.

শুভশ্রী দত্ত, লন্ডন: শুরু করছি একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। গত বছর অগাস্ট মাসে আমি কিছু বিশেষ কাজে ভারতবর্ষে এসেছিলাম। যুক্তরাজ্যে করোনার প্রথম ঢেউ পেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ভারতে প্রথম ঢেউ তখন শীর্ষে, দিনে প্রায় ৭০-৮০ হাজার করে লোক আক্রান্ত হচ্ছে। অবাক হয়ে দেখেছিলাম সামাজিক দূরত্ব, যা এই অসুখকে নির্মূল করার অত্যন্ত কার্যকরী একটা উপায়, তা নিয়ে যেন কারোর কোনও মাথাব্যথাই নেই। এয়ারপোর্টের লাইনে যখন আমি দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াচ্ছি, লোকে ফাঁকা জায়গা আছে ভেবে লাইনে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে! তখন শঙ্কা হচ্ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে চেতনার এই অভাব দেশে বিপদ ডেকে আনবে না তো? সে যা হোক, কোনও রকমে কাজ সেরে তো আমি আবার মানে মানে ফিরে এলাম যুক্তরাজ্যে, এদিকে তখন এখানে ধীরে ধীরে দ্বিতীয় ঢেউ মাথা চারা দিতে শুরু করে দিয়েছে। অক্টোবরের শেষের দিকে দিনে তখন ১৫-২০ হাজার করে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু স্কুল কলেজ সবই খোলা, সরকার লকডাউন এর কথা একেবারেই ভাবছেনা। এহেন পরিস্থিতিতে রোজ বাচ্চাদের দুরু দুরু বুকে স্কুল পাঠানো, প্রায় রোজই একটা করে ই-মেইল আসে যে ক্লাসে অমুক ছেলের কোভিড ধরা পড়েছে, তোমার ছেলে যদি তার সাথে মিশে থাকে তাহলে অবিলম্বে তার টেস্ট করাও এবং ১০ দিনে ঘরে আইসোলেট করে রাখো, সে এক দুর্বিষহ অবস্থা। এদিকে বড়দিন তখন আসন্ন। এদেশে বড়দিনের আগে যে ব্যবসা বাণিজ্য চলে সেটা অনেকটা কলকাতার দূর্গা পুজোর আগের হৈ-হৈ রৈ-রৈ এর সাথে তুলনা করা যায়। সরকার চাইছিল না সেই ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হোক যারা সারা বছর ধরে এই সময় লাভের মুখ দেখার জন্য বসে থাকে। এদিকে এতো মেলামেশার ফলে বড়দিন আর নববর্ষের ঠিক পরেই কোভিড আক্রান্তদের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ৬০-৭০ হাজার হয়ে যাওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে জানুয়ারি মাসে লকডাউন করে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম, স্কুল বন্ধ!

 

ফেব্রুয়ারী মাসে এখানে আস্তে আস্তে কেস কমতে লাগল, মার্চ এর শুরুর দিকে এক প্রস্থ আনলক হল, স্কুল সহ অনেক দোকান আবার খুলল। ভ্যাকসিন দেওয়ার তোড়জোড় সরকার তখন পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে, প্রায় ২০% প্রাপ্তবয়স্কদের ততদিনে প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া হয়ে গিয়েছে। সবাই আশায় বসে আছে কবে ভ্যাকসিন পাবে আর সরকারও পূর্ণ উদ্যমে ভ্যাকসিন ক্যাম্প করছে I ভারতে তখন প্রথম ঢেউ শেষ হয়েছে, দৈনিক আক্রান্তদের সংখ্যা নিয়ে আর কারোরই মাথা ব্যাথা নেই, মন্ত্রীরা সবাই নানা রকম বিবৃতি দিতে শুরু করলেন কীভাবে ভারত কোভিডকে জয় করেছে। চারিদিকে শীতের মরশুমে কেমন একটা পিকনিকের মতো উল্লাস, লোকে ঘুরছে ফিরছে এবং স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন নিয়েও কারোর সেভাবে কৌতূহল নেই। মনের মধ্যে শঙ্কাটা বাড়ছিল, যা হচ্ছে তা কি ভাল হচ্ছে? মার্চ মাসের শুরুতে যখন একদিকে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নেতারা মেতে উঠেছেন পঞ্চরাজ্য ভোটযজ্ঞে! আগামী পাঁচ বছরের গদি এঁটে বসার তপস্যায়। মেলামেশাতে আর বাধা-নিষেধ নেই, কেউ যেন আর মাস্ক টাও পড়তে চাইছেনা, বাকি সব তো ছেড়েই দিলাম। সেই সময় বিভীষিকার মতো ঘনিয়ে এল ভারতে দ্বিতীয় ঢেউ। সেই ঢেউ এরকম ভাবে অতর্কিতে আছড়ে পড়ল যে তার সামনে সবাই অসহায়ের মতন দাঁড়িয়ে, লড়াই করার ক্ষমতাও যেন আর রইল না। চারিদিকে শুধু মৃত্যুমিছিল, চেনা-শোনা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সেলিব্রিটি, শুধুই একের পর এক দুঃসংবাদ‌।

