভীর সখ্য গড়ে ওঠা হোক বা পুত্র রথীন্দ্রনাথকে আরবানাতে পড়তে পাঠানো হোক)। আর্ট ইনস্টিটিউটে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধন এবং বিবেকানন্দ ফলক উন্মোচন করলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। মূল অনুষ্ঠানটি হলো সেই fullerton হলেই। সংক্ষিপ্ততম ভাষণে সেখানে সব আলোটুকু কেড়ে নিলেন যিনি তিনিও এক বঙ্গসন্তান - শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী। মাত্র দশ মিনিটে যে বিবেকানন্দের এমন একটা ছবি আঁকা যায়, দীপেশ চক্রবর্তীর ভাষণ না শুনলে জানতে পারতাম না - এখনো সেই মুগ্ধতার রেশ মেলায়নি!

গত বছর অতিমারীর মধ্যেও শিকাগো যেতে হয়েছিল জরুরি পারিবারিক কারণে। আর্ট ইনস্টিটিউটের দরজা স্বাভাবিক কারণেই বন্ধ - দরজার বাইরের সিংহদের মুখে মাস্ক পরানো। একদিকে করোনা আর অন্যদিকে 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' পরবর্তী হিংসাত্মক কার্যকলাপ এবং লুঠপাটের ঘটনায় বিধ্বস্ত শিকাগোয় আমার কলকাতাকে যে খুঁজে পাইনি তা বলাই বাহুল্য - তবে আমি নিশ্চিত ওখানকার মানুষের স্পিরিট একটুও বদলায়নি - শুধু দিনবদলের অপেক্ষা।

জনপ্রিয়

Back To Top