.

বিদিশা রায়: আমেরিকায় ঠিক আসার পরের অভিজ্ঞতা। লিফটের মধ্যে দুই পরিচিত মানুষ বাক্যালাপ করছেন। কেমন আছ জানতে চাওয়ায় অন্যজন বললেন, 'I am good'। শুনে তো আমি তাজ্জব। ছোটবেলা থেকে গুরুজনেরা শিখিয়ে এসেছেন, নিজের প্রশংসা করতে নেই, লোকে যারে ভাল বলে, ইত্যাদি প্রভৃতি। তা এরা নিজেরা নিজেদের ভাল বলে জাহির করে কেন? তারপর বোঝা গেল I am good মানে, আমি ভাল আছি। আমাদের ভাষায় ফাইন থাকা। গুড গার্ল বা ব্যাড বয়-এর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।

যতদিন থাকি, ক্রমে আরও শিখি। শিখলাম, টেলিফোনে কথা বলার সময় শুধু তুমি কেমন আছ জানতে চাইলে হবে না। এইভাবে বলতে হবে, সেই মুহূর্তে সে কেমন আছে, অর্থাৎ, দুপুরে ফোন করলে জিজ্ঞেস করতে হবে, এই দুপুরে তুমি কেমন আছ? শিখলাম, কারোর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হওয়ার পর, সেরা টাটা বাই বাই সম্ভাষণ হল, 'হ্যাভ এ গুড ওয়ান'। সেই গুড সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত, সপ্তাহ, বছর এমনকী জীবনও হতে পারে। আর শুক্র শনিবার কাউকে দেখে যদি তুমি 'হ্যাভ এ গুড উইকেন্ড' না বল, তাহলে বন্ধুত্বের আশা রেখো না!

এই পর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় যে আমেরিকায় এলে ভাষা কারোর কাছে জীবনযাপনের অন্তরায় হতে পারে, সেটা সম্পূর্ণ ভুল। অন্তত, কে কেমন ইংরেজি জানেন বা বলেন, তাতে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোনও ফারাক গড়ে ওঠে না। অনেকের শ্রীদেবী অভিনীত 'ইংলিশ ভিংলিশ' সিনেমাটির কথা মনে হতে পারে। যেখানে ভিসা অফিসার বলছেন, তুমি ইংরেজি বলতে পারো না, আমাদের দেশে গিয়ে থাকবে কী করে। সিনেমা তো সিনেমাই। ওই সংলাপ অনেক বেশি প্রযোজ্য লন্ডনের ক্ষেত্রে যেখানে তোমার ইংরেজি বলার ওপর নির্ভর করবে উল্টোদিকের মানুষটির কাছ থেকে তুমি কতখানি সমাদর পাবে। এখানে কিন্তু তা নয়।

নিউইয়র্ক শহরের কথাই ধরা যাক। মেল্টিং পট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। সারা দুনিয়ার মানুষের ভিড়। রাজার ভাষা, রাণীর ভাষা, প্রজার ভাষা সব চলে। এই শহরে এমন অসংখ্য মানুষের দেখা পেয়েছি যাঁরা ইংরেজি একেবারেই বলতে পারেন না। কিন্তু তাতে তাঁদের বিশেষ কোনও অসুবিধে হয়নি। আমাদের বিল্ডিং-এ একটি চিলির মেয়ে সাফসুতরো করার কাজ করে। গুনে গুনে দেখেছি গুড, ব্যাড, ক্লিন, ডার্টি-সহ গোটা দশেকের বেশি ইংরেজি শব্দ জানে না। কুড়ি বছরের বেশি এখানে দিব্বি কাটিয়ে দিল।

আবার আর একদল আছেন যাঁরা উচ্চশিক্ষিত, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত অথচ ইংরেজি বলায় সে রকম সড়গড় নন।  কিন্তু সে জন্য তাঁদের হাসির খোরাক হতে হয় না। এখানকার এক প্রখ্যাত ভারতীয় চিকিৎসক - যাঁকে এক ডাকে প্রায় গোটা আমেরিকা চেনে, তাঁর ইংরেজি শুনলে কলকাতার গ্রামার এবং অ্যাকসেন্ট-প্রেমী বাঙালিরা হয়তো ভিরমি খাবেন। কিন্তু যে কোনও অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দিলে গোটা হল দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায়।

আমার মতো মফস্বলের বাংলা মিডিয়াম স্কুল থেকে কলকাতায় পড়তে আসা অনেকেরই বেশ কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষত অ্যাকসেন্ট বাণে জর্জরিত হওয়া তো ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু কলকাতা নয়, একই ছবি দেখেছি দেশের অন্যান্য রাজ্যেও। আমেরিকায় যাঁরা থাকেন তাঁদের একটা প্রাপ্তি, অ্যাকসেন্ট ফ্রি জীবন।  এখানে কেউ উচ্চারণ নিয়ে মাথাই ঘামায় না। তুমি ঠিকঠাক কমিউনিকেট করতে পারলেই হল, তা সে হোক না কেন ইংলিশ, হিংলিশ অথবা  বেঙ্গলিশ!!!