.

ঋতু দাসদত্ত: দীঘা, বকখালি, মন্দারমণি - বাঙালির উইকএন্ড  ডেস্টিনেশন।

রেস্ত বা সময় দুটোই বেশি থাকলে দার্জিলিং, শিলং বা পুরী । নিউ জার্সির বাঙালিদেরও ব্যাপারটা ঐরকমই অনেকটা। লেক জর্জ, পকোনোজ, ভার্জিনিয়া বা  আটলান্টিক সিটি - সময় ও বাজেট দুই ডাবল করে নিলে ফ্লোরিডা, মেইন, নিউ হ্যাম্পশায়ার,  ইয়েলোস্টোন - ডেস্টিনেশনও অগুনতি।  আর নিউ জার্সির একটা সুবিধে হলো মোটে এক ঘন্টার দূরত্বে পাহাড়, জঙ্গল ও সমুদ্র তিনটিই মেলে, তাই ডে ট্রিপ -এর জন্যও মাথা খুঁড়তে হয় না।  
একবছর ঘরবন্দি থেকে এই বছরটা সবাই বেরিয়ে পড়েছে যে যেখানে পারে! মোটামুটি সকলের ডাবল ভ্যাকসিন হয়ে গেছে, মাস্ক পড়ার বিধিনিষেধও এখন অনেকটাই শিথিল, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু স্কুল, কলেজ, অফিস এখনো অধিকাংশ জায়গাতেই ভার্চুয়াল করার অপশন আছে, এমন সুবর্ণ সুযোগ কি আর বছর বছর মিলবে! আস্তে আস্তে দেশের গন্ডি ছেড়ে কেউ কেউ আমেরিকার বাইরেও পা রাখতে শুরু করেছে।  দুবার করে covid  টেস্ট অবশ্য বাধ্যতামূলক, অন্য দেশে ঢোকার সময় ও স্বস্থানে ফেরত আসার সময়।  সেই বিরক্তিকর পর্বটা বাদ দিলে ওভারসিস ট্রিপ -এর জন্য এখন গোল্ডেন অপর্চুনিটি।  এয়ারলাইন্সগুলো টিকিটের দাম কমিয়ে দিয়েছে শুধু নয়, ট্রিপ cancellation ও এখন অভূতপূর্ব flexible।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন গুলোও প্রায় অধিকাংশই খুলে দেওয়া হয়েছে। মার্কিনবাসীদের  জন্য এখনও অবশ্য ইন্ডিয়া, ব্রাজিল, ব্রিটেন বা সাউথ আফ্রিকা -এই ডেস্টিনেশনগুলো দরকার না পড়লে এড়িয়ে চলাই ভালো।  ট্রাম্প জমানায় কোনো বাধাই ছিল না। যখন তিন হাজার  করে লোক মরছিল রোজ, তখনও  এদেশের বাসিন্দারা বুক ফুলিয়ে যেকোনো সময় কোনো কাগজপত্র, টেস্ট রিপোর্ট, কোয়ারান্টিন, এসবের তোয়াক্কা না করেই দেশে ঢুকে পড়তে পারতো। কোনো কোভিড আক্রান্ত দেশ থেকে ফিরেও, সৌজন্যে ট্রাম্প, অবলীলায় হাসিমুখে ইমিগ্রেশন টপকে রিসিভ করতে আসা প্রিয়জনকে বুকে  জড়িয়ে ধরতে পারতো। এখন সে 'সুদিন' নেই অবশ্য। তাই আজ মানুষজন নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারছে দেশে বা দেশের বাইরে, কিন্তু কোভিড স্ট্যাটিসটিক্স -এ খুব বেশি হেরফের হচ্ছে না।  সিডিসি- র রিপোর্ট অনুযায়ী এখন দিনে প্রায় ৫/৭০০০ জন আক্রান্ত হচ্ছে গোটা মহাদেশে। সংখ্যাটা এখনো যথেষ্ট চমকানোর মতোই, কিন্তু  যে দেশ ৩৩ কোটিকে আক্রান্ত হতে দেখেছে, তার কাছে এই সংখ্যাটা বিন্দুসম! 
