.

বিদিশা রায়: 'ফিগার ইট আউট'।

সামান্য সাহায্যের প্রত্যুত্তরে যে তীব্র অবজ্ঞা আর বিরক্তি নিয়ে মহিলা অফিসারটি শব্দগুলো ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তা বারো বছরেও ভুলিনি। নিউয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্টে লটবহর সমেত একা নেমেছি। পরবর্তী উড়ান ধরার জন্য হাতে বিশেষ সময় নেই অথচ টার্মিনালে যাওয়ার রাস্তার দিশা পাচ্ছি না। সে জন্যই জনৈক এয়ারপোর্ট অফিসারের সাহায্য চাওয়া এবং বিনিময়ে অহৈতুকী পাটকেল প্রাপ্তি। তখন কী আর জানি যে সেই সবে শুরু। ফিগার ইট আউট। আমাদের ভাষায় 'আপনা হাত, জগন্নাথ'।

আপনা হাতের যে কী মহিমা, তা আমার মতো আমেরিকায় বসবাসকারী প্রবাসীমাত্রেই হাড়ে হাড়ে জানেন। তার সূচনা, অনেকের ক্ষেত্রে, এ দেশে পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায় স্টিয়ারিং-এ হাত রাখা দিয়ে। কেউ গাড়ি চালাতে জানে না শুনলে লোকজন এমন এক দৃষ্টিপাত করে যে লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার পথ থাকে না। আমি সেই বিরল, হতভাগ্য, লজ্জাহতদের দলে। নেহাৎ শহরে বাস করে গণপরিবহনের দৌলতে এখনো বেঁচেবর্তে আছি। Suburb বা গ্রামে বাস করলে কবেই আই সি ইউ-তে ঢুকে যেতাম। রান্নাঘরে নুন ফুরিয়ে গেলে সেটা কেনার জন্যও যদি নিদেনপক্ষে দশ মিনিট গাড়ি চালানো ছাড়া কোনও বিকল্প না থাকে তাহলে আর কী করা?

দেশে আমরা রান্নার বা কাজের মাসি একদিন ডুব মারলে তার বাপবাপান্ত করে ছাড়ি। এদেশে নিজের পিতৃমাতৃদত্ত নাম ভুলে, হাবুডুবু খেতে খেতে 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে'র  নতুন অর্থ আবিষ্কার করি। হয় করো, নয় মরো। যে মেয়েটি এর আগে নিজের হাতে জলটুকু গড়িয়ে খায়নি, তার ফাঁকা জলের বোতল তাকে নিজেই ভর্তি করতে হবে। কাজ করতে করতে নিজের কর্মকুশলতায় একদিন সে নিজেই অবাক হয়ে যাবে যখন সব মাসির কাজ দিব্বি শিখে যাবে। যে পতিদেবতা এতদিন পর্যন্ত পায়ের ওপর পা নাচিয়ে হুকুম চালিয়েই খালাস ছিলেন, তিনি অবশ্য কর্তব্য হিসেবে গাড়ি তো চালাবেনই তার পাশাপাশি অমলেট বানাতে শিখে যাবেন, বাথরুম পরিষ্কার করবেন। সব হাত কা খেল!

এতো গেল আপাত তুচ্ছ ব্যাপার। আসল শক্তিশেল আসা এখনো বাকি। আমাদের এসেছিল, যখন ফার্নিচার-এর দোকানে গিয়ে দেখেশুনে একটা কম্পিউটার টেবিল আর চেয়ারের অর্ডার দিয়ে এসেছিলাম। নিশ্চিন্তে আছি। তারপর এলো দুটো ইয়াব্বারো বাক্স। তার ভিতরে টুকরো টুকরো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, নানা মাপের স্ক্রু আর একফালি লম্বা কাগজে নির্দেশিকা। দেরি না করে কাজে লেগে যাও। কোনও নিরঞ্জনদা (কলকাতায় আমাদের বাড়ি কাঠের কাজ করতেন) পাওয়ার আশা রেখো না। বিপদভঞ্জন কাজে লেগে গেলেন, আমি হলাম তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট। সেই কাজে এই ক'বছরে এমন হাত পাকিয়েছি যে কলকাতায় গেলে নিরঞ্জনদার অ্যাসিস্ট্যান্ট-এর চাকরি পাকা।

এইভাবে ফিগার ইট আউট-এর চক্কর চলতেই থাকে। নিজের অজান্তে অনেক পরিবর্তন ঘটে। শেষমেশ পরিণতিটা বোধহয় খুব খারাপ হয় না। গত সপ্তাহে দোকানে গিয়েছিলাম। এক বৃদ্ধা, হাতের ভারি ব্যাগ নিয়ে বহু কষ্টে হাঁটছেন। আমরা জানতে চাইলাম কোনও সাহায্য লাগবে কি না। হেসে, ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, না আমি একাই পারব। আত্মনির্ভর। 

 

শিকাগোয় আমার এক দৃষ্টিহীন সহকর্মী ছিল। জন্মান্ধ নয়। হায়দরাবাদের ছেলে। চোখের চিকিৎসা করাতে এসেছিলো অতি ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে, কিন্তু দৃষ্টি ফিরে পায়নি। এদেশেই থেকে গিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত, কাজ পেতে অসুবিধা হয়নি। আমাদের সংবাদপত্রের টেলিমার্কেটিং-এর দায়িত্বে ছিল। অসম্ভব হাসিখুশি। শীতকালে নিজের সাদা লাঠি ঠুকে ঠুকে এক হাঁটু বরফ ভেঙে অফিস আসত। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি দেশে ফিরে যাও না কেন, এখানে তুমি সম্পূর্ণ একা, দেশে তো সব আত্মীয়স্বজন আছেন? এক মুহূর্ত না ভেবে সে উত্তর দিয়েছিল, আমি দেখতে পাই না বটে কিন্তু এখানে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। দেশে ফিরলেই তো আমি প্রতিবন্ধী হয়ে যাব। স্বনির্ভর। ফিগার ইট আউট!!!!

আকর্ষণীয় খবর