ঋতু দাসদত্ত:‌ আমার ৬ বছরের মেয়ে একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলল 'মাম্মাম আমি একটা খুব mistake করে ফেলেছি, আমায় আমার বন্ধু বলল  -  you are looking so pretty today, আমি না ওকে hug করে ফেলেছি, একটা কিসিও দিয়ে ফেলেছি। sorry।'
 একটা ৬ বছরের শিশু তার সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে, এর মতো সুন্দর স্বাভাবিক দৃশ্য তো আর হয় না। অথচ মেয়েকে বলতে হল ‘‌আর কখনও কোরো না যেন!‌’‌ অবশ্য আমার না বললেও চলত কারণ ঘটনাটা ঘটার পরই দৃশ্যের আর এক কুশীলব, বাদামি চোখের সাদা ছেলেটি, রিনা ব্রাউনের মতো ছিটকে গিয়ে নাকি বলেছিল -  'don't touch me' 
ক্লাসের ২০ টা বাচ্চা এখন সবাই সবার কাছে অচ্ছুৎ। ক্লাসে বন্ধুর ঘাড়ে-মাথায় উঠে হুজ্জুতি করা, বন্ধুর স্যালাইভা মাখানো টিফিন নির্দ্বিধায় মুখে পুরে ফেলা, হাতে হাত, পায়ে পা ছুঁইয়ে টিচারকে লুকিয়ে ডেস্কের আড়ালে যুদ্ধ যুদ্ধ খুনসুটি - এসব কোনও আর জন্মের গল্প মনে হয়। ৬ ফুটের social  distancing  আসলে যে কত যোজন মাইলের দূরত্ব তৈরি করে দিলো কে জানে! 
তবু তো এদেশে স্কুলের দরজা খুলল। আমার মেয়ে তো pre K 'র  ক্লাসরুম প্রায় চোখে না দেখেই বছর পার করে নতুন ক্লাসে উঠে গেল। বহুদিন অবধি 'hybrid' প্রজাতির সদস্য হয়ে ক্লাস করছিল, প্রথম দিকে সে ভারী ফুর্তি, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দুষ্টুমি, video off করে একটু খেলে নেওয়া ঠামির সঙ্গে, টিচাররাও দিশেহারা। এক কৌটো মার্বেলের গুলিকে ভার্চুয়াল ক্লাসে বসিয়ে রাখাটা সারমেয়র ল্যাজ সোজা করার মতোই কঠিন ব্যাপার। তবে ওই - need of genuine connection - সেটা তো  অস্বীকার করার নয়। বাচ্চারা বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠল কদিন পরেই।  স্টাডি ফ্রম হোম আর ওয়ার্ক ফ্রম হোম দুটো ব্যাপার তো ঠিক একরকম নয়।  তাই রোগের একটু উপশমেই প্রথম খুলল স্কুল কলেজের দরজা।  প্রচুর বিধিনিষেধ মেনেই খুলল বটে, স্টাডি ডেস্কগুলো এক একটা স্বতন্ত্র দ্বীপ যেন, চারিদিকে প্লেক্সি গ্লাস-এর  আবরণ,  প্লেক্সি প্রটেকশন টিচারদের চারদিকেও। সে আবরণ ভাইরাস আটকায় নিশ্চয়ই, সঙ্গে একে অপরকে জড়িয়ে থাকার যে অন্তরঙ্গতা, সাহচর্য, নির্ভরতা, পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকা, সে সবও কোথাও আটকা পড়ে যায় বোধহয়, কে জানে! 
টিচারদের যাদের স্কুলে যেতে হয়, তাদের অবস্থা শোচনীয়। শূন্য ক্লাসরুমে বসে ল্যাপটপে কিছু চৌকো চৌকো  বাক্সর (সেসব বাক্সে বিচিত্র কার্টুন বা সুপার হিরোদের ছবি, মিডল স্কুল বা  হাই স্কুলের প্রায় সবাই ভিডিও অফ করে রাখতেই পছন্দ করে) দিকে তাকিয়ে একইরকম এনার্জি  নিয়ে দিনের পর দিন পড়িয়ে যাওয়া খুব সহজ কাজ নয়। এদেশে আবার 'human rights'  মাত্রাতিরিক্ত চর্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীরা সেশনের গোটাটাই ভিডিও অফ করে পার করে দিলেও কিছু বলার নেই।  টিচারের জানার উপায় নেই, চৌকো বাক্সগুলোর ওপারে আদৌ কেউ আছে নাকি ৪০ মিনিটের বক্তৃতাটা পুরোটাই ভস্মে ঘৃতাহুতি হল!  তাদের ভিডিও অন করতে বলার অধিকার নেই। unmute  করে  প্রশ্নের উত্তর দিতে জোর করার অধিকার নেই। এমনকি ভার্চুয়াল ক্লাসে পুরো সময়টা সাড়া না পেলেও সেই ছাত্রটিকে অ্যাবসেন্ট করিয়ে দেওয়ারও অধিকার নেই। আরো কত কিছুর যে অধিকার নেই! 
