.

শাহনাজ বেগম, ঢাকা: ডেল্টা ভেরিয়েন্টের ছোবলে সন্ত্রস্ত্র বাংলাদেশের মানুষ।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ডেল্টার আতঙ্কে ভীত মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক। অক্সিজেনের অভাবে চারিদিকে হাহাকার। হাসপাতালে বিছানা নেই। মাদুর পেতে যশোর জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশমুখে পড়ে আছেন রিনা বেগম। 
এই অবস্থা কেবল যশোরের নয়- খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় সর্বত্রই ডেল্টার ছোবল। দূর দূর থেকে ঢাকায় আসছে কোভিড রোগী চিকিৎসা নিতে। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শতকরা ৫০ ভাগ রোগী এখন ওই অঞ্চলগুলো থেকে আসা। করোনা সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় ৩২ শতাংশ ছুঁয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জুন থেকেই বলে আসছিলেন জুলাইয়ে এই অবস্থা হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির তৈরি করা হলুদ- সবুজ-কমলা-লাল রংয়ের করোনা মানচিত্রে তাঁরা রীতিমতো ডায়াগ্রাম করে দেখিয়েছিলেন, মহামারী ঐ আসছে ধেয়ে!
৫১-৬৭ শতাংশ অধিক সংক্রমণশীল ডেল্টার প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা জনবিচ্ছিন্নতাকেই একমাত্র পথ বলে সুপারিশ করেছেন। সেই সুপারিশেই গোটা বাংলাদেশ এখন 'কঠোর বিধি-নিষেধের' আওতায়। সরকারি-বেসরকারি, আধা সরকারি অফিস বন্ধ, বন্ধ শপিংমল-দোকানপাট, কেবল কাঁচা বাজার খোলা রাখা হয়েছে ৯টা থেকে ৫টা অবধি। আর খোলা আছে ওষুধের দোকান।
খাবারের দোকান খোলা থাকলেও সেখানে বসে খাওয়ার আর কোনও উপায় নেই ,অনলাইনে অর্ডার করে চলছে বিকিকিনি। সংক্রমণের ভয়াবহতা রোধ করতে মানুষ যেন ঘর থেকে না বের হয়, সেজন্য নেওয়া হয়েছে এসব উদ্যোগ, কিন্তু বাঙালিকে রুখবে কে ? 
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হয়েছিলেন একটি ছাত্র সংগঠনের একদল নেতাকর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন বন্ধ, তবুও দেশ পরিচালনার স্বপ্নে বিভোর এক ভবিষ্যৎ নেতা শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে জন্মদিনের কেক কাটা উপলক্ষে সমাবেশ করেছেন। জড়ো হয়েছিলেন জনা পঞ্চাশেক সাঙ্গোপাঙ্গ। ২৫ পাউন্ডের কেক কাটলেন ভাবি এই নেতা!
কেবল ছাত্রনেতাই নন, করোনার এই মরণছোবল উপেক্ষা করে প্রতিদিন পথে নামছে হাজার হাজার মানুষ, শত শত গাড়ি। আর ঢাকা তো রিক্সারই শহর....এভাবেই চলছে 'কঠোর বিধিনিষেধ' পালন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত 'লকডাউন' পালন করতে তাদের প্রোটোকল মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা পাশ কাটাতেই সরকার 'কঠোর বিধি-নিষেধ' -এর আশ্রয় নিয়েছে। আসলে জীবন-জীবিকা শব্দের ঘেরাটোপে অর্থনীতি সচল রাখতেই সরকার লকডাউনের প্রতিশব্দ খুঁজে বের করেছে। 
কেবল সরকারই ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে একথা ভাবা ভুল। করোনাকালে প্রায় ১২ হাজার করদাতা কালো টাকা সাদা করেছেন। টাকার অঙ্কে যা প্রায় সাড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা। জমি-ফ্ল্যাট, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বেড়েছে। রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জুন মাসের শেষে প্রাথমিক হিসাবে করদাতা ১১,৮৫৯ জন, এদের প্রায় ৬০ শতাংশ নগদ টাকা সাদা করেছেন। বুধবার যখন বাংলাদেশ‌ রেকর্ডসংখ্যক ২০০ মৃত্যু দেখেছে, তখন কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন ৪,৫০০ এর বেশি করদাতা, কিনেছেন জমি ও ফ্ল্যাট। তবে নাকি শোনা গেছে, করোনায় অর্থনীতি মরে যায়!
