.

বিদিশা রায় : আমার হায়দ্রাবাদের এক প্রাক্তন সহকর্মী এখন কানসাস সিটিতে থাকে। কিছুদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম তার এক বন্ধু তাকে ক্যালিফর্নিয়ায় ঠিকানা বদল করতে বলার উত্তরে সে লিখেছে যে 'আমি আমেরিকায় থাকতে চাই, আমেরিকার ইন্ডিয়ায় নয়!' মজাচ্ছলে বললেও এর মধ্যে কিন্তু একটা সত্যি আছে। আমেরিকায় যেখানেই ভারতীয়দের সংখ্যা বেশি, সেখানে অবধারিত ভাবে একটা 'লিটল ইন্ডিয়া' গড়ে উঠবেই। নিউ ইয়র্ক সিটি, জার্সি সিটি বা শিকাগো - লিটল ইন্ডিয়া বিরাজমান সর্বত্র। তাদের চরিত্রে মিল যেমন, অমিলও কম নয়।

খ্যাতির বিচারে শিকাগোর লিটল ইন্ডিয়া ডেভন এভিনিউ না নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস কে এগিয়ে তা বলা কঠিন। শিকাগোয় আমার অফিস ছিল ডেভনে। প্রথমবার সেখানে গিয়ে রীতিমতো হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। চতুর্দিকে গুজরাটি আর হিন্দির ক্যাচরম্যাচর চলছে।মাইলখানেক বা তারও বেশি লম্বা রাস্তার দুধারে ছোট বড় অজস্র দোকান। সেখানে কী না পাওয়া যায়। এমন অনেক পুরোনো ব্র্যান্ডের তেল সাবান শ্যাম্পু দেখলাম যা আজকাল কলকাতাতেও দেখা যায় না। রীতিমতো রোম খাড়া হয়ে গেল গুজরাটি দোকানের শো কেস-এ শোভিত বঙ্গ জীবনের অঙ্গকে দেখে। ডেভনের ব্যবসায়ীদের নব্বই শতাংশই গুজরাটের। কিন্তু বিক্রীবাটার নিরিখে তাদের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে ইলিশ মাছের ছবিসহ বাংলা সাইনবোর্ড ঝোলানো গুটিতিনেক বাংলাদেশি দোকান। দূরদূরান্ত থেকে মৎস্যপ্রেমীরা সপ্তাহান্তে এখানে যে রেটে ভিড় জমান, তা দেখবার মতো। 'কেমন আছেন' কলকলানিতে 'কেম ছ' তখন ব্যাকফুটে।

জ্যাকসন হাইটস এর একেবারে উল্টো। নিউ ইয়র্ক শহরের বাংলাদেশিদের সিংহভাগের ডেরা এখানেই। গেলেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। ডেভনের তুলনায় অপরিচ্ছন্ন হয়তো কিন্তু লুচি আর কষা মাংস পাতে পরার পর কোন উজবুক সে নিয়ে মাথা ঘামায় (আমেরিকার ভারতীয়দের খাদ্যপুরাণ নিয়ে উপন্যাস লিখে ফেলা যায়, ভবিষ্যতে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে)। তবে আমার কাছে জ্যাকসন হাইটস এর  সেরা আকর্ষণ এখানকার বাংলা বইয়ের দোকানটি। একবার পুজোয় কলকাতা যাওয়া হয়নি তাই পূজাবার্ষিকীর খোঁজে এখানে প্রথম এসেছিলাম। চতুর্দিকে শুধু বাংলা বই আর তার মন পাগল করা গন্ধ - লুচি-মাংস তখন ব্যাকফুটে!

খোদ ম্যানহাটানেও কিন্তু লিটল ইন্ডিয়া উপস্থিত - লেক্সিংটন এভিনিউতে। তবে এখানে মূলত খাবারের দোকানের ভিড় আর সেখানে অভারতীয়দের ভিড় বেশি বৈ কম নয়।

নিউ জার্সিতে মিনি ভারত একাধিক জায়গায় - এডিসন, জার্সি সিটি ইত্যাদি। এদের চরিত্রে ডেভনের সঙ্গে মিল বেশি। গুজরাটি, পাঞ্জাবিরাই সংখ্যাগুরু। জার্সি সিটির নেওয়ার্ক এভিনিউ আয়তনে অনেক ছোট কিন্তু পাওয়া যায় না এমন জিনিস নেই - সে কুল হোক বা কামরাঙা। ভোর থেকে মাঝরাত্তির পর্যন্ত গমগম করছে। বাড়িতে কেবল  কানেকশন না থাকলেও নো চিন্তা। এক কাপ চা নিয়ে যে কোনো জায়গায় বসে গেলেই হলো - আইপিএল হোক বা বলিউড-এর নাচাগানা - যা চাই পেয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, এখানে সকাল বিকেল রাস্তার ধারে দিব্বি গুলতানির  আসরও বসে নিয়মিত।

একটা জিনিস মনকে সবথেকে নাড়া দিয়ে যায়।যে জায়গাগুলোর কথা বললাম অর্থাৎ ডেভন, জ্যাকসন, বা জার্সি - সবাই এক অখণ্ড ভারতের চালচিত্র। ভারতীয়, পাকিস্তানী এবং বাংলাদেশিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখলে ভ্রম মনে হতে পারে, কিন্তু তা নয়। প্যাটেলদার দোকান থেকে চাল ডাল, দিদির দোকান থেকে ইলিশ মাছ কিনে, জব্বারদার দোকানে বসে ভরপেট কাবাব খেয়ে বাড়ি ফেরাই তো রীতি।

এই জায়গাগুলোর কিন্তু আরো দুটি ব্যাপারে দারুণ মিল। চোখ যদি বন্ধ রাখেন, পাঁচমেশালি খাবারের গন্ধটা সর্বত্র হুবহু এক। আর যদি চোখ খোলেন তাহলে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে যাবেন যে আপনি কোথায়। কারণ - রাস্তায়, ফুটপাথে শুধুই পানের পিক! আমাদের স্বভাব নিয়ে কী যেন একটা প্রবাদ আছে না?