অনাম্বর আদিত্য চৌধুরী: ১০ মাস পর গত ১৯ মে থেকে প্যারিস কিছুটা হলেও নিজের চেনা ছন্দে ফিরল। কারণ খুলে গেছে বার-রেস্তরাঁ। ৩১ অক্টোবর শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় দফার লকডাউন। এখানে নমো নমো করে দুর্গাপুজো হয়েছিল গত বছর। মনে আছে, ঠিক তার পরই লকডাউন হয়ে গেল। গত সপ্তাহান্তে প্যারিসবাসী একটু খুশির মুখ দেখেছে। কিন্তু সেই খুশিতে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে নাইট কার্ফু। রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্ফু। সারা পৃথিবী জানে, প্যারিস বিখ্যাত তার নাইট লাইফের জন্য। কিন্তু যখন লাইফেরই নিশ্চয়তা নেই, তখন আর নাইট লাইফ নিয়ে কে মাথা ঘামায়। তাই যেটুকু পাওয়া যায় তাই নিয়েই মেতে উঠেছে সবাই। বিকেল পড়তে না পড়তে ভিড় বাড়ছে ক্যাফেতে। গ্রীষ্মকাল তাই দিনের আলো থাকে প্রায় ৯টা পর্যন্ত। কিন্তু ঘড়ির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঠিক সময়ে বাড়ি না ঢুকতে পারলে বিপদ। পুলিশ ধরে জরিমানা করে দেবে, আর সেটাও বেশ চড়া।
প্যারিসের রাস্তা ধরে হাঁটলে এখন অন্য দৃশ্য। ফুটপাথে টেবিল চেয়ার পাতা আর তাতে বসে চলছে আড্ডা। চার দেওয়ালের মধ্যে বসা নিষিদ্ধ। সামনে কফির কাপ থাকুক বা ওয়াইনের গ্লাস, বসতে হবে খোলা হাওয়ায়। এই প্যারিসকেই অবশ্য আমার চেনা লাগে। দীর্ঘদিন এই শহরে থাকার সুবাদে এর আমুদে চরিত্রটা আমার ভালই জানা। ক্যাফে কালচার এখান থেকেই বোধহয় ছড়িয়েছে সারা পৃথিবীতে। এরা খুব ভালবাসে ক্যাফে-বার-রেস্তরাঁয় বসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্পগুজব করতে। ১০ মাস ধরে সেই সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে হাঁফ ধরে গেছিল। তাই লকডাউন উঠতেই বেরিয়ে পড়েছে। তবে খারাপ লাগে ভাবতে, এই সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, যেটাকে প্যারিসের কলেজ স্ট্রিট বলা যায়, সেখানকার বহু নামকরা রেস্তরাঁ এমনকী বইয়ের দোকানও, যেমন গিলবার্ট জোসেফ, বন্ধ হয়ে গেছে গত ১০ মাসে। দরাসিদের অনেকেই ওয়র্ক ফ্রম হোম-এর সুযোগে অন্য শহরে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন। যে প্যারিস শহরে বাড়ি ভাড়া পাওয়া মানে লটারির টিকিট লাগা, সেখানে এখন সহজেই বাড়ি পাবেন।
গত বুধবার পথে বেরিয়ে মনে হল যেন শহরটার পুনর্জন্ম দেখছি। সকলের মতো আমিও আমার ডিপার্টমেন্টের কয়েকজনকে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম একটা বারে। টেবিল পাওয়ার আশা ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন গোটা প্যারিসটাই নেমে এসেছে রাস্তায়, বসে পড়েছে যে যেখানে পেরেছে। চারিদিকে টেবিল চেয়ার আর মানুষের কলস্বর। ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল চেনা বারটেন্ডার ক্লেমন্টের সঙ্গে। হাতটা ধরে বলল, ‘সেস্ট ক্যুয়েল জো’, মানে কী সুন্দর দিন! ১১ মাস পর ক্লেমন্টের সঙ্গে দেখা হয়ে এত আনন্দ হল, বুঝলাম এই পরিস্থিতিতে যে বেঁচে আছি আমরা, পরিচিত মানুষের মুখোমুখি হতে পারছি, সেটাই পরম ভাগ্যের। ওর সৌজন্যে বসতে পেলাম। হই হই করে কেটে গেল কয়েকটা ঘণ্টা। 
করোনা যেহেতু দূর হয়নি বিশ্বের কোনও দেশ থেকেই, বড়জোর সাময়িকভাবে কমেছে প্রকোপ, তাই বিধিনিষেধ উঠে গেছে ভাবলে ভুল হবে। মাস্ক পরতেই হবে। নিয়ম ভাঙলে তক্ষুণি ১৩৫ ইউরো জরিমানা। কোনও জায়গায় ১০ জনের বেশি জমায়েত করা যাবে না। শুনেছি ৯ জুন থেকে বাঁধন আরও একটু আলগা হবে। পাবলিক জিম, সুইমিং পুল খুলবে। প্যারিসের বিখ্যাত মিউজিয়ামগুলোর দরজাও সম্ভবত খুলবে, সীমিত সংখ্যার দর্শকের জন্য। যেহেতু ইউরোপে টিকা দানের হার খুব ভাল, তাই মানুষের মধ্যে করোনার ভয় কমছে। গত উইকেন্ড থেকেই আগেকার মতো লং ড্রাইভ বা কাছেপিঠে বেড়াতে যাওয়ার হুজুগ উঠেছে। ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের দু’ কোটি মানুষ টিকা নিয়েছেন। খুব সহজ একটা অ্যাপে নাম রেজিস্টার করে স্লট বুক করা যায়। টিকা নিয়ে প্রথম দিকে যেসব বিতর্ক শুরু হয়েছিল, সেসবও আর নেই। ফলে গণ টিকাকরণের লক্ষ্যে এগোতে সরকারের অসুবিধা হচ্ছে না। 
গত এক বছরে প্রিয় শহরটাকে চোখের সামনে আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে দেখে খুব মনখারাপ হয়েছিল। এই প্যারিস শুধু আমার কেন, সারা পৃথিবীর অচেনা। আবার এত মাস পর তাকে রঙিন হয়ে উঠতে দেখে ভাল লাগছে। তবে কতদিন এই ঝলমলে রূপ দেখতে পাব কে জানে! সব সময়েই তো শুনছি, দরজায় কড়া নাড়ছে পরবর্তী ঢেউ।

জনপ্রিয়

Back To Top