যুক্তরাজ্যে লকডাউন উঠল ১২ এপ্রিল। সব দোকান-পাট, বাজার-হাট, সুইমিং পুল, সবই সরকার খুলে দিল, স্কুল তো তার আগে মার্চ মাসেই খুলে দেওয়া হয়েছিল। এখন স্কুলের ট্রিপ, স্টেডিয়ামে খেলায় দর্শক সব নিষেধই উঠে গেল। আর তার সঙ্গে ধীরে ধীরে এখানেও বাড়তে থাকল ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট, যা কিনা ভারতে তখনও তাণ্ডব করেছে। সরকার ভ্যাকসিন এবং টেস্টিং, দুটোর বিস্তার বাড়াতে ব্যস্ত, কিন্তু তার মধ্যে এটা খেয়াল করল না, যে ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যাতায়াত তখনও চালু থাকার দরুণ এখানে হু হু করে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এপ্রিলের প্রায় শেষের দিকে যুক্তরাজ্য ভারতকে রেড লিস্ট করল এবং ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বিমান চলাচল বন্ধ করল। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে, যুক্তরাজ্যে আবার তৃতীয় ঢেউয়ের অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে, আবার আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু ভ্যাকসিনের বিস্তারের ফলে হাসপাতালে ভিড় কম, এবং মৃত্যুর সংখ্যাও আগের দুটো ঢেউ এর তুলনায় অনেকটাই কম। আশার আলো দেখা যাচ্ছে যে এই ভ্যাকসিনকে হাতিয়ার করে আমরা হয়তো এই অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গৈ শেষমেশ মোকাবিলা করতে সফল হব। এখানে ২১ জুন সব আনলক করে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সরকার আংশিক লকডাউন ১৯ জুলাই অবধি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে I

এ তো গেলো পরিসংখ্যান। কিন্তু এই সাইন-কস-এর ঢেউ এর খেলায় মানুষের মানসিক সাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ছে তার কোনও পরিসংখ্যান বুঝি কোনো সরকারই করতে পারবেনা। যে বৃদ্ধা একা ফ্ল্যাটে আজ এক বছরের ওপর বসে আছেন, এই জীবাণু যার কোনও রকম বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে, সে যে কী মারাত্মক একাকিত্বে ভুগছে এবং এই এক বছরে যে না করেও তার মানসিক অবস্থায় অন্তত ৪-৫ বছরের অবনতি হয়েছে সেই পরিসংখ্যান কোনো সরকার রাখবে না। যে শিশুটি তার স্বাভাবিক পার্কেবেড়ানো ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলা ভুলে গেল এবং মাস্ক পরে থাকাকেই স্বাভাবিক মেনে নিল, সে যে একটি স্বাভাবিক অনাবিল আনন্দের বয়সে ঘরে ভীতিপ্রদ ভাবে কাটাল এর ফলে তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে সেটার কী প্রভাব পড়ল এবং ভবিষ্যতে তার প্রভাব কীরকম ভাবে সুদূরপ্রসারী হবে, তার কোনও মূল্যায়ন কেউ আজ করছেনা। অনেক কিশোরী আজ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে বই খাতা ফেলে রেখে বন্ধুদের সাথে ফুচকা খাওয়া ও সিনেমা দেখার মজাটাই পেল না, তাদের পাওয়া নম্বর যেহেতু পরীক্ষাহীন নম্বর, তার মূল্য ও অনেকের চোখে অনাবশ্যক ভাবে কমে গেল, সেই দুঃখের বোঝা আজ কিন্তু সেই কিশোরীর সঙ্গে কেউ ভাগ করে নিতে পারছেনা। তার ওপর প্রিয়জনকে হারানোর শোক ও তাদের কষ্ট দেখার যন্ত্রনা তো আছেই, তার মানসিক প্রভাব কিন্তু সাংঘাতিক। আর ডাক্তার ও নার্সদের গত দেড় বছরে ধরে হাড়ভাঙা অমানসিক পরিশ্রমের কথাও ভুললে চলবেনা। এই যে একটা সমাজ আজ সামগ্রিক ভাবে নানারকম মানসিক চাপে্য মুখোমুখি হচ্ছে, তার খতিয়ান কে দেবে? হয়ত কেউই না।

তাই আমরা কি পারিনা, সবাই মিলে সংগঠিত ভাবে সমাজে এক হয়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে? আমি জানি, অনেকে দাঁড়াচ্ছেন, আবার অনেকেই কিন্তু এটা আমার সমস্যা নয় বলে মুখ ঘুরিয়ে থাকছেন। আমরা কি পারি না আমাদের বয়স্ক মাসি-পিসি-দিদাদের নিজেদের ব্যস্ততার মধ্যে থেকে একটু সময় বার করে দিতে? আজকে তো সবার হাতেই মুঠোফোন। একটা ভিডিও কল, মাসে একবার বা দুবার, খুব কি বেশি চাওয়া সেটা? পাশের বাড়ির বাচ্চাটার সঙ্গে বারান্দার নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে একটু কি গল্প করতে বলতে পা রিনা আমার কিশোর ছেলেকে? ছোট ছোট আলাপচারিতার মাধ্যমে যদি কারোর একাকিত্ব, একঘেয়েমি দূর হয়, ক্ষতি কি?