বিদিশা রায় : বাঙালির যদি পায়ের তলায় সর্ষে হয়, আমেরিকানদের তবে ইয়ের তলায় চাকা। একেবারে আক্ষরিক অর্থে। পুরোদস্তুর গাড়িপাগল দেশ। তার ওপর তেলের দাম  (এখানে অবশ্য গ্যাস বলে) অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা। মাইলের পর মাইল টানা দশ-বারো ঘণ্টা গাড়ি চালানো এদেশে এক্কেবারে জলভাত।সপ্তাহান্তে বাক্সপ্যাঁটরা সমেত চার চাকায় বেরিয়ে পড়াই দস্তুর। কিন্তু সেই রুটিনে থাবা বসিয়েছিল করোনা।আমেরিকায় জাতীয় ছুটির সংখ্যা মাত্র দশ। সেই সব ছুটির সপ্তাহে পুরো দেশ প্রায় রাস্তায় নেমে আসে। কোনও কিছুর বিনিময়ে আমেরিকানরা যে সেই স্বাধীনতা (!)বিসর্জন দিতে রাজি নন তার প্রমাণ মিলেছিল গত বছর মেমোরিয়াল ডে-তে ফ্লরিডা বিচের জনসমাগম দেখে। একেবারে আমাদের কুম্ভমেলার ভায়রাভাই! এই নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও উঠেছিল তুঙ্গে। ফ্লরিডা লাল রাজ্য - অর্থাৎ রিপাব্লিকানদের দখলে। সেখানকার গভর্নর এবং আরও কিছু লাল রাজ্যের অধিকর্তা ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে চেল্লাচিল্লি করতে লাগলেন যে করোনা ডেমোক্রাট পার্টি এবং তাদের সহযোগী মিডিয়ার অপপ্রচার মাত্র। শুরু হল তুমুল খিল্লি। অন্যদিকে ডেমোক্রাটপন্থী মিডিয়ার রিপোর্ট দেখে/পড়ে মনে হচ্ছিল, সমস্ত রিপাবলিকান স্টেটই চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং কোভিড পরিস্থিতি সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ব্যাপারটা যে রাজনৈতিক রঙের নয়, পুরোপুরি প্রশাসনিক সদিচ্ছার, সেটা মালুম হল দুটি রিপাবলিকান স্টেট সফরে গিয়ে।

ভারমন্ট - ভৌগোলিক আয়তনে দেশের ষষ্ঠ ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে কম জনসংখ্যার নিরিখে দ্বিতীয়। এখানকার সব রাজ্যেরই একটা ডাকনাম থাকে। ভারমন্ট হলো গ্রিন মাউন্টেন স্টেট - সবুজ পাহাড়ের দেশ।ম্যাপেল সিরাপ উৎপাদন ব্যতীত শিল্প বিশেষ নেই। আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন। শীতের আগমনের আগে হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন পাতার আগুন দেখতে। সেই পাতা ঝরে গিয়ে সবুজ পাহাড় যখন বরফে ঢেকে যায়, তখন ভিড় জমান স্কি-প্রেমীরা।

আমরা উডস্টক নামের ছোট্ট একটা শহরে হোটেলে ঘর বুক করেছিলাম গতবছর তাণ্ডব শুরুর আগেই। পরিস্থিতি তখনও তেমন ঘোরালো হয়নি, সেই হোটেল থেকে ফোন এসে গেল - তোমরা এসো না, কারণ রাজ্য প্রশাসন চাইছে না বাইরে থেকে কেউ এখানে আসুক। স্টেট ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম সেখানে সরাসরি না বলা নেই, যা বলা আছে তা না-এর বাবা। আমরা হোটেলের রিজারভেশন ক্যানসেল করিনি। মাস দুয়েক আগে আবার ফোন - এবার আসতে পারো, শর্তসাপেক্ষে। টিকা নেওয়া থাকলে সেই সার্টিফিকেট দেখাতে হবে, না হলে মুচলেকা সই করতে হবে যে বাড়ি থেকে সরাসরি এসেছি এবং তার আগে চোদ্দদিন বাড়ির বাইরে পা রাখিনি। টিকান্বিত হওয়ার প্রমাণপত্র নিয়ে যাওয়া গেল।দেখলাম বিধিনিষেধ আছে, কিন্তু দমবন্ধকরা নয়। আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছি কিন্তু তাড়াহুড়ো করে নয়, এই বার্তা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।

তার দিন পনেরো পরে পাড়ি দিয়েছিলাম আরেক লালরাজ্য মেরিল্যান্ড-এর (আমেরিকার জাতীয় সংগীতের জন্ম এই রাজ্যেই) রাজধানী অন্যাপলিস-এ। একেবারে আক্কেলগুড়ুম! তার ঠিক আগেই সিডিসি মাস্কসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করেছে এবং গভর্নর সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যবাসীকে 'যাক না যেদিকে যেতে চায় প্রাণ' স্টাইলে জীবনযাপনের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন। দূরত্ববিধির বালাই নেই। বার, রেস্তরাঁয় তুমুল গাদাগাদি, পা ফেলবার জায়গা নেই। আমরা অবশ্য পদার্পণের চেষ্টাও করিনি। মাস্কের আড়ালে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুলজুল করে তাকিয়ে থেকে ঘরে ফিরে এসেছি। স্থানীয় ক'জনকে পাকড়ে জানতে চাইলাম - তোমরা এমন লাগামছাড়া হলে কী করে, কারণ সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখনো প্রতিদিন অন্তত আড়াইশো মানুষ মেরিল্যান্ড-এ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। অধিকাংশই ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের জবাব দিলেন। কেউ কেউ টিকার দোহাই দিলেন। মোদ্দা যেটা বুঝলাম, শাস্তির ভয় নেই, তাই বেপরোয়া হতে বাধা নেই। কথায় বলে, ভয় নাকি মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু কখনও কখনও সেটাও বোধহয় খুব জরুরি! তবু একটা কথা অস্বীকার করতে পারছি না, আবার মাস্কমুক্ত ভয়হীন (!) দুনিয়াটা কেমন হবে, সেটা দেখে ইস্তক উত্তেজনার চোরাস্রোতটা বয়েই চলেছে।

জনপ্রিয়

Back To Top