আসলে পুলিশের রক্তচক্ষু, সরকারি বাধানিষেধ, এসবের থেকে অনেক বেশি কার্যকরী মানুষের ভয়।  গতবছর যখন দেশে লকডাউন হলো,দলে দলে কলকাতার বাঙালিরা বেরিয়ে পড়লো। অফিস ছুটি, স্কুল ছুটি, শখের প্রাণ গড়ের মাঠ। দিঘা, পুরীর বিচ -এ গিজগিজে ভিড়, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা ছুটির জেরে লকডাউনের উদ্দেশ্য- বিধেয়কে সম্পূর্ণ কাঁচকলা দেখিয়ে বাঙালি দেদার ফুর্তিতে ঘুরে বেড়ালো। জমিয়ে যখন কলকাতার বাঙালিকে গালি দিচ্ছি তার অবিমৃষ্যকারিতার জন্য, মিয়ামি বিচে থৈথৈ ভিড়ের খবরে বোলতি পুরো বন্ধ হলো আমাদের! তখন সরকারি বিধি নিষেধে ডে ট্রিপ, উইক এন্ড ট্রিপ বন্ধ করলেও টুকটাক বেরোনো, গ্রসারি, এদিক ওদিক পার্টি, গ্যাদারিং চলছিলই।  মনে আছে, যেদিন কমিউনিটির একজনের মৃত্যুর খবর এলো আর শুনলাম পরিবারের কেউ শেষ দেখাটুকুও দেখতে পারেনি, গোটা রাত জেগে কাটিয়েছিলাম ভয়ে ! পরদিন মাস্ক ঠিক নাকে উঠলো, গ্রসারি অনলাইনে বাড়িতে আসতে শুরু করলো, সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং বাড়িয়ে নিজেরাই ৬ থেকে ২৬ করে ফেললাম! তারপর একেবারেই গৃহবন্দী বেশ অনেকগুলো মাস! বহুদিন পরে আস্তে আস্তে সেই ভয়টা আবার কাটিয়ে উঠছি আমরা।  যদিও ধুকপুকানিটা পুরোপুরি যায়নি এখনো! সেটা থেকে যাবে আগামী বেশ কিছুদিন বা বছর !  
ভালো লাগছে যে এখন দোকানে মাস্ক ছাড়া ঢুকলে দোকানিরা রে রে করে তেড়ে আসছে না মাস্ক পরতে বলে। এমনকি বন্ধ ঘরের গ্যাদারিং-এও সবার চোখ নাক মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্ট- এর বাইরে কার্ব সাইড pick up only বোর্ড আর তেমন চোখে পড়ছে না। মনে আছে, গতবছর লক ডাউনে একবার নিউ ইয়র্ক সিটি গেছিলাম, মানে নিউ ইয়র্ক শহরের ওপর দিয়ে ফিরছিলাম কোথাও থেকে।  মনে হয়েছিল কেন এলাম এখন দিয়ে! এ'শহরকে তো আমরা চিনি না। এই শহরকে এভাবে কখনো দেখতে হবে তো ভাবিনি। যে শহর রাতে কখনো ঘুমোয় না, চব্বিশ ঘন্টা একইরকম হুল্লোড় আর আলোর ঝলকানি, সেখানে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। মাইলের পর মাইল দোকান রেস্তোঁরাগুলোতে ঝাঁপ বন্ধ! বিশাল বিশাল নিওন বোর্ডগুলো যেন মৃত শহরে মূর্তিমান প্রহসন হয়ে ঝুলছে।  এখন সেই শহরও যেন কোমা থেকে একটু একটু করে জেগে উঠছে।  আমরা বিশ্বাস করতে চেষ্টা করছি আপ্রাণ যে এই পৃথিবী সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই মুহূর্তে থার্ড ওয়েভ এলে এই  পৃথিবী শুয়ে পড়বে, লড়াই করার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ আমাদের। তাই সবার সব উইল পাওয়ার জড়ো করে  একটাই প্রার্থনা -  একটু মাস্কহীন পৃথিবীতে বাঁচি আমরা কিছুদিন,  ফুসফুসে বাতাস ভরে নিই অনেকখানি।

আকর্ষণীয় খবর