টানা ৭ দিনের 'কঠোর বিধিনিষেধের' পরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকার ১৫ জুলাই পর্যন্ত এর সময়সীমা বৃদ্ধি করেছেন। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত পাবলিক হেলথ কমিটি। এই অবস্থায় তাঁরা বলছেন, বিধি-নিষেধ নয়, লকডাউনও নয়, করোনার বিরুদ্ধে টিকাই একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি।
দেশে করোনাভাইরাসের টিকাদান শুরুর পর থেকে এ'পর্যন্ত সিরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি এস্ট্রোজেনেকা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে ১,০১,১৩,১৯৭ জনকে। ভারত থেকে এদেশে ভ্যাকসিন এসেছে মোট ১ কোটি ২ লাখ ডোজ। এই হিসাবে এস্ট্রোজেনেকার টিকা মজুদ আছে মাত্র ৮৬,৮০৪ ডোজ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, প্রথম ডোজ নেওয়া ৫৮,২০,০১৫ জনের মধ্যে সাড়ে ১৪ লক্ষ মানুষের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেই। অথচ এঁদের সবাইকে এস্ট্রোজেনেকার টিকাই নিতে হবে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও দুই কোম্পানির দুই ডোজের টিকা গ্রহণের কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি।
বাংলাদেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয়ভাবে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। টিকা সংকট দেখা দেওয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২ মে বন্ধ করে দেওয়া হয় টিকা নিবন্ধন। একদিকে টিকা প্রাপ্তির এই অনিশ্চিয়তা, অন্যদিকে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট- এর তাণ্ডবে কাঁপছে এখন গোটা বাংলাদেশ। 
বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ লক্ষ ডোজ মডার্না টিকা উপহার পেয়েছে। আরও ১,০০,৬২০ ডোজ ফাইজার- এর টিকা এসে পৌঁছেছে।
চীনের সিনো ফার্মা থেকে নগদ অর্থে ১.৫ কোটি ডোজ টিকা কিনেছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে ২০ লক্ষ ডোজ এসে পৌঁছেছে। চীন উপহার দিয়েছে ৫ লক্ষ ডোজ টিকা। 
সিরামের টিকা পেতে ভারতের সঙ্গে দেনদরবার জারি রেখেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের কাছ থেকে কোনও আশ্বাস না পেলেও বারবার বলা হচ্ছে, আগামী মাসে ভারত থেকেই সিরামের টিকা পাওয়া যাবে।
বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, জাপানের কাছ থেকে ২৫ লক্ষ ডোজ টিকা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলি আলাপন করেছেন তিনি, সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বিনামূল্যে ২.৫ মিলিয়ন ডোজ টিকা পাবে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, "জাপানের কাছ থেকে আমরা এস্ট্রোজেনেকার টিকা পাব, তাদের কাছে এস্ট্রোজেনেকার টিকা আছে।" তিনি আরও জানান, ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ ১০ লক্ষ ডোজ টিকা পাবে। করোনাকে বশে আনতে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের সুরক্ষায় সরকারের হাতে টিকা মজুদ রয়েছে মাত্র ৫২ লক্ষ ডোজ। 
করোনার রক্ষাকবচ টিকা এখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আর ধনী রাষ্ট্রগুলোর কাছে বন্দি। তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তির ভবিষ্যৎ। এই জনপদের মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, "টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি ধনী ও বড় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।" 
এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন বঙ্গভ্যাক্স একমাত্র রক্ষাকবচ হতে পারত। কিন্তু হায়! দেশীয় কোম্পানি গ্লোব-বায়োটেক উৎপাদিত টিকা বঙ্গভ্যাক্স আজও ফাইনাল ট্রায়ালের অনুমোদন পেল না। দুর্জনেরা বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চাপে এমনটা ঘটল। বঙ্গদেশের বঙ্গভ্যাক্স হয়তো বা মহামারীর ইতিহাসে উপহাস হয়েই থেকে যাবে!

আকর্ষণীয় খবর