একটা মজার ঘটনা বলি! আমি যেখানে পড়াই, ভার্চুয়ালি দিব্য চলছিল, সদ্য একটি দুটি করে ছেলেমেয়ে ক্লাসে আসতে শুরু করেছে। লাঞ্চের পর ক্লাসে দেখলাম একটি জ্যামাইকান ছেলে তার প্লেক্সি গ্লাসে মোড়া ডেস্কে ব্যাকপ্যাকে মাথা রেখে ক্লাস চলাকালীনই ঘুমিয়ে পড়েছে।  কাছে গিয়ে ডাকতে মাথা তুলে চারিদিক দেখে বলল - 'oh! I am in the class , sorry miss!!' বুঝলাম, লাঞ্চের পর দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার অভ্যেসটি ভালই হয়েছে। গুগল ক্লাস রুমে লগ ইন করে রোজই ঘুমতো, আমি ভেবেছি বুঝি lecture শুনছে!  virtual side effects!  কিচ্ছু করার নেই! 
ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে ভার্চুয়ালি পড়ানোর জন্য এতদিন নিজেকে মোটিভেট করা মুশকিল ছিল - এখন স্কুল খুলে আরও বিপত্তি।  কিছু ইন-পারসন আর কিছু ভার্চুয়াল। পড়ানোর টেকনিক একেবারে ঘেঁটে ঘন্ট। একটু সিনিয়র টিচারদের জন্য একেবারে steep learning curve। অনেক টিচারই বাড়ি থেকে পড়ানোটাই পছন্দ করেন। তাই স্কুল vs টিচার্স একটা ঠান্ডা লড়াই চলছেই।  কিছু ডিস্ট্রিক্ট-এ টিচার্স ইউনিয়ন এতটাই শক্তপোক্ত যে স্কুল কর্তৃপক্ষকে রীতিমতো কোর্ট অর্ডার বের করে টিচারদের স্কুলে আনতে হয়েছে। 
'টিচারদের এখন না আসার কোনও কারণ নেই সেই হিসেবে।  এদেশে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।  টিচারদের অধিকাংশের ভ্যাকসিন হয়ে গেছে। আর স্কুলগুলোতে যেভাবে safety measure মানা হচ্ছে তাতে রিস্ক ফ্যাক্টর খুবই কম। আসলে টিচাররাও একটা কনভেনিয়েন্স-এ অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলে ফেরত আসাটা তাদের জন্য খুবই দরকার। না, শুধু পড়াশোনা নয়, এটা দরকার তাদের  social  and  emotional  কানেকশন এর জন্য।' বললেন নিউ জার্সির একটি হাইস্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল তিলোত্তমা বোস। একই বক্তব্য অন্য একটি মিডল স্কুলের প্রিন্সিপাল এড্রিয়েন হিল-এর,  তিনি আরও একটু চাঁচাছোলা 'শুধু যে স্টুডেন্টদের অ্যাকটিভিটি ট্র্যাক করা যাচ্ছে না তাই নয়, আমরা টিচারদেরকেও ট্র্যাক করতে পারছি না ঠিক করে।  অনেকেই এই ভার্চুয়াল সিস্টেমটাকে সুন্দর অ্যাডাপ্ট করে নিয়ে পড়ানোর টেকনিক বদলে ফেলেছেন। কিন্তু সবাই নয়।  আর তা ছাড়া স্টুডেন্টরা না এলে টিচার স্টুডেন্টের মধ্যে কোনও বন্ডিং হচ্ছে না, সেটা মোটেই ভালো বিষয় নয়।'
কথা হচ্ছিল সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক -এর প্রফেসর আন্দ্রেয়া ওয়েজ-এর সঙ্গে। 
'বিশাল ক্যাম্পাস খাঁ খাঁ করছে। এখন ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশই বাড়ি থেকে ক্লাস করতেই পছন্দ করছে। যাদের ল্যাব করতে হয় সেইসব সায়েন্স স্টুডেন্টরা দু'তিনদিন ক্যাম্পাসে আসে।' তিনি মাস্টার ডিগ্রির যে ক্লাস পড়ান তাতে এশিয়ান ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি, চাইনিজ, কোরিয়ান আর কিছু ইউরোপীয়, তারা অনেকেই নিজের দেশে ফিরে গেছে, সেখান থেকে ক্লাস করছে। টাইম জোন আলাদা। নেটওয়ার্ক প্রব্লেম। সবমিলিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জিং।
ফিল্ম স্কুলগুলোর অবস্থা আরও সঙ্গীন।  নিউ ইয়র্ক ফিল্ম একাডেমি এখন খোলা।  কিন্তু তাদের পুরো থ্রি টিয়ার সেফটি সিস্টেম। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং-এর অবকাশ কম, তাই নিজের মাস্কের ওপর স্কুলের দেওয়া ডাবল লেয়ারের মাস্ক পরে ছাত্রছাত্রীরা রীতিমতো যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিয়ে শুটিং -এ বেরচ্ছে। শুনলাম, এখন অধিকাংশটাই নাকি থিয়োরি নির্ভর! একটা সময় ওখানে কিছুদিন পড়ানোর সুযোগ হয়েছিল, দেখেছিলাম যে পুরোটাই হাতে কলমে, থিয়োরি ক্লাস প্রায় নেই বললেই চলে! সেটাই ওই ফিল্ম স্কুলের বৈশিষ্ট্য! মহামারী একটা প্রতিষ্ঠানের পলিসিটাই পুরো উল্টে দিল! 
তবে স্কুল হোক, বা কলেজ বা ইউনিভার্সিটি, সর্বত্রই ডিস্ট্রিক্ট -এর হেলথ প্রটোকলগুলো একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হচ্ছে। ক্যাম্পাস খুলে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সপ্তাহে একদিন করে, মূলত বুধবার ছুটি রাখা হচ্ছে গোটা ক্যাম্পাস স্যানিটাইজ করার জন্য। ফলে বাবা মা'রা এখন খানিকটা ভরসা পাচ্ছেন বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে। আর এই মুহূর্তে পরিসংখ্যান অনুযায়ী নতুন করে covid আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে, মে মাসে হাজার কুড়ি বাইশ, আর মৃত্যু গোটা মহাদেশে মাত্র ৫০০-র কাছাকাছি। যা গত বছরে তুলনায় ছেড়েই দিলাম, এ'বছরের গোড়ার নিরিখেও খুবই কম। আমেরিকার ৫০ শতাংশ মানুষের দুটো ভ্যাকসিন নেওয়া হয়ে গেছে। এখন ১২ থেকে ১৮ বছরের ছেলেমেয়েদের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। এভাবে চললে আশা করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরে নতুন সেশন শুরু হলে আবার আগের মতো স্কুল সিস্টেমে ফিরে যাওয়া যাবে। তবে এসব নেহাতই আনুমানিক আশা ভরসার কথা। ভাইরাস যে কোথা দিয়ে আবার দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে কখন ফিরে আসবে যুদ্ধক্ষেত্রে সে কেই বা জানে! 
তবে covid একটা আনন্দ চিরতরে ঘুচিয়ে দিল এটা বলা যায়।  covid  চলে যাবে, সব খুলে যাবে আগের মতো, সুস্থ স্বাভাবিক হবে পৃথিবী, কিন্তু ঈশান কোণে কালো মেঘ দেখলে মন আর নেচে উঠবে না স্কুল ছুটির আশায়। সে প্রথম বিশ্বই হোক বা তৃতীয়, বাচ্চাগুলোর স্কুল ক্যালেন্ডারে রেইনি ডে বা স্নো ডে গপ্পোটা পোস্ট কোভিড দিনগুলোতে ঝাপসা অতীত হয়েই থেকে যাবে। 

জনপ্রিয়

Back To Top