.

বিদিশা রায়: শিকাগোয় আমাদের বিল্ডিং-এর মেইনটেনেন্স হেড ছিল বব।

মানে, জলের কল হোক বা দেওয়ালের পলেস্তারা - সব সমস্যার মুশকিল আসান টিমের সর্দার। ববের সঙ্গে খুব অল্পদিনেই আমাদের ঘোরতর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী, ফ্ল্যাটে কোনো সমস্যা হলে বিল্ডিং কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, তারা লোক পাঠাবে। আমাদের ক্ষেত্রে বব সেই নিয়ম মানত না। বলেই দিয়েছিলো, কোনো কিছু হলে আমাকে শুধু একটা ফোন বা মেসেজ করবে, এত অভিযোগ দায়ের করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। হতোও তাই। একদিন ববকে বললাম, তোমার ড্রিলিং মেশিনটা একটু ধার দেবে, আমাদের দরকার আছে। বব খুব দুঃখিত ভাবে ঘাড় নেড়ে বললো, ঐটা পারবো না, বিল্ডিং এর কোনো যন্ত্র ধার দেয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। নিষেধাজ্ঞার কারণ জেনে আমার তো একগাল মাছি। আগের এক বাসিন্দা হাতুড়ি ধার নিয়েছিলেন পেরেক ঠুকবেন বলে এবং তা করতে গিয়ে তাঁর আঙুল ফেটে যায়। তিনি নাকি তৎক্ষণাৎ আদালতে মামলা ঠুকে দেন এই বলে যে, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তাঁর হাতের নয়, হাতুড়ির দোষে। সেই মামলা তিনি জিতে যাওয়ায় বিল্ডিং কর্তৃপক্ষকে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। সেই থেকে নিয়ম জারি হয়েছে - কাস্তে হোক বা হাতুড়ি - ধার দেওয়া যাবে না।

থ' হয়েছিলাম, দ' ধ' হওয়া বাকি ছিল, সেটা হয়ে গেল শিকাগো ট্রিবিউন-এর একটি রিপোর্ট পড়ে। জনৈক চোর মহোদয় ঘনঘোর শীতকালে একজনের বাড়ি পুণ্যকর্ম সারতে গিয়েছিলেন। বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে বারান্দায় জমে থাকা বরফে পিছলে পড়ে গিয়ে তাঁর পা ভেঙে যায় এবং তিনি বুক ঠুকে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। চোরবাবুর  বয়ানটি সত্যি মনোমুগ্ধকর। "হ্যাঁ আমি চুরি করতে গিয়েছিলাম সেটা আলাদা ব্যাপার। কিন্তু ও (অর্থাৎ গৃহকর্তা) বরফ কেন পরিষ্কার করে রাখেনি? আমার পা তো সেই জন্যেই ভেঙেছে।" প্রচুর ক্ষতিপূরণ সমেত তিনি মামলা জিতে যান। আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম, এমন হয় নাকি? সে বললো, খুব হয়। এদেশে কাউকে সু (Sue) করাটা জলভাত। ইনজুরি লইয়ার-এর হোর্ডিং-এর মাহাত্ম্য কিঞ্চিৎ অনুধাবন করলাম। এদেশে নেতানেত্রী বা মন্ত্রীদের ব্যানার, হোর্ডিং দেখা যায় না, উকিলদের যায়। ইমিগ্রেশন লইয়ার, ইনজুরি লইয়ার, ডিভোর্স লইয়ারদের বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। এমন বিজ্ঞাপন দেখেছি যা বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় - 'সস্তায় ডিভোর্স। বাচ্চাসমেত ৬০০ ডলার, বাচ্চাছাড়া ৪৫০।'

ঘটির আদালত দর্শন নাকি সহজে হয় না। আমার এযাবৎ একবারই হয়েছে শিকাগোর আদালতে মুম্বাই হামলার মূল চক্রী ডেভিড হেডলির মামলার রিপোর্ট করতে গিয়ে (সে নিয়ে অধুনালুপ্ত 'এবেলা' পত্রিকায় বিস্তারিত লিখেছিলাম)। হেডলি তো রাজসাক্ষী। বিচার চলছে তার বন্ধু তাহাউর হোসেন রানার ভূমিকা নিয়ে। দুপক্ষের বাঘা বাঘা আইনজীবী লড়ে গেলেন। তাঁদের নিশ্ছিদ্র যুক্তিজালের সামনে আমার মতো আইন-অজ্ঞ পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকলাম। তর্কাতর্কির পালা শেষে জুরিবৃন্দ (তাঁদের নামধাম জানা যায় না, শুধু নম্বর, জুরি ১, জুরি ২) সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার পর বিচারক লেনিনওয়েবের শাস্তি ঘোষণা করলেন। বুঝলাম এই দেশের আইন ব্যবস্থায় জুরির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

 


এর ঠিক কিছুদিন পরেই বাড়িতে চিঠি হাজির - অমুক মামলায় তোমাকে জুরি বোর্ডের সদস্য হতে হবে। চিঠির ভাষা বেশ কঠোর - না বলা চলবে না। যদি কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে তার প্রমাণ দিতে হবে। চাকরিরত হলে নিয়োগকর্তা আদালতের দিনগুলিতে তোমাকে সবেতন ছুটি দিতে বাধ্য ইত্যাদি। শেষে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো যখন দেখলাম জুরি বোর্ডের সদস্য হওয়ার প্রথম শর্তেই আমি ডাহা ফেল, তা হলো আমেরিকার নাগরিক হতেই হবে। সে না হয় হলো, কিন্তু নাগরিক হলেই কি বিচার ব্যবস্থায় সামিল হওয়া যায়? আইনকানুন জানার প্রয়োজন হয় না? বিশেষত যেখানে একটি সিদ্ধান্তের ওপর একটি মানুষের জীবনমরণ নির্ভর করছে, এবং সেই মতামতের শরিক আমার মতো একজন, যে আইনের অ' জানে না? নিশ্চিতভাবে বলা যায় এমন অসংখ্য জুরি ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কমলাকান্ত থাকলে কী বলতেন, কে জানে।

আকর্ষণীয